ইমা এলিস/ বাংলা প্রেস, নিউ ইয়র্ক ::
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ছাত্রনেতা আতিকুর রহমান সালু মারা গেছেন (আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী)। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৫ ডিসেম্বর) ভোর পৌনে ৫টার দিকে নিউজার্সির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছি ৭৫ বছর। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। গত সপ্তাহে নিমোনিয়ায় আক্রান্তের পর নিউজার্সির প্যাসিক সিটির হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।তিনি নিউজার্সির প্যাসিক সিটিতে বসবাস করতেন।  যুক্তরাষ্ট্রের বাংলা সংবাদমাধ্যম বাংলা প্রেস এ খবর জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির ও যুক্তরাষ্ট্রের ফোবানা’র সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন আতিকুর রহমান সালু। চলতি বছরের মাঝামাঝি তার ক্যান্সার রোগ ধরা পড়ে। এরপর থেকেই তার চিকিৎসা চলছিলো এবং তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মতি কেমো নিচ্ছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি নিমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে গত ৩০ নভেম্বর শনিবার তাকে নিউজার্সির প্যাসিক সিটির একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী প্রয়াত আতিকুর রহমান সালু ১৯৪৮ সালে টাঙ্গাইলে জন্ম গ্রহন করেন সনে। হাই স্কুলের শেষ টাঙ্গাইল জেলার ঐতিহ্যবাহী করটিয়া কলেজ (বর্তমানে সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) ছাত্র সংসদের এজিএস এবং সেখান থেকে গ্র্যাজুয়েশন ও পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও পরবর্তীতে আইনে ডিগ্রী লাভ। এর মাঝে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সনের টাঙ্গাইলের প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনে তথা ঢাকা সহ তৎকালীন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী ছাত্র গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান ও কারাবরণ করেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন টাঙ্গাইল মহুকুমা-তথা টাঙ্গাইল জেলার সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি পদ ও পরবর্তীকালে অভিবক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীকালে সংগঠনের (মেনন গ্রুপ) সাংগঠনিক সম্পাদক, পর্যায়ক্রমে পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন তথা বাংলাদেশ বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে ১৯৬৯ এর সুমহান গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ছিলেন অন্যতম সংগঠক। মূলত কবি সালু ছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী। সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা।
১৯৭০ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারী ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত লক্ষ লোকের সমাবেশে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা কায়েমের প্রস্তাব হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাঠ করেন সংগঠনের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুর রহমান সালু। অনেক আত্মত্যাগ ও লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশ, আমাদের সুমহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা অসামান্য। ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ সময়ে ভারতে অন্তরীণ মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি নামে যে কমিটি গঠিত হয় তিনি ছিলেন সেই কমিটিরও কেন্দ্রীয় সদস্য। বিভিন্ন সময় পট পরিবর্তনের হাওয়াতেও আতিকুর রহমান সালু আদর্শচ্যুত হননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা ও ফারাক্কা লং মার্চের মহানায়ক মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সান্নিধ্যে থেকে দেশ ও জনগণের জন্যে নির্লোভভাবে কাজ করে গেছেন। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চে অংশ গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ২০০৫ সালের ৪ঠা মার্চ আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির উদ্যোগে উজানে ভারতের এক তরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে ও আমাদের নদী পানির অধিকার রক্ষা ও আদায়ের জন্য কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীতে অনুষ্ঠিত লং মার্চেও অন্যদের সাথে নিয়ে নেতৃত্ব প্রদান করেন, যেখানে ৫ লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে। তিনি আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
আতিকুর রহমান সালু ছিলেন কবি, গীতিকার, সুরকার, লেখক, অ্যাক্টিভিষ্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬০ দশক থেকে সমানতালে কাব্যচর্চা করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আনিকার জন্য কবিতা’ এবং ও দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘অন্য রকম কবিতা’। আনিকা ছিলো আতিকুর রহমান সালুর ছোট মেয়ে। ২০০৬ সালের ৩০ মে আমেরিকার ভার্জেনিয়ায় এক গাড়ী দূর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে সফল অস্ত্রপচার পরবর্তীকালে অকালে মৃত্যুবরণ করে ১৬ বছর বয়সের আনিকা ৩১ জুলাই ২০০৬ মার যান।  
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here