শৌল বৈরাগী

শৌল বৈরাগী :: পৃথিবীতে যত মহান ব্যক্তি, যারা মানব জাতির মুক্তির জন্য কাজ করেছেন যীশু তাদের অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ একজন। তিনি ইস্‌্রায়েল দেশের নাসারত গ্রামে মেরীর গর্ভে অলৌকিকভাবে জন্ম গ্রহণ করেন। অলৌকিক, কারণ মেরীর গর্ভে তিনি কোন পুরুষের সংষ্পর্শ ছাড়াই জন্ম গ্রহণ করেছেন; শুধু মাত্র ঈশ্বরের ইচ্ছাতে এবং পবিত্র আত্মার প্রভাবে। তিনি তিনটি সত্বা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন: একই সময়ে তিনি পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। একই সাথে এই তিন সত্ত্বার অধিকারী যা একটি নিগুঢ় ঐশ রহস্য। তাঁর জীবন কাল খুবই কম সময়। মাত্র ৩৩ বছর মতান্তরে ৩০ বছর। তাঁর জীবনের ছোট বেলার কিছু ঘটনা আমরা জানতে পারি। এরপরে আমরা দীর্ঘ সময় আর তেমন কিছু জানতে পারি না। তিনি মাত্র তিন বছর তাঁর প্রচার কাজ করেছেন। এই তিন বছরে তিনি উপাসনালে পবিত্র ধর্ম গ্রন্থের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ঈশ্বরের কথা প্রচার করেছেন, অনেক অনেক আশ্চার্য কাজ করেছেন, রোগীদের সুস্থ্য করেছেন, মৃতকে জীবন দিয়েছেন, শিষ্য এবং অনুসারী তৈরী করেছেন, পথভ্রষ্ট লোকদের পাপ থেকে মন ফেরানোর আহবান করেছেন, নৈতিকতা ও ধর্ম বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন বিভিন্ন উপমা ব্যবহার করে, সমাজপতিদের ভ্রান্ত ধারণা বদলে দিতে প্রতিবাদ করাসহ আরো অনেক কাজ করেছেন। যীশুর এ কাজগুলো করা এতটা সহজ ছিল না যতটা সহজে এখানে বর্ননা করা হলো বা পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত আছে। কাজগুলো করা খুবই কঠিন ছিল। কারণ সমাজের বহুদিন বা বহু বছর যে ধারণা বা নিয়ম প্রচলিত ছিল তাঁকে এগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলতে ও কাজ করতে হয়েছে।

আর এ কাজগুলো করে তিনি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন; অন্যদিকে তৎকালীন সমাজপতি ও ধর্মগুরুদের ঠিক ততটাই বিরাগভাজন হয়েছিলেন। যীশুর প্রচার, রোগী সুস্থ্য করা এমনকি মৃত ব্যক্তির (লাসার) জীবন দেয়া, আশ্চার্য কাজ এবং ধর্ম গ্রনে’র সঠিক ব্যাখ্যা দেয়ায় জনগণ তাকে মহান ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে; তিনি যেখানে যান জনগণ তাঁকে অনুসরণ করেন। একইভাবে সমাজপতি ও ভন্ড ধর্মগুরুদের গুরুত্ব জনগণের কাছে কমতে থাকে। এজন্য সমাজপতি, ফরীশী ও ধর্মগুরুরা যীশুকে ফাঁদে ফেলার জন্য এবং দোষ বের করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। এই চতুর এবং ভন্ডগুরুদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস জনগণের ছিল না। আজও আমাদের সমাজের প্রতি স্তরে স্তরে এমন সমাজপতি, নেতা ও ধর্মগুরু বিরাজমান। যারা অর্থবল, লোকবল, সম্পদবলে বলীয়ান এবং তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতিত-নিষ্পেষিতরা কথা বলতে বা প্রতিবাদ করতে পারে না। এরা সমাজে এমন বলয় সষ্টি করে রাখে যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তার ফল হয় মারাত্মক। কিন’ যীশু সে অত্যাচারিত সমাজ ভেঙ্গে ফেলার দৃঢ়তা দেখিয়েছেন।

যাহোক, চতুর এবং ভন্ড ধর্মগুরুরা যীশুর বিরুদ্ধে অভিযোগ বা দোষ খুঁজতে লাগল। তারা (সমাজপতি, ফরