ব্রেকিং নিউজ

রহিমা আক্তার মৌ’র গল্প ‘ফটোশপ’

রহিমা আক্তার মৌ

রহিমা আক্তার মৌ :: দিন তারিখ মনে নেই, যতটা মনে পড়ে চন্দ্রাবতী শিশু সাহিত্য প্রোগ্রাম চলছে। অনেকের মতো আমিও ছিলাম সেদিন, সাথে ছিলো রৌদ্র। প্রধান অতিথি হিসাবে এসেছেন আমার প্রিয় অভিনেতা, তখনকার সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এই প্রথম আমি উনাকে সামনাসামনি দেখি। এর আগে যত দেখেছি সব উনার অভিনয়। অভিনেতা অভিনেত্রীরা আমার কাছে অন্য এক জগতের মানুষ। খুবই সম্মান করি। প্রিয় অভিনেতা সামনে আর আমি দুটা কথা বলতে পারবো না তা কি করে সম্ভব।
মন্ত্রী মহাশয় দায়িত্ব পালন করে বাংলা একাডেমির হল রুমের পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। জানি উনি বের হয়ে গেলে বাইরে এত মানুষের সামনে কথা বলা যাবে না, তার উপর সাথে উনার পাহারাদাররা তো আছেই। তবে কি আমার কথা বলা হবে না। উনি তো হেঁটে চলেই যাচ্ছেন, উনাকে থামাবো কি করে?
মাথায় উপস্থিত বুদ্ধি, পেছন থেকে জোরে বাকের ভাই বলে ডাক দিলাম। সাথে সাথেই উনার চলন্ত পা থেমে যায়। উনি পেছনে তাকালেন, এরই মাঝে আমি সহ ৪/৫ জন গিয়ে হাজির। উনি তাকালেন আমার দিকে, মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন-
— মাথা তো বুদ্ধিতে ভরা।
কথা শুনে আমিও হাসলাম।
— আপনাকে থামানোর আর কোন পথ ছিলনা।
— একেবারেই ঠিক করেছ। বলতেই হবে বুদ্ধির মতো সাহস আছে।
— আছে বৈকি। আপনি মন্ত্রী মিনিস্টার যাই হোন না কেনো, আপনি আমাদের সেই বাকের ভাই।
সবার ইচ্ছে একটা ছবি তুলবে উনার সাথে। অনুমতিটা আমিই নিলাম।
— একটা ছবি তুলতে পারি।
— নিশ্চই, কিন্তু তুমি তো অনেক লম্বা।
— আপনি বললে একটু খাটো হয়ে দাঁড়াই।
— আরে না, তুমি যেমন আছো ঠিক তাই থাকো।
অতঃপর আমরা দুইটা গ্রুপ ছবি তুললাম। উনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সাথের সবাই এই নিয়ে অনেক মজা করলাম। সেদিন কথাসাহিত্যিক সেলিনা আপা ( সেলিনা হোসেন) এসেছিলেন। উনার সাথেও কথা হয়েছে ছবিও তোলা হয়েছে। আমাকে আর রৌদ্রকে দুই পাশে নিয়ে আপা ছবি তোলেন।
সেই প্রোগ্রামে আরো ২/৩ টা ছবি তোলা হয় সাহিত্যাঙ্গনের ব্যক্তিদের সাথে। বছর দুই পরে নিজের ফেইসবুকে বাকের ভাইয়ের সাথে তোলা সেই গ্রুপ ছবিটা পোস্ট দিই। সেই ছবি আহসান (বাবুদের বাবা) দেখে বলল-
— অন্য পুরুষের সাথে তোমার ছবি।
— এটা তো গ্রুপ ছবি।
এই নিয়ে আর কথা বাড়াই নি। মাঝে মধ্যে বই মেলায় বা প্রোগ্রামে গেলে ২/৪ টা ছবি তোলা হয়েছে অন্যদের(পুরুষ) সাথে। কিন্তু যেদিন আহসান এই কথা বলল, তার পর থেকে আর কারো সাথে ছবি তুলিনি। এটা নিজে বুঝা আর আহসানের কথাকে সম্মান জানানো।
দুই বাংলার অনুষ্ঠান চলছে নাট্যশালায়। নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম আমিও। সেদিনও সেলিনা আপা এসেছিলেন। কথা হল, ছবি তোলা হলো। হল রুম থেকে বাইরে এসে দাঁড়াই। অনেকে ভি আই পি দের সাথে ছবি তুলছেন। আমি পরিচিত দু একজনের সাথে কথা বলছি। লেখক ও মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল ভাই আর সোহাগ সিদ্দিকী ভাই দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। সোহাগ সিদ্দিকী ভাই আমায় দেখেই ডাক দিলেন-
— এই যে মৌ এদিকে আসো, মোহিত ভাইয়ের সাথে কি পরিচয় আছে।
আমি ওনাদের দিকে যাই, বলি-
— উনার লেখার সাথে পরিচয় আছে কিন্তু ব্যক্তি উনার সাথে নেই।
— জানেন মোহিত ভাই, মৌ কিন্তু আমাদের জাতীয় বিয়াইন হয়।
