ইমা এলিস/ বাংলা প্রেস, নিউ ইয়র্ক ::
বুলবুল ললিতকলা একাডেমির খ্যাতনামা নৃত্যবিদ ও হার্ভার্ড স্কুল অব ডান্সের শিক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন প্রবাসী দুলাল তালুকদার মারা গেছেন। শনিবার (১১ মে) ম্যাসাচুসেট অঙ্গরাজ্যের বোস্টনের পার্শ্ববর্তী মেডফোর্ড শহরে নিজ বাড়িতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান (ইন্নালিল্লাহে –রাজেউন)।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা রোগে ভুগছিলেন। তিনি স্ত্রী সাবিহা তালুকদার ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বোস্টন প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা টিপু চৌধুরী ও তাঁর ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক তালুকদার এ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নৃত্যবিদ দুলাল তালুকদার হার্ভার্ড স্কুল অব ডান্সের শিক্ষক নৃত্যবিদ দুলাল তালুকদার। তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। বাঙালি শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা। তিনি একাধারে নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক, কোরিওগ্রাফার ও সংগীতজ্ঞ।
দুলাল তালুকদারের জন্ম ১৯৪৬ সালে কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন। সেই থেকে কমলাপুরের ঠাকুরপাড়ায় তাঁদের বসবাস। ছেলেবেলায় গান ও নাচ শেখার ঝোঁক ছিল। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারসহ তাঁরা মোট ৫ ভাই। এর হলেন মশিউর রহমান তালুকদার, তমাল তালুকদার। আরেক ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে নিউ হ্যাম্পশয়ারে বসবাস করছেন। তাদের দেশের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার পুর্বধলা উপজেলার হাপানিয়া গ্রামে।
দুলাল তালুকদারের সৃজনশীল নাচের কম্পোজিশনে গভীর যত্ন, নিষ্ঠা, শৈল্পিক বোধসহ নানা আঙ্গিক ও শৈলী সার্থকভাবে ফুটে ওঠে। ‘আমি দুলাল তালুকদার’ নামে তাঁর জীবনস্মৃতি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে। বইটিতে স্থান পেয়েছে একটি রক্ষণশীল পরিবার ও সমাজের ব্যূহ ভেদ করে কিভাবে তিনি নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠলেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন, রয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা।
তখন সদ্যঃপ্রতিষ্ঠিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা) ভর্তি হতে উৎসাহিত করেন তাঁরই বড় ভাই গল্পকার ও  সাবেক নির্বাচন কমিশনার  মাহবুব তালুকদার। এরপর বাফায় ভর্তি হওয়া এবং নাচ শেখা শুরু। ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া বাফার নাচের ক্লাসে প্রথম শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন মন্দিরা নন্দী, দুলাল তালুকদার ও রাহিজা খানম ঝুনু। তাঁদের নৃত্যগুরু অজিত সান্যাল ছিলেন নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরীর দলের অন্যতম সদস্য। ১৯৬৩ সালে নবাবপুর স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে।
তারপর দেশ-বিদেশে নাচ বিষয়ে পড়াশোনা ও নিবিড় চর্চায় মনোযোগ দেন। গত শতকের ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন।
ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, ইরানের বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভি, চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন দুলাল তালুকদার। তিনি সান্নিধ্য পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বখ্যাত ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, গজলসম্রাট মেহেদী হাসান, নৃত্যরানি সিতারা দেবী, উদয়শঙ্কর, পণ্ডিত রবিশঙ্করসহ বহু গুণীর।
১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে দুলাল তালুকদার যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান স্থায়ীভাবে। সেখানে তিনি নাচের শিক্ষক ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), বোস্টন ইউনিভার্সিটি, বিশ্বখ্যাত লোকনৃত্যদল ‘মান্দালা’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। তিনি দীর্ঘদিন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ডান্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here