রাজনৈতিক অপশক্তি আমার-আপনার ছায়াতলে লুকিয়ে আছে: নওফেল

কক্সবাজার :: শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শের কারণেই এই বাংলাদেশের সংবিধানে ১৯৭২ সালেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা আমদের জাতির পিতাকে হারিয়েছি। হারানোর পরে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সরকারগুলো ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছুঁড়ে ফেলে তারা তাদের মনগড়া কিছু আদর্শ এবং ভ্রষ্টনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে পরিচালিত করতে গিয়ে এই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতাকে তারা সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করবার অপচেষ্টা করেছে। এই অপশক্তিকে আমরা চিনি। এই অপশক্তি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করেছে, অর্থনীতি এবং সমাজ নিয়ন্ত্রন করেছে। আজকে তারা আমার-আপনার ছায়াতলে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। এরাই আগামীতে ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগে অর্থাৎ আমরা যারা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে গর্ব করি সেখানে ঢুকবার চেষ্টা তারা করছে।’

শনিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরীর শহীদ দৌলত ময়দানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কক্সবাজার জেলা শাখার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিলের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নওফেল বলেন, ‘আমার-আপনার ছায়াতলে লুকিয়ে থাকা এই ব্যক্তিরা না ইসলামের সত্যিকারের চেতনা ধারন করে, না বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা ধারণ করে, না মনুষ্যত্ব তাদের মধ্যে আছে। তারা শুধু নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ বুঝে। নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে তারা ধর্মকে ব্যবহার করে। তারা ধর্মে হানাহানিতে বিশ্বাস করে। তারা ঘাপটি মেরে থেকে তাদের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক শক্তিশালী। এদেরকে চিহ্নিত করে করে আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য এবং সমুন্নত রাখার জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এই জন্য বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের কাছে সকল সম্প্রদায়ের অনেক প্রত্যাশা। তাই বাংলাদেশের সংবিধানের যে চারনীতি এই চারনীতির সাথে যারা কোনধরনের আপোষ করার মানসিকতা দেখিয়েছে তাদেরকে আওয়ামী লীগের পদে বা আওয়ামী লীগ কর্তৃক কোনভাবেই পুরস্কৃত করা যাবে না।’

সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্ট্রান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত। তিনি বলেছেন, ‘জিয়া এবং এরশাদের প্রেতাত্মা থেকে আমরা এখনও সংবিধানকে মুক্ত করতে পারিনি। এই সংবিধানে বঙ্গবন্ধু আছেন, এ সংবিধান থেকে পাকিস্তানও মুছে যায়নি। দলের ভেতরে দল আছে, সরকারের ভেতরে সরকার আছে, প্রশাসনে পাকিস্তান আছে। যারা বঙ্গবন্ধুর সদিচ্ছার বাস্তবায়নে ভেতরে থেকে-বাইরে থেকে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে চলছে।’

শনিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরীর শহীদ দৌলত ময়দানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কক্সবাজার জেলা শাখার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিলের প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ‘আমরা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টকে ভুলিনি।

আমরা সেই সময় দেখেছি, কিভাবে ভেতরে-বাইরে চক্রান্ত করে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা গনতন্ত্র ও আইনের শাসন পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য, নানান ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে এগিয়ে আছেন। সবার কাছে আমার আবেদন, চলুন যেভাবে ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার দিনে নেতারা তাকে রক্ষা করেছেন আমরাও ভবিষ্যতে তাকে রক্ষা করে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠাই এগিয়ে যাই।’

‘পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশেও একইভাবে আমরা সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ দেখেছি, দেখছি। এই দেশত্যাগের পালা যদি বন্ধ করা না যায়, সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরে আমরা মিলে নতুন জটিলতার আবর্তে পড়তে পারি। এই আশংকা আমরা ইতোমধ্যে লক্ষ্য করছি।’

