জুঁই জেসমিন

জুঁই জেসমিন :: কেউ থেমে নেই!  সবই চলছে, চলন্ত সিঁড়ির মতো। মরুভূমি, হাহাকার খাঁখাঁ শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। চলছে রকমারি অনলাইন ক্লাশ, শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে স্মার্ট ফোন। মাটিতে পা নেই—উড়ছে আবেগে, উড়ছে প্রযুক্তিতে, উড়ছে ঝরছে অনেকেই ধ্বংসের আলিঙ্গনে। আড্ডার প্রান্তর এখন অনলাইন গ্রুপগুলো। গড়ে উঠছে ক্রমশ গ্যাংকালচার নামে আর এক ধ্বংসের খেলা ঘর।

এ যুগে এখন সন্তান করেনা বাবা মাকে ভয়, বরং বাবা মায়েরাই  সন্তানের ভয়ে জড়োসড়ো,  ঠিক প্রজার মতো। সাত লাইন বেশি বোঝে এ সময়ের সন্তানেরা যেন। যা চায় তাই দেওয়া লাগে,  যা বলে তাই মানতে হয়, এসব এ যুগে বেশ আজব ধর্ম। বিদ্যালয় বন্ধ, খাওয়াদাওয়া ঘুম সব অনিয়ম। কে রাখে কার কথা চলে তর্কের ঝড়।
তুরস্কের বিখ্যাত প্রবাদে

“সৌন্দর্য একদিন তোমাকে ছেড়ে যাবে, কিন্তু জ্ঞান চিরদিন তোমার সাথে থাকবে” চিরন্তন সত্য প্রবাদ, কিন্তু কে শোনে বা মানে  জ্ঞানীর কথা?  দৈহিক সৌন্দর্য  বাড়াতে মাতামাতি সবাই।

ব্যস্ত শহর, ব্যস্ত বাজার,  ব্যস্ত  সব পর্যটন গুলো জনসমুদ্রের উত্তালে।  চলছে অফিস,চলছে  আদালত,হচ্ছে বিয়ে, হচ্ছে সব উৎসব, সবই চলছে সবই হচ্ছে, বন্ধ শুধু শিক্ষালয় গুলো। ঝুলছে তালা সেই কবে থেকে আজও।  মধ্যশ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বড় অসহায়!  না হাতে ফোন, না আকাশ টেলিভিশন অনলাইন ক্লাস করার, না সামর্থ কোচিং ক্লাস করার। যত আকাল গরীব ও মধ্য শ্রেণির ঘরে।

তুমুল চলছে চুপিচুপি  কোচিং সেন্টারগুলো মহা উৎসবের মতো। ছুটছে ধনী ঘরের শিক্ষার্থী, এ বেলা সেবেলা।
ক্লাশ হবেনা সরকারের বিশেষ নিষেধাজ্ঞা,  অথচ ঠিক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়ে আসে। আর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র বাড়িতে নিয়ে এসে যে যার খুশিমত বাড়িতে বসে পরীক্ষার খাতা বোঝায় করে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জমা দিয়ে আসে। এই যাওয়া আসার মানেটা কী?  হচ্ছে অনলাইন মারফত পরীক্ষা।  যদি যেতেই লাগে এসাইনমেন্ট দিতে, যদি  যেতেই লাগে প্রশ্ন পত্র নিতে ও পরীক্ষার খাতা জমা দিতে, তবে ক্লাশ করতে সমস্যাটা কোথায় আর পরীক্ষা গুলো নিতে সমস্যাটা কোথায়?
আড্ডা, খেলাধুলা,  ঘুরাফেরা সবই তো চলে,  কে বা কারা  গৃহবন্দী হয়ে আছে বিশেষ সচেতনতায় নিয়ম নিষেধ আজ্ঞায়? কেউ নেই! তবে?

যেহেতু যে যার মতো চলছে, কী প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তালা ঝুলিয়ে রাখার?
অন্যান্য দেশকে অনুসরণ অনুকরণ করার আগে নিজ দেশের অবস্থাটা কেমন তা আমাদের বুঝতে হবে।  কারণ বাইরের দেশ গুলোর মতো আমাদের দেশ উন্নত না বা শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেশ চাঙ্গা নয়। গ্রামাঞ্চলের কত শত শিক্ষার্থী রোজ ঝরে যাচ্ছে, বেড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার গণ্ডী থেকে তা ভাবার বাইরে। এই একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ থাকার কারণে।

আজ শত সহস্র অপ্রাপ্ত বয়সে নারী শিক্ষার্থীর
বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। পরিবার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে! আর মেধাবী ছাত্ররা দিনদিন  আড্ডা আর ঘোরাফেরায় নষ্টের পথে। বাংলাদেশের অনুকূল হাওয়ায় প্রতিকূল হয়ে উঠছে সমাজ, পরিবেশ – হচ্ছে ধর্ষণ, করছে  হত্যা, চলছে অপহরণ এসব অমানবিক ভয়ংকর  ঘটনা রোজ।  নিরাপত্তায় কোথায়?
উশৃংখল ভাবে যেমন ছেলেমেয়ে ঘোরাঘুরি করছে তেমনি উশৃংখল ঘটনাও ঘটছে যত্রতত্র।  উদাসীন বাবা মা, উদাসীন সন্তান, ছেলেমেয়ে,,,,

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর এক উক্তি-এই সময় চক্রে বেশ ক্ষত করছে হৃদয় ” আমি নষ্ট করেছি সময়, এখন সময় নষ্ট করছে আমায়।“ হ্যাঁ একদম তাই এই এক লম্বা সময় দিন মাস বছর ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ , বৃহৎ আকারে নষ্ট হচ্ছে ছেলেমেয়ে শিক্ষার্থীর জীবন। থেমে যাচ্ছে স্বপ্নের চাকা।

আর এদিকে-
বাবা মায়ের দৌড় অর্থ উপার্জনের নেশায়, অবশিষ্ট সময় এ যুগের  রকমারি জোকারি টিউব চ্যানেলে চোখ। আর প্রযুক্তির হাওয়ায় দোলে পরকীয়ার খেলা। ভাসুক সংসার,  নষ্ট হোক ছেলেমেয়ে, দেখার সময় নেই, ভাবার সময় নেই!

এ জগতে শিক্ষক ও বাবা মা ছেলেমেয়েদের কাছে শ্রেষ্ঠ হয়ে না উঠতে পারলে সন্তান বা শিক্ষার্থী বিন্দুমাত্র দাম দেবেনা,  বাবা মায়ের উদ্ভট চলাফেরা চিন্তাভাবনা,  কর্ম অপকর্ম সব মিলিয়ে যেন সন্তানের চোখে অতি তুচ্ছ হয়ে যায় বাবা মা। দাম বলতে কিছুই থাকেনা। এ ক্ষেত্রে কী করে একজন শিক্ষার্থী বা সন্তান দাম দেবে গুরুজনকে?  মানুষ গড়ার নামে ভালো রেজাল্ট করার নামে বড় কারখানা হলো কোচিং সেন্টার। সারাদিনের দৌড় শিক্ষার্থীর, কোচিং  সেন্টারে! কোচিং সেন্টার গুলো তো ঠিক চলছে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে,,,  কী প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হওয়ার?
শিক্ষার্থীর লাশ পড়ে থাকছে নদীতে,  কালভার্টে, জংগলে, পুকুরে!প্রতিনিয়ত  ধর্ষণের খবর। ধর্ষকদের কানে পৌঁছায়নি আজও সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের খবর। দেশ আছে দেশের মতো,  ঘরে ঘরে ভারতীয় চ্যানেলে সবাই ব্যস্ত শত।  কে রাখে দেশের খবর! চ্যানেল গুলো ব্যস্ত গরম খবরের আয়োজনে। পুড়ুক বস্তি,  জ্বলুক আগুন,  সারি সারি হোক ধর্ষিতার লাশ, মরুক দূর্ঘটনায় এরা ওরা। পত্রিকার পাতায় হোক বড় বড় শিরোনাম।

ক’জন বলতে পারবে দেশের টিভি চ্যানেল গুলোর নাম? ক’জন বলতে পারবে কৃষি মন্ত্রীর নাম? ক’জন বলতে পারবে  দেশ বরেণ্য খ্যাতিমান শিল্পী গুলোর নাম? আপনার সন্তান কী দেশীয় চ্যানেল দেখে? সংসদ বাংলাদেশ  টিভি চ্যানেলে যে ক্লাস গুলো হয় তা কী  জানে, বা দেখে তারা?
আনন্দ বিনোদন আর ব্যক্তি স্বার্থের দৌড়ে ছুটছে সবাই। ব্যবসা এখন সকল স্তরে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবসা,  চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবসা, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা।

মার্ক জুকারবার্গ (ফেসবুক প্রণেতা) বলেন-
আমরা মানুষের সম্পর্কে কী জানতে চাই ,সেটি প্রশ্ন না ৷ প্রশ্ন হল , মানুষ তাদের সম্পর্কে কতটুকু জানতে চায় ৷ “এই জানাজানিটাও বেশ রঙিন বা রঙচটা যে যার মতো ভাবছে যে যার মতো ছুটছে! নিজেকেই বড় করে দেখছে।
স্কুল কলেজ ভার্সিটি এসব প্রাঙ্গণে পা রাখলেই কোভিট ১৯ জাপটে ধরবে ঘাপসে খাবে, জান’এ মারবে, প্রাণে মারবে এই যেন এক প্রকট ধারণা।  কোভিটের বীজ বোধ হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই  ভয়ংকর ভাবে ছড়ানো। তাই হয়তো, এই কঠিন কঠোর আইন ব্যবস্থা!

আজ পার্ক গুলোতে গুচ্ছ গুচ্ছ কিশোর কিশোরী, তরুণ তরুণীর ভিড়, অনেক পরিবার  সন্তান সহ  যাচ্ছে ট্যুরেতে- কক্সবাজার, বান্দরবান,সাজেক সহ  রঙ রকমারি জায়গায়।  যেখানে স্কুলে যাওয়া বন্ধ কলেজে যাওয়া বন্ধ সেখানে লম্বা ট্যুর ?
ভাবুন তবে—!

গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,  এ অবধি সেগুলো খোলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেই!
এই করোনা মহামারি শুধু প্রাণ নিচ্ছেনা,,,  অচল করে দিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।অগণিত শিক্ষার্থী দিনে দিনে ঝরে যাচ্ছে। সবই তো খোলা, কোম্পানি, মার্কেট, কারখানা, চলছে ব্যবসা বাণিজ্য, তাহলে মানুষ গড়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো খোলা থাকবেনা কেন? বন্ধ করলে সব বন্ধ করতে হবে। আর কত দিন এভাবে?

এ,পি,জে,  আব্দুল কালামের মহামূল্য উক্তি-
” জীবন আর সময় হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, জীবন শেখায় সময়কে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে, আর সময় শেখায় জীবনের মূল্য দিতে।”অথচ  জীবন ব্যস্ত যেনো  বিনোদনে, আর সময় – কে ভাবে সময়ের কথা- এই না ভাবাটা হয়তো ঠিক সময়ে বুঝিয়ে দেবে আমাদের প্রত্যেককে- কতটা ক্ষতিগ্রস্থ বা পিছিয়ে গেলো জীবনের সোনালী অধ্যায়।  যা ফিরে পাওয়া অসম্ভব অকল্পনীয়।

মহাত্মা গান্ধীর সেরা উক্তি
”ব্যক্তির দেহ, মন ও আত্মার সুষম বিকাশের প্রয়াস হলো শিক্ষা।“-  শিক্ষা আসলে কী শুধু পাঠ্যপুস্তকের প্রতিটি অক্ষর গিলে খাওয়া আর পরীক্ষার রুমে বের করা,  শিক্ষা মানে কী দিন রাত কোচিং সেন্টারে ছুটোছুটি -?
দেহ ও মন কোথায় গিয়ে মচকে পড়ছে দিন দিন- আত্মার সুষম বিকাশ হবে কথা থেকে?
সত্যি কথা বলতে আমরা শিক্ষার সঠিক ব্যবহারটাই ভুলে যাচ্ছি তুমুল প্রতিযোগিতা আর হার জিত ব্যক্তিস্বার্থের প্রবণতায়।

অনেক শিক্ষার্থীই নিজে টিউশন বা অন্যান্য পার্ট-টাইম চাকরি করে পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতো, করোনার কারণে ঘরে ফিরে স্বপ্ন ভ্রষ্টা হয়ে গেছে, শিক্ষার্থীরা কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত তা কল্পনার বাইরে। তাদের মাঝে শালীনতা,  নম্রতা ভদ্রতা এসব হারিয়ে যাচ্ছে,  উগ্রতা মনোভাবে চলে ভুল পথে।

সক্রেটিসের এক মূল্যবান উক্তি- ”দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।”
চিন্তার সৌন্দর্য কোথায় এখন?  চারদেয়ালে বন্দী হাজারো সাধারণ ঘরের শিক্ষার্থী।যেখানে চিন্তার সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটাতে বাধা সেখানে দেহের সৌন্দর্য বাড়ানো প্রশ্নই আসেনা।

নিয়ম নীতি মেনে সচেতনতায় এক বেঞ্চে দুজন বা একজন শিক্ষার্থী বসে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দৈনন্দিন কী ক্লাস করা সম্ভব না, পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না? নিশ্চয় সম্ভব। হাটে বাজারে আড্ডায়,এবং কি স্বজনদের বাসায় যেতে যেহেতু সমস্যা হচ্ছেনা, ঠিক যাওয়া হচ্ছে যেথা খুশি, তবে স্কুল কলেজ কেন চলবেনা,পরীক্ষা দেওয়া কেন চলবেনা?

-বিশ্ব কবিগুরু রবী ঠাকুরের উক্তি-
” আমাদের শিক্ষার মধ্যে এমন একটি সম্পদ থাকা চাই যা কেবল আমাদের তথ্য দেয় না, সত্য দেয়; যা কেবল ইন্ধন দেয় না, অগ্নি দেয়।” আর না আসুন তবে আমরা  শিক্ষার মধ্যে সম্পদ খোঁজে তথ্য সত্য দুটোই বিদ্যমান রাখি শিক্ষাকে সম্পত্তি রূপে ব্যবহার না করে  কুচক্রের ঘরে উন্মাদ ভাবে দাবা না খেলে প্রকৃত শিক্ষায় সম্পদে পরিণত করে শিক্ষিত হই, জ্বলে উঠি সত্য শান্তি ন্যায়ের মশাল জ্বালিয়ে।
পরিশেষে সবার চাওয়া হোক এক চাওয়া

শিক্ষার্থী যাক শিক্ষালয়ে
আলো ছড়াক মানুষ হয়ে,
স্বপ্ন দেখুক জনে জনে–
আসুক বিজয় দৃঢ় পণে।

 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী। 
[email protected] 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here