দে লো য়া র   জা হি দ ::

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ,  বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর চেয়ারম্যান ড. কাজী শহীদুল্লার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল হতে গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১ বঙ্গভবনে বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২০ গ্রহণকালে ৩টি বিষয়ে ইউজিসিকে নির্দেশনা দেন, এগোলো হলো :

>উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
>উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো
>বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি

ইউজিসি চেয়ারম্যান ‘স্ট্রাটেজিক প্লান ফর হায়ার এডুকেশন ২০১৮-২০৩০’ এর কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে বলেও রাষ্ট্রপতি তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য আবদুল হামিদকে অবহিত করেন। সরকারের “স্ট্র্যাটেজিক প্লান ফর হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: ২০১৮-২০৩০”-এর অংশ হিসেবে ইউজিসি’র উদ্যোগে তিনটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজন মনে করছে ইউজিসি, সেগুলো হলো:

১. ইউনিভার্সিটি টিচার্স ট্রেনিং একাডেমি,
২. গবেষণার জন্য সেন্ট্রাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি ও
৩. ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল

এ ছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে সমন্বিত উদ্যোগ ও বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণী সূচকের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশও করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের আচার্য তার দ্বিতীয় নির্দেশনায় ইউজিসিকে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।  সে আলোকে কানাডার একটি প্রদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

কানাডার আলবার্টা শিক্ষা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে, প্রস্তাবিত অ্যাডভান্সড এডুকেশন স্ট্যাটিউট অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট আলবার্টা ২০৩০ উদ্যোগের মাধ্যমে ঘটতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এবং রূপান্তরমূলক কাজকে প্রতিফলিত করার জন্য পোস্ট-সেকেন্ডারি লার্নিং অ্যাক্টের প্রস্তাবনায় মূল পরিবর্তন ঘটাবে। এটি উচ্চ শিক্ষা ও দক্ষতা সংক্রান্ত মন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদ (MACHES) প্রতিষ্ঠার কর্তৃত্ব প্রদান করবে, যা আলবার্টার পোস্ট-সেকেন্ডারি সিস্টেমের জন্য নতুন কৌশলগত উপদেষ্টা পরিষদ বলে গণ্য হবে।

ডেমেট্রিওস নিকোলাইডস, অ্যাডভান্সড এডুকেশন মন্ত্রী এ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট  সম্পর্কে বলেন, “পোস্ট-সেকেন্ডারি লার্নিং অ্যাক্টের প্রস্তাবনাতে প্রস্তাবিত আপডেটগুলি আলবার্টা ২০৩০ দ্বারা নির্ধারিত ভাষা এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে। এটি প্রমাণ-ভিত্তিক বিশ্লেষণ, সর্বোত্তম অনুশীলন এবং ১৫ বছরে এ সেক্টরে সবচেয়ে বিস্তৃত স্টেকহোল্ডারদের জড়িত থাকার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।”

আলবার্টা উন্নত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর দায়িত্ব: যা শিক্ষার মাধ্যমে আজীবন সাফল্যের জন্য আলবার্টানদের প্রস্তুত করে:

> অধ্যয়নের প্রোগ্রাম অনুমোদন করা
> পাবলিক পোস্ট-সেকেন্ডারি প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা প্রদানকারীদের অর্থায়ন
> শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা
> শিক্ষানবিশদের নিবন্ধন এবং প্রত্যয়ন করা
> একাডেমিক গবেষণা এবং উদ্ভাবনকে  সমর্থন করা

আলবার্টার  প্রোগ্রাম এবং পরিষেবাগুলি ৩টি ফলাফল দ্বারা চালিত হয়.

প্রাপ্তবয়স্কদের শেখার সুযোগ গুলি সমস্ত আলবার্টানদের জন্য অ্যাক্সেসযোগ্য এবং সাশ্রয়ী। উচ্চ-মানের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণা আলবার্টার অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবেশে ইতিবাচক অবদান রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা ব্যবস্থা জবাবদিহিমূলক এবং সমন্বিত।
আলবার্টার শিক্ষা বাজেট কে -১২ শিক্ষার জন্য সামগ্রিক অর্থায়ন ২০২০-২১ সালে $৮.৩২ বিলিয়ন থেকে ২০২১-২২ এর জন্য $৮.২৪ বিলিয়ন হবে, এবং পরবর্তী দুই বছরের জন্য তা এভাবেই  থাকবে। সরকার রাজস্ব পায়: কর থেকে যেমন তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রয়্যালটি হিসাবে সম্পদ আয়, ফেডারেল সরকার থেকে তহবিল স্থানান্তর এর মাধ্যমে আয় ।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের জাতীয় বাজেটের  উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করে ২০২২ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ শতাংশ বরাদ্দ উন্নীত রাখার বিষয়ে পদক্ষেপ চেয়েছে ।