রানা দাশ গুপ্ত আরও বলেন, ‘কক্সবাজারের হরিজন সম্প্রদায় কিছুদিন আগে ঢাকায় গিয়েছিলেন। তাদেরকে উৎখাত করা হচ্ছে তাদের জমি থেকে। আমরা পরিস্কার করে বলতে চাই, চট্টগ্রামে বেড়িবাঁধের ওখান থেকে জলদাসদের উৎখাত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা একদিকে মাঠে লড়াই করেছি, আর একদিকে আইনী লড়াই করেছি। এই লড়াইয়ের কারণে তাদেরকে উৎখাত করা যায়নি। ঢাকা থেকে একটা প্রতিনিধি কক্সবাজার আসবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি হরিজন পল্লীতে যাবেন। তদন্ত করবেন এবং আমরা আপনাদের কথা দিতে চাই, হাইকোর্টে যদি রীট করতে হয় সেই রীটের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে আমরা গ্রহন করেছি। রাখাইন সম্প্রদায়ের সমস্যা আছে। এথিন রাখাইন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি আজকে কান্না জড়িত কন্ঠে রাখাইনদের দুরাবস্থার কথা বলেছেন। আমি আজকে বলতে চাই, একজন সাবেক সাংসদের যদি অসহায়ত্ব প্রকাশ পায় তাহলে বুঝে নিতে হবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কেমন আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করতে চাই, জনপ্রতিনিধিরা এবং আমরা সবাই মিলে আদিবাসীদের সমস্যা নিরসনে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা পালন করব। নানান জায়গা থেকে নানান প্রকল্পের নামে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করার পাঁয়তারা হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বাইপাস সড়কে আমরা কোথাও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে, তাদের মঠ-মন্দির, শ্মশানকে দাবড়িয়ে দিয়ে প্রকল্পের নামে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করার চক্রান্ত সফল হতে দেব না।’

সম্মেলনে উপস্থিত ৩ সাংসদ সদস্যের উদ্দেশ্যে রানাদাশগুপ্ত বলেন, ‘আমরা আশা করতে চাই, মুজিব বর্ষে মুজিবের আদর্শের বাংলাদেশ যেন ফিরে আসে, সাম্প্রদায়িকতার কাছে, উগ্রবাদ-মৌলবাদের কাছে যেন আত্মসমর্পন না করে, বঙ্গবন্ধু যেভাবে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাটি অর্জন করেছিনে সেভাবে সংসদের ভেতরে-বাইরে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশটিকে ফিরে আনার লড়াই, গনতান্ত্রিক লড়াই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুন:প্রতিষ্ঠার লড়াইকে আপনারা শানিত করবেন।’

বিকেল সাড়ে ৪ দিকে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, কক্সবাজার জেলা শাখার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি উষারতন তালুকদার। জেলা হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি এডভোকেট পীযুষ কান্তি চৌধুরীর সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার-রামু আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল, চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সাংসদ জাফর আলম, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক, জেলা জাসদের সভাপতি নঈমুল হক চৌধুরী টুটুল, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম কুমার চক্রবর্তী, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মহিলা ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মধুমিতা বড়ুয়া, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক শ্যামল পালিত, গণসংযোগ সম্পাদক বিজয় কুমার বড়ুয়া, আদিবাসী বিষয়ক সম্পাদক শরৎ জ্যোতি চাকমা, সহ-সম্পাদক সুপ্ত ভূষন বড়ুয়া, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের (চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা) সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার হোড়।

এছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সাবেক সাংসদ অধ্যাপিকা এথিন রাখাইন, ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু সংগঠন সমূহের ঐক্য মোর্চা কক্সবাজার শাখার আহ্বায়ক এডভোকেট রনজিত দাশ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি মন্ডলীর সদস্য উদয় শংকর পাল মিঠু প্রমুখ। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন।-প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তিন কোটি টাকায় নির্মিত স্কুল ভবন নদীগর্ভে

আরিফ হোসেন, তজুমদ্দিন প্রতিনিধি ::  ভোলার তজুমুদ্দিন উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর জহির ...