ব্রেকিং নিউজ

রহিমা আক্তার মৌ’র গল্প “করোনাকাল ও পাগলাইয়া”

রহিমা-আক্তার-মৌ

রহিমা আক্তার মৌ :: শুক্রবারের ঘুমটা ভাঙ্গে আহসানের মোবাইলের টং টং ভিডিওর শব্দে। আওয়াজ কমিয়ে দিতে বলেই অন্যদিকে ফিরি। বলে উঠলো-
–আমি কিন্তু সাইডে যাবো।
যাও, বলেই ঘুম। চোখ খুলে দেখি সে শার্ট প্যান্ট পরে মুখে মাস্কও লাগিয়েছে। দ্রুত উঠে বসেই জিজ্ঞেস করি-
— বের হতে আর কতক্ষণ?
— দশ মিনিট।
— নাস্তা দিচ্ছি।
— খাওয়ার সময় নেই।
দশ মিনিটেই খাওয়া হবে বলেই দিই দৌড়।
ফ্রিজ খুলে প্লেটে একটু ভাত, একটু শাক, আর একটু কচুর ডাল দিয়ে ওভেনে দিলাম। চুলা জ্বালিয়ে একটা ডিম শক্ত করে মামলেট করলাম। শক্ত মামলেট আহসানের একেবারেই পছন্দ নয়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতে শক্ত খাওয়াই উত্তম। মাত্র মিনিট পাঁচ এর মাঝে নাস্তা হাজির। খেয়ে বেরিয়ে গেলো। নাস্তা হিসাবে আহসান ভাত নইলে পরাটাই খায়। শটকাট হলে এই ভাবে ভাত দিই। নইলে ডিম দিয়ে ভাজি করে দিই। তবে ভাতের আরেকটা আইটেমের নাম লটপট। এই শব্দটা মনে হয় আমার বানানোই। এটা হল ভাত তরকারি এক সাথে ভেজে দেয়া।

দৈনিক কতবার যে আমি ঘড়ি দেখি তার হিসাব নাই। দেখি আর ভাবি ঘড়ির সাথে আমি ঠিক আছি তো। আজ ঘড়ি দেখি আর মাথা গরম হয়। উঠতে অনেক দেরীই হয়েছে। দ্রুত অন্যদের নাস্তা রেডি করতে হবে। দুপুরের রান্না, ইদানিং দুপুরে আবার চুলার গ্যাস কমে যায়। ঢু মেরে দেখি জামাতা উঠেছে। নাস্তা দিব কিনা জিজ্ঞাস করায় হ্যাঁ সূচক জবাব।

নাস্তা রেডি করছি দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া, ঠিক তখনিই কলিংবেল বেজে উঠলো। ভেবেছি আহসান কিছু নিতে ভুলে গেছে তাই এসেছে, নইলে গতকাল যে মহিলাকে দুইকেজি আদা ছিলিয়ে দিতে দিয়ে এসেছি সে এসেছে। আমি ছাড়া আর কোন নবাব তো দরজা খুলবে না। ভাবতে ভাবতে দরজা খুললাম। খুলেই আমি হা করে তাকিয়ে আছি। সাড়ে তিন মাসে এই কি হলো পাগলাইয়ার। শরিরে শুধু হাড় আর হাড়ের উপর ওর কালো কুঁচকে যাওয়া চামড়া। অদেখা শত্রু করোনা কেড়ে নিয়েছে অনেক তাজা প্রান, সন্তান হারানোর ব্যথা সহ্য করতে না পেরে বাবার না ফেরার দেশে চলে যাওয়া। আপনজনকে বাঁচাতে কি করুণ লড়াই, একটা করোনা রোগী নিয়ে পরিবারের হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি। ঠিক তার উল্টো চিত্রও অনেক। আপনজনকে বনে জঙ্গলে ফেলে চলে যাওয়া, ঘরে আঁটকে রাখা। এসব বলে শেষ করা যবে না, এই তো রাতেই নিউজ পড়লাম এই রাজধানীর এক হাসপাতালের মালিককে খুঁজছে আরেক হাসপাতালের মালিকরা। কথিত হাসপাতালের মালিক নিজের বাবাকে অন্য হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে লাপাত্তা। যাক এসব কথা।

করোনা মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে আসে তার প্রমান আমার সামনে। এই সাড়ে তিনমাস আমি পাগলাইয়াকে খুবই মনে করেছি। ১০/১২ দিন পর একবার সবজি বাজার করতে গিয়েই বারবার ওকে মনে করেছি। কেমন আছে ও, কেমন আছে ওর ছেলে আর স্ত্রী। জিজ্ঞেস করায় বলল-
— আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি। আফা কিছু সবজি নিয়ে এসেছি রাখবেন?

কি কি এনেছ জিজ্ঞাস করায় নাম বলল।
ঠিক আছে সব একটু একটু নিয়ে আসো। দরজা লাগিয়ে দিয়ে জামাতাকে নাস্তা দিই আর ভাবি ওর কথা।

এই এলাকায় আজ এগারো বছর আমি ভাড়া থাকি। আসার পরেই দেখি এলাকায় দুইজন লোক সবজি বিক্রি করে। ওরা দুজনেই ভাই ভাই। এলাকায় আসার বছর খানেক পর একদিন অভ্র’র স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি নিচে কয়েকজনের হইচই। এগিয়ে গিয়ে দেখি কালো মাঝারি শরীর গঠন লোকটাকে নিয়ে ওই দুই সবজিওয়ালা চিল্লাচ্ছে। বিষয় জানতে গিয়ে জানলাম এই লোক খাঁচিতে করে সবজি এনেছে এখানে বিক্রি করতে। কিন্তু ওরা একে বসতে দিবে না। আমি এর প্রতিবাদ করি, ওকে এখানে বিক্রি করতে বসার ব্যবস্থা করি। ওদেরকে বলি-
— তোমরা তো জমি কেননি, আবাসিক এলাকা এটা। তোমরাও বসবে পাশে ও বসবে। নইলে সবাইকে এখান থেকে তুলে দিব। কারো রিজিক কেউ নিতে পারে না।

অতঃপর সেই থেকেই ও এখানে সবজি বিক্রি করে। খাঁচিটা নিচে রেখে কয়েকটা বাসার কয়েকটা ফ্লাটে গিয়ে নক দেয়। যার যা লাগবে দিয়েই আসে। বাকিগুলো নিচে বসে বিক্রি করে। স্বভাবে কিছুটা পাগলা ধরণের বলেই সবাই নাম দিয়েছে পাগলাইয়া। অন্য সবজিওয়ালাদের চেয়ে পাগলাইয়া একটু কম লাভেই সবজি বিক্রি করে বলে ওকে ওরা দেখতে পারেনা। এই নিয়েও প্রায় ওর সাথে লেগে যায়। একটু কম লাভে বিক্রি করে বলে ওর সবজি দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। একবার শেষ হয়ে গেলে ও আবার দৌড় দেয় কারওয়ান বাজারে। ফলফলাদি নিয়ে আসে, বিক্রি করে।

আমি দোকানে গিয়ে কি কি কিনব দেখলেই সে অন্য কাউকে তখন কিছুই ধরতে দিবে না, বলবে-
— আগে আমার আফায় যা নেবার নেক, তারপর আপনারা।
এই আচরণে অনেকে মুখ গম্ভীর করে, আমি ওকে বুঝিয়ে বলি-
— এমন করতে নেই, যার রিজিকে যা আছে সে তাই নিবে।
আমাকে নিচে না পেলে উপরে আসবে, যা যা দরকার দিয়ে যাবে। একদিন নেয়ার পর বলে দিই, ৩/৪ দিন আর আসবে না।
তবুও দুদিন পর আসে। কলিংবেল দেয়, মেয়েরা বা আহসান দরজা খুললেই আস্তে বলবে-
— আফায় আছে, কিছু রাকব নি।
ওরা এসে আমায় বলবে-
— ওই যে তোমার পাগলাইয়া আসছে এক বোঝা সবজি নিয়ে।
মাঝে মাঝে ৫ কেজি করে আলু বা পিঁয়াজ নিয়ে আসতে দিই। দ্রুতই নিয়ে আসে। ওর ছেলে অসুস্থ্য হয়েছিল, হাসপাতালে ভর্তি করায়, অপারেশন হয়েছে। ওর স্ত্রীর ক্যান্সার। পাগলাইয়া ক্যান্সার বুঝে না, বলে-
— ঘা রোগ হইছে, ডাক্তার কইছে বালা অইত নো।
প্রতি শীতে এসে বলবে-
— আফা গরম কাপড় নেই, পুরান থাকলে একটা দেন।
আবার বলবে-
— আফা লুঙ্গিটা ছিরা, যদি দুইশ টাকা দিতেন একটা লুঙ্গি কিনতাম।
চেষ্টা করি কিছু হলেও দিতে। ঈদের সময় যা পারি দিই। ছেলের অসুখে সামান্য সহযোগিতা করেছি, পাড়ার অন্যরাও করেছে।
কলিংবেল বেজে উঠে, গিয়ে দরজা খুলি। যে ভাবে বলেছি সব এনেছে। হিসাব করে ২২০/ টাকা দিলাম। গতকাল বিকেলে ৫০/ টাকা কেজি করে আধা কেজি বেগুন কিনেছি, আর পাগলাইয়া এখন ৩০/ টাকা কেজি বেগুন দিয়ে গেলো। ও হিসাব করেনা, আমি করে তাই দিই। হিসাব মতো টাকা পেলেই নিজের টুকরি থেকে কয়টা পটল নয় কয়টা লেবু আবার তুলে দেয় আমার ঢালায়। বকা দিলেই বলে-
— এটা আপনার জন্যে।
বিক্রি হিসাব শেষে আবদার করে ঈদের বখশিশ। বললাম-
— ঈদ তো গেছে দেড় মাস হল।
— আমি জানি আফায় আমার ডা রাইখা দিব।
— পরে আইসো।
— আফা আইজ হাইলে কামে লাগতো, কয়ডা বাজার আইনা বিক্রি করতাম।

ফেরাতে পারিনি পাগলাইয়াকে। মাঝে মাঝে সকালে আসলে যাই থাকে ঘরে বাসি বা তাজা রুটি দিলে খুব খুশি হয়। ওকে সবাই পাগলাইয়া বলে, বলি আমিও। কিন্তু ওর মতো সহজ সরল মানুষের খুব অভাব বোধ করি আমি। কি সহজ ভাবেই উত্তর দিলো ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌, আফা ভালো আছি’। ভালো থাকো পাগলাইয়া, এই করোনা কালে ভালো থাকার চেয়ে বেঁচে থাকাই যে আমাদের অনেক লড়াই।

 

 

 

লেখক: সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে ঢাবি শিক্ষার্থীর আবেগঘন চিঠি

আরিফ চৌধুরী শুভ :: হারিয়েছি না হেরে গেছি আমরা? আ্যাম্বুলেন্স চলছে সারেইন ...