রাজনীতির কবি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

.
মোঃ শাহীন :: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি না জন্মালে হয়তো বাংলাদেশ কোন দিন স্বাধীন হতো না। তিনি বাঙালি জাতির স্বার্থে সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের অবসানে যিনি মূখ্য ভূমিকা পালন করেন, তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন একজন মানবতার সেবক। সারাজীবন মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। মানুষের সুখ দুঃখে এগিয়ে এসেছেন। নিজে না খেয়ে নিজের খাবার অন্যের মুখে তুলে দিয়েছেন।
.
বঙ্গবন্ধুকে “Poet of politics ” বা রাজনীতির কবি বলা  হয়।তিনি রাজনীতিতে অনেক বিচক্ষণ ছিলেন। তিনি স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত “নিউজউইক” ম্যাগাজিন  বঙ্গবন্ধুকে “রাজনীতির কবি” হিসেবে আখ্যায়িত করে। এছাড়া, বিবিসি বাংলা জরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি তালিকায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন মানুষের ভোটে। বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণকে এক অনবদ্য কবিতা এবং বঙ্গবন্ধুকে মহাকবি হিসেবে ভূষিত করার অবারিত যুক্তি রয়েছে। বাঙালি কবি ও লেখক অজয় দাশ তার “বঙ্গবন্ধু আদিগন্ত যে সূর্য” কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে যে সহজ সরল পংক্তিতে চিত্রায়ণ করেছেন। তা হলো “বাঙালি কি বাঙালি হয় শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি ছাড়া/ থাকে না তার বর্গ কিছুই না থাকলে টুঙ্গিপাড়া/ সুর-অসুরে হয় ইতিহাস, নেই কিছু এ মুজিব  ছাড়া/বাংলাদেশের ইতিহাসে দেবতা নেই মুজিব ছাড়া / বাংলাদেশের মুক্তিও নেই মুজিব নামের সূর্য ছাড়া”। লন্ডনের ‘দি লিসনার’ পত্রিকায় ব্রায়ান ব্যারন ভবিষ্যতবাণী করেন  ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে উচ্চতর আসনেই অবস্থান করবেন। তাঁর বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহটি গুরুত্বপূর্ণ “স্মারক-চিহ্ন” এবং কবরস্থানটি “পূণ্যতীর্থে’ পরিণত হবে”। কবিতার বক্তব্য এটি প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু সেই অসাধারণ অবিসংবাদিত নেতা।
.
বঙ্গবন্ধু রচিত “কারাগারের রোজনামচা” গ্রন্থে “থালা বাটি কম্বল/জেলখানার সম্বল” লেখাটি থেকে বঙ্গবন্ধুর অনন্য সাধারণ রচনাসমূহ যে কত গভীর ও বিশাল কবিতার প্রতীক, উপমা ও কালের ক্যানভাস সমৃদ্ধ, তা সহজেই অনুমান করা যায়। বঙ্গবন্ধু বলেছেন “জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই- তারা জানে না জেল কি জিনিস। বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সম্বন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা। আমি পাঁচবার জেলে যেতে বাধ্য হয়েছি। রাজবন্দী হিসেবে জেল খেটেছি, সশ্রম কারাদ-ও ভোগ করতে হয়েছে। আবার হাজতি হিসেবেও জেল খেটেছি। তাই সব রকম কয়েদির অবস্থা নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছি।’ এমন চমৎকার ভাষায় কাব্যিক উচ্চারণে বন্দী জীবনকে চিত্রিত করার এত সহজ-সরল ভঙ্গিমা ক’জন মহান কবি ইতিহাসে উপস্থাপন করতে পেরেছেন? তা কেউই জানে না।
.
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে ফিরে এসে এক অপ্রতিরোধ্য গতিধারা সঞ্চার করেন। যুদ্ধ -বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করার মহাযজ্ঞে  সততা ও আন্তরিকতার সাথে দেশবাসীকে নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। দশ মাসের মধ্যেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে জাতিকে শ্রেষ্ঠ্য সংবিধান উপহার দেন। সকল মিল-কারখানা, ব্যাংক ইত্যাদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সবার জন্য সমান অধিকারের ভিত্তিতে এক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত জাতি-রাষ্ট্রের গঠনে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করেন।
.
ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ নীতির ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রেখে অসাম্প্রদায়িক ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান দেশের ইতিহাসে শুধু নয় বিশ্ব মানবধিকার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা ও জায়গা বরাদ্দ, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন, বিশ্ব ইজতেমার জমি বরাদ্দ, বাংলাদেশের ওআইসি সদস্য পদ লাভ এবং সৌদি আরবে কম খরচে হজযাত্রীদের পবিত্র হজ পালনের উদ্যোগ, মদ ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ এবং বেতার ও টেলিভিশনে আল কোরআনের বাণী প্রচার করাসহ ইসলামী মূল্যবোধ প্রচার ও প্রসারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান যুগে যুগে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন ‘আমি রোজ নামাজ পড়তাম এবং কোরআন তেলাওয়াত করতাম।’
.
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বিশ্ব ইতিহাসে একটি নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে এক কলঙ্কিত অধ্যায় সূচিত হয়। এদিন ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতাকে হত্যা করে। ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করতে চেয়েছিল। সেদিন ঘাতকের বুলেট বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। হত্যা করা হয় শেখ রাসেলের মতো ছোট্ট অবুঝ শিশুকেও। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা। বিদেশে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন দিন এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। যে ব্যক্তি তার জাতির স্বার্থে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, তাকেই কিনা মরতে হয়েছে সেই জাতির হাতেই। এটা বাঙালি জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বাঙালি একজন বিশ্ব নেতাকে হারালো। তাইতো গীতিকার হাসান মতিউর রহমানের কথায়, সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলীর কন্ঠে শোনা যায়– “যদি রাত পোহালে শোনা যেতো, বঙ্গবন্ধু মরে নাই / যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই/ তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা, আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।”
.
বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রমে অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক নীতি অবলম্বন করে সুষ্ঠুভাবে বিচার ও বিচারের রায় কার্যকর এবং এর ধারাবাহিকতা অব্যাহতভাবে সচল রেখেছেন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিচারের রায় কার্যকর করে নির্ভীক সাহসিকতা ও দৃঢ়চিত্তের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অবিরাম ও নিরলস প্রচেষ্টায় দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে অজস্র উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এর বাস্তবায়নের কাজ বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। জাতির উন্নয়নের সুদক্ষ প্রকৌশলী হিসেবে নিজেকে মহিমান্বিত ও দেশকে গৌরবান্বিত করেছেন।
.
বিশ্ব বরেন্য মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। এ দিনটি বিশ্ব শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়।২০২০ সালের ১৭ মার্চ এই মহান নেতার জন্ম শতবার্ষিকী পূর্তি হলো। এই মহান মানুষটি তার সমস্ত জীবন বাঙালি জাতির কল্যানে ব্যয় করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে। তাইতো ফিদেল কাস্ত্রো বলেন–“ আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি।” এই থেকে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু কত বিশাল মনের অধিকারী ছিলেন। কত মুক্ত মনা ছিলেন। কতটা নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করেছেন। আসলে বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। এক যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে ধ্বংস স্তূপ থেকে কিভাবে টেনে তুলে নিতে হয় তার দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্থাপন করেছেন।
.
বঙ্গবন্ধু স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তার রক্তে মিশেছিল রাজনীতি। ছোট বেলা থেকেই তিনি অত্যান্ত দানশীল ছিলেন। তিনি একবার স্কুলে যাবার পথে এক শীতার্তকে দেখে, বঙ্গবন্ধু তার নিজের ব্যবহারের চাদরটিও শীতার্ত লোকটিকে দিয়ে দেন।রাজনীতিতে ছোট বেলা থেকেই তিনি সফল। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে তিনি বাঙালি জাতিকে তাদের চির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার সুখ এনে দিতে পেরেছেন। তাইতো  মলয় কুমার গাঙ্গুীর কন্ঠে শোনা যায়– “যে মানুষ ভীরু কাপুরুষের মতো, করেনি কো কখনো মাথা নত/ এনেছিল হায়েনার ছোবল থেকে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা।”
.
.
.
.
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি। [email protected]
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘সাইমন জাকারিয়া নিরপেক্ষ গবেষক নন’

ডেস্ক রিপোর্ট ::  সরলপুর ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটি নিয়ে সম্প্রতি বাংলা একাডেমির ...