মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি:: সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিশাল সাগরের নীলজলে গঙ্গাস্নানে ধুয়ে মুছে যাবে জাগতিক পাপ এ বিশ্বাস নিয়ে আজ (সোমবার) পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতে অনুষ্ঠিত হবে প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী রাস পূর্ণিমা উৎসব ও পূণ্যস্নান। এ রাস উৎসবকে ঘিরে রোববার সকাল থেকে কুয়াকাটা সৈকতে উপস্থিত হয়েছে হাজার হাজার পর্যটক ও পূণ্যার্থী। আজ সকালে সাগরে গঙ্গাস্নান শেষে কলাপাড়া পৌর শহরের মদন মোহন সেবাশ্রম প্রাঙ্গনে শুরু হওয়া পাঁচদিন ব্যাপী রাস মেলায় অংশ নিবে পূণ্যার্থীরা। রাস উৎসবে প্রতিবছর বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও জেলা প্রশাসনের নির্দেশে করোনা পরিস্থিতির কারনে এবার স্বাস্থ্য বিধি মেনে সীমিত আকারে হবে সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি। মন্দির ও মেলায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মাস্ক পরিধান। প্রশাসন থেকে নেয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

জানাযায়, কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথির এই লগ্নে কুয়াকাটা সৈকতে হাজারো পূর্ণ্যাথীর গঙ্গা স্নানের মধ্য দিয়ে কুয়াকাটায় প্রতিবছর দুইদিন ব্যাপী রাস পূর্ণিমা উৎসব ও গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাগর তীরে এ পূণ্যস্নান সম্পন্ন হয়। কুয়াকাটা রাধা কৃষ্ণ সেবাশ্রম প্রাঙ্গনে রাস পূজা উপলক্ষ্যে নামকীর্তণ ও গীতা পাঠ অনুষ্ঠান চলবে রোববার রাতভর।

কুয়াকাটা রাধা কৃষ্ণ সোবাশ্রমের পুরোহিত ব্রহ্মচারী শিশির মহারাজ ও কলাপাড়া মদন মোহন সেবাশ্রমের পুরোহিত ইতু রানী দাস জানান, কার্তিক মাসের পূর্ণিমাই রাসপূর্ণিমা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই দিন বৃদাবনের গোপিনী সকাশে রাধার সঙ্গে রাস উৎসবে মেতেছিলেন গোপ শ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ। গোপিনীদের নাচ ও শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বংশীধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছিল বৃন্দাবনের পবিত্রভূমি। পরবর্তীকালে রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের এই মিলন উৎসবকে শ্রীচৈতন্যদেব নাম-সঙ্কীর্তনের মধ্য দিয়ে রাস মহোৎসবে পরিণত করেন। এই দিনে তাই বৈষ্ণব ভক্তরা তাঁদের ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্খায় মেতে ওঠেন রাসলীলায়। এই বিশ্বাস নিয়ে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের নর-নারীরা কুয়াকাটায় পূণ্যস্নান করছে।  রাস উৎসবে ঘিরে মন্দিরে বসানো হয় ১৬ জোড়া রাধা কৃষ্ণের যুগল মূর্তি।

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বিশ্বাস, সূর্যোদয়ের আগেই সোমবার সৈকতে শুরু হবে পূজা অর্চনা। হিন্দু নারী-পুরুষ ও শিশুরা তাঁদের বিশ্বাস থেকে সৈকতে ধুপ-আগরবাতি ও মোম প্রজ্জলন করে ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করে সাগরে গঙ্গা স্নান করে পূণ্যলাভের আশায়। এ ছাড়া অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষরা তাদের মৃত বাবা-মা ও স্বজনের আত্মার শান্তি কামনায় সৈকতে বসে মাথা মুড়িয়ে মৃত স্বজনের উদ্দেশ্যে পিন্ড দান করেন।

রাস উৎসকে কুয়াকাটায় পূণ্যস্নানে আসা বগুরার শৈলেন বাড়ৈ, নিরুত্তম হাওলাদার, কুষ্টিয়ার হিমাদ্রী দত্ত ও জয়ীতা রানী জানান, গত বছর আম্পানের কারনে কুয়াকাটায় গঙ্গাস্নানে আসতে পারেন নি। এবছর করোনার প্রকোপের কারনে দর্ঘিদিন ঘরবন্দী থাকায় ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের আশায় কুয়াকাটায় এসেছেন পূণ্যস্নানে। তাদের বিশ্বাসে পূর্ণিমা তিথির এই দিনে সাগরে গঙ্গাস্নান করলে সকল পাপ ও রোগ থেকে মুক্তি লাভ হয।

কুয়াকাটার এই রাস উৎসবকে ঘিরে প্রায় শত বছর ধরে কলাপাড়া পৌর শহরের মদন মোহন সেবাশ্রমে বসেছে পাঁচদিন ব্যাপী রাস মেলা। কুয়াকাটায় গঙ্গাস্নান শেষে পূণ্যার্থীরা মিলিত হয় এই রাসকুঞ্জে। এই রাস মেলা কে ঘিরে নির্মান করা হয় রাস কুঞ্জ। এই রাস কুঞ্জে বসানো হয়েছে ১৭ জোড়া রাধা কৃষ্ণের যুগল মূর্তি। ইতিমধ্যে মেলাকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দোকানীরা মেলায় দোকান সাজিয়ে বসেছে। পাঁচদিনের এই মেলায় লাখো মানুষ উপস্থিত হয। করোনা পরিস্থিতির কারনে দীর্ঘমাস ধরে সারা দেশে সকল ধরনের উৎসব ও মেলা বন্ধ থাকায় এই রাস মেলায় কিছুটা লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করেছে।

রাস মেলায় আসা ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন তারা কর্মহীন। সকল ধরণের উৎসব বন্ধ। তাই প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে স্বাস্থ্য বিধি মেনে এই মেলায় তারা ব্যবসা করবেন। মাস্ক ছাড়া তারা কারো কাছে পণ্য বিক্রি করবেন না।

মদন মোহন সেবাশ্রম মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাথুরাম ভৌমিক বলেন, প্রশাসনের নির্দেশ মেনে পাঁচদিন ব্যাপী এই রাস উৎসব ও মেলা শুরু হবে রোববার সকাল থেকে। স্বাস্থ্য বিধি মেনে আগামী তিন ডিসেম্বর পর্যন্ত এই উৎসব ও মেলা চলবে বলে জানান।

মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, কুয়াকাটায় রাস উৎসবকে ঘিরে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের নিরপত্তার জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। কুয়াকাটা সৈকত, মন্দির ও প্রধান প্রধান সড়কে টহল জোড়দার করা হয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশে স্বাস্থ্য বিধি মেনে রাস উৎসব উদযাপনের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উৎসবে আসা দর্শনার্থীদের জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া নির্বিঘ্নে এ উৎসব উদযাপনের জন্য প্রশাসন থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here