মাধ্যমিক উত্স ব্যবহার করে ও তথ্য অনুসন্ধানে উচ্চ শিক্ষার উপর বিশেষ জোর দেওয়া অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার  দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শিক্ষার জন্য রাজস্ব এবং উন্নয়ন বাজেট থেকে বরাদ্দ মূল্যায়ন করে দেখা গেছে তা অবিশ্বাস্য রকম অপর্যাপ্ত। উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং মানব উন্নয়ন সূচকে (এইচডিআই) এর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ার কোনো সংগত কারণ নেই.. সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত বাজেট সহায়তার  পাশাপাশি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অভ্যন্তরীণ এবং অন্যান্য বাহ্যিক উৎস থেকে তহবিল গঠনের চেষ্টা করা উচিত।

অস্তিত্বহীন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শাখা ক্যাম্পাস’ হতে অন-অনুমোদিত ব্যাচেলর, মাস্টার্স, এমফিল— এমনকি পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও  কার্যক্রম পরিচালনা যদি অবৈধই  হয় তবে এদের বিরুদ্ধ এ কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার দায় সরকার বা ইউজিসি এড়াতে পারেনা।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক না থাকায় ডিগ্রি অর্জনের পর সরাসরি মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ না রেখে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া রাখার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যে সুপারিশ করেছে তা ও বাস্তবতা  বিবর্জিত।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, “দেশে ৫০টি সরকারি ও বেসরকারি ১০৭টি মিলিয়ে মোট ১৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ১৯ হাজার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ হাজার ও ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়ছে। এ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে অন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে ৫৫ হাজার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ছে ২৩ হাজার। সব মিলিয়ে মাস্টার্সে পড়ছে ৪ লাখ শিক্ষার্থী। ইউজিসির তথ্য মতে, এতসংখ্যক শিক্ষার্থীর এ স্তরে পড়ার প্রয়োজন নেই”(দৈনিক শিক্ষা/০২ জানুয়ারি, ২০২২)
.
রাষ্ট্রপতির নিকট দাখিলকৃত ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় স্পষ্টতই ফুঁটে উঠেছে দেশের উচ্চশিক্ষা কতটা বৈষম্যপূর্ণ, মানহীন ও কোন কোন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে  চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কতটা বাস্তব এবং সম্ভব তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপতির প্রথম নির্দেশনা বাস্তবায়নে ইউজিসির আইনি সক্ষমতা আছে কিনা তা একটি বড় প্রশ্ন ! যদি থেকে থাকে তা হলে ২০১৪ সালের পর থেকে গত ৭ বছর  সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার মান উন্নয়নে কি কি পদক্ষেপ নিয়েছে ইউজিসি? পর্যাপ্ত ও যোগত্যা সম্পন্ন শিক্ষক না থাকা সত্বেও কোন পরিস্থিতি বা কোন শর্তে তাদের মাস্টার্স খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ইউজিসির প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কিনা ? না হয়ে থাকলে সে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে কিনা? তাদেরকে কোনো সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে কিনা? বোদ্ধামহল মনে করেন  ১৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয় কে এক ইমেইলে ৭ দিনের মধ্যে এমন তথ্য বিবরণী বা  প্রতিবেদন নেয়া যায়..ইউনিভার্সিটির  শিক্ষকদের জন্য টিচার্স ট্রেনিং একাডেমি স্থাপনের প্রস্তাব তাদের যোগ্যতাকে কটাক্ষ ও প্রশ্নবিদ্ধ করার সামিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চ-মানের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণা, সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবেশ নিয়ে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখছে কিনা কাদের তা তদারক করার কথা? উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে  বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং সমন্বিত করতে কেন ব্যর্থ হয়েছি আমরা ? তা এখনই ভেবে দেখার সময় এসেছে ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্রাজুয়েশন প্রাপ্তিকে টেকসই করতে উত্তরণের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি ‘জাতীয় সরল উত্তরণ কৌশল’ প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে (বাসস, ২ জানুয়ারি,  ২০২২) বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে চতুর্মুখী সংকট তা নিরসনে সরল উত্তরণ কৌশল’ প্রণয়ন এখনই জরুরী। তা না হলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা একটি শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি আশা করতে পারিনা।

লেখক : দেলোয়ার জাহিদ, সাবেক রিসার্চ ফ্যাকাল্টি মেম্বার ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা, (সেন্ট পলস কলেজ) কানাডা, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কানাডা ইউনিট কমান্ড নির্বাহী, প্রাবন্ধিক ও রেড ডিয়ার (আলবার্টা) নিবাসী।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here