— তাই নাকি? মজার ব্যাপার তো।
আমরা দাঁড়িয়ে কথা বলছি, ঠিক তখনি একটা মেয়ে এসে মোহিত ভাইয়ের সাথে ছবি তুলতে চাইলো। মেয়েটি তার মোবাইল আমার হাতে দিয়ে বলল-
— আপু আমার একটা ছবি তুলে দাও।
আমি ছবি তুলে দিলাম। মেয়েটা বলল-
— দেও তোমার মোবাইলে তোমার ছবি তুলে দিই উনাদের সাথে।
— না আপু, আমি ছবি তুলি না।
সোহাগ ভাই আর মোহিত ভাই তাকালেন আমার দিকে। মোহিত ভাই বললেন-
— কি বলেন, আপনি ছবি তুলেন না।
— ছবি তুলি ভাই, তবে বাইরের কোন পুরুষের সাথে তুলি না।
— অবাক করলেন, কোন জায়গায় গেলে ছবি তোলার জন্যে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ব্যস্ত হয়ে যায়। আর আপনি বলেন ছবি তোলেন না।
— ঠিক বলেছি ভাই। আপনার সাথে বা আপনাদের সাথে আজ আমি একটা ছবি তুললাম, কিন্তু এই ছবি দিয়ে কি করবো? ফেইসবুকে তো দিব না। কাউকে দেখাবো না, মিছেমিছি মোবাইলটাকে ভারি করবো কেনো?
উনারা দুজনেই হাসলেন। কিছুক্ষন গল্প করে বিদায় নিলাম।
প্রিয় প্রিয় মানুষদের সাথে ছবি থাকা ভালো, উনাদের জন্মদিনে নিজের সাথে উনাদের সেই ছবি দিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো যায়। আমার সে পথ বন্ধ, নিজেই বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু
ভি আই পি দের সাথে ছবি থাকলে নামকরা কেউ হন যায় যা বিগত কয়েক বছরে দেখলাম।
কিছুদিন আগে মামাতো বোনের বিয়েতে এক প্রিয় অভিনেত্রী আসেন। আমি উনার অনুমতি নিয়ে উনার সাথে একটা ছবি তুলি। ঠিক সেই সময়ে একজন লোক এসে সেই অভিনেত্রীর সাথে সেলফি তুলতে চায়। অভিনেত্রী সরাসরি না করে দিয়েছে। এটা দেখে আমার খুব ভালো লাগলো।
অবশ্য এমন করাই ভালো, এই তো গতবছরের কথা সোনার মালিক বা ক্যাসিনো ফেসিনো কি কি ঘটনা ঘটলো। তাদের সাথে কার কার ছবি পেলো, এই নিয়ে কার কার চাকরিও গেলো। তার চেয়ে ভাই সেলফি কুলফি না তোলাই উত্তম। তবে অন্যরকম অভিজ্ঞতাও আছে, ‘আপা/ ভাইয়া আপনার সাথে একটা ছবি তুলি’ এমন ডায়লগ অনেকের শুনতে হয়। খুব কষ্ট করে বলতে হয় –
— স্যরি আমি ছবি তুলি না।
কয়েকজন আপার সাথে আছে ছবি তা মোবাইলেই থাকুক।
মরার উপর খরার ঘা হইলো এই করোনা। কার ল্যাপটপে লাখ + টেস্টের রিপোর্ট পেয়ে হগলে শুরু করলো ভি আই পি দের সাথে তাদের ছবি ছিটিয়ে দেয়া। আবার হালপাতালের মালিকের ও একই। তয় কথাটা মন্দ লাগেনি যখন শুনেছি হালপাতালের মালিক বলেছেন,
‘হাসপাতালের লাইসেন্স দিয়ে কি করবো, ভি আই পি দের সাথে শত শত ছবিই আমার লাইসেন্স'( এই ডায়লগ ফেইসবুকে পাইছি, কেউ আবার আমার গুষ্টি উধ্যার কইরেন না।)
কথাটা উনি বলে থাকলে কিন্তু ভুল বলেন নি। যে সব পোছে ছবি দেহি ইহা লাইসেন্স বটেই। তয় নতুন করে ফটোশপ শুরুর কথাও শুনছি। কি কি কাটছাঁট করে নাকি ভি আই পিদের সাথে আমজনতা ছবি বসাইয়া ছাড়াচ্ছে। এই সুযোগে আমগো ভি আই পিরা নাকি কয়-
‘ওই সব আমাদের ছবি নয়, সবই কাটছাঁট করা, কি জানি নাম তার ফটোশপ’।
লেখক: সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তাসনীমের অঙ্কনে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে তরুণ সংবাদকর্মী জুনাইদের সংবাদ সংগ্রহের দৃশ্য

তাসনীমের অঙ্কনে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে তরুণ সংবাদকর্মী জুনাইদের সংবাদ সংগ্রহের দৃশ্য

হঠাৎ মেঘনার অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে উপকূলের সব। মানুষের দোকানপাট, মসজিদ, ঘর-বাড়ি, ...