রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গুরুপ্রসাদ মহান্তি ‘স্বরাট্,বিরাট’

গুরুপ্রসাদ মহান্তি

স্বরাট্, বিরাট  

গুরুপ্রসাদ মহান্তি

তখনকার দিনে আশি বছরের জীবত্কালকে দীর্ঘই বলতে হবে। কিন্তু জীবনের দীর্ঘত্বই মাত্র মহাজীবনের লক্ষণএমনটি তো নয়। গড়েপিটে নেওয়া জীবন একপ্রকার, অর্থপ্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তিও জীবনের বড় দিক নিঃসন্দেহেকিন্তু একজীবনে মহতো মহীয়ান হয়ে ওঠা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অর্থবহ একটা জীবন তো বটেই, ঋষিকল্প জীবনের জন্য একটি তপস্যা চাই। কঠোর এবং কৃচ্ছ্রসবই তো চাই। সাধনার চড়ান্তপর্বে পৌঁছেছিলেন বলেই না পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের তালিকায় রবীন্দ্রনাথ। তিনি স্বরাট্তিনি বিরাট। বিরাটত্বে পৌঁছুনোর রাস্তাটা আদৌ সুগম ছিল না। সে লোকে যাইই বলুক। লোকে বলে জমিদারপুত্র তিনি, জমিদারও। তাই নিশ্চিন্তমনে নিজের কাব্যচর্চা করতে পেরেছেন। অন্যের বলে ফেলাটা যত সোজা, বাস্তবে ঘটনাক্রম একেবারে বিপরীত। শোকের সহচর রবীন্দ্রনাথকে জীবনপথে যেভাবে হাঁটতে হয়েছে তা যেন ঘোর শত্রুকেও করতে না হয়। যত বেদন তাঁকে দেশবাসীর কাছ থেকে সইতে হয়েছে, তাও নিঃসীম। যে বাধা তাঁকে জীবনভর মোকাবিলা করতে হয়েছেএককথায় তাও অকল্পনীয়। এর পরও তিনি শান্ত-সমাহিত। ঋষিকল্প প্রজ্ঞা এবং দৃষ্টি এরপরও যে তিনি রক্ষা করে চলতে পেরেছেন জীবনের শেষদিন পর‌্যন্ততাতেই তো সচকিত এবং একই সঙ্গে চমকিত হতে হয় প্রত্যেককে।  এমন স্পর্শকাতর কবি দ্বিতীয় কাউকে কে দেখেছে? তিনি মানুষের জীবনোন্নয়ন ও হৃদয়বৃত্তির বিকাশে নিরলস কাজ করে গিয়েছেন। বলছি বলেই মানতে হবে এমন কোনও মাথার দিব্য নেইএকজন কবি ব্যাঙ্ক খুলছেন। শান্তিনিকেতনে কূপ-খননের জন্য অর্থব্যয় করে চলেছেন। স্বদেশিদ্রব্য বিক্রয়ের জন্য বিপণি খুলছেন। সর্বোপরি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি পরিত্যাগ করছেন। আমরা সামান্য বৃত্তির মানুষজন তাঁর উচ্চতার কথা ধারণায় আনতে পারি কই? কবি তিনি, শিল্পী তিনি। সর্বোপরি জীবনশিল্পী। যে সুর তিনি বাঙালির জন্য রেখে গিয়েছেন, তার তুলনা দ্বিতীয় কিছুর সঙ্গেই হয় না। আনন্দে-শোকে-দুঃখেমানুষ রবীন্দ্রগানে বিভোর হতে পারে। এমন স্রষ্টার পদানত আমাদের যুগে যুগেই থাকতে হয়। লম্বা বাঙালি মানুষের দলে অগ্রগণ্য তিনি যে থাকবেনই এটি বলার অপেক্ষা আজ কেন, কবির জীবত্কালেই ছিল না। তাঁর কারণেই তো উজ্জ্বল সব বিশ্বজ্যোতিষ্ক ভারতের সঙ্গে নাড়ির যোগ স্থাপন করেছেন। কবিকে এরপরও নিন্দুক বাঙালি ছেড়ে কথা কয়নি। এমনকী তাঁর সাহিত্য ও চিত্রের সমালোচনার নামে কুত্সাই করেছে অনেকে। কবি ব্যথিত হয়েছেন। অসম্ভব যন্ত্রণায় আছাড়ি-বিছাড়ি অন্তরে। কিন্তু তবু কোনও মানুষের বিরুদ্ধে তিনি কটুবাক্য প্রয়োগ করেননি। স্থিতপ্রজ্ঞ তিনি। ঔপনিষদিক সারাত্সার ধারণ করেছিলেন অন্তরে। শান্ত-সমাহিত থেকে ঋষিত্বে উত্তরিত হয়েছিলেন। সেই স্বরাট, বিরাটকে প্রণতি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সংখ্যালঘু ও নির্যাতন

প্রসঙ্গ: সংখ্যালঘু ও নির্যাতন

নজরুল ইসলাম তোফা :: প্রত্যেকটি গ্রাম এবং শহর এক অদৃশ্য দাগেই যেন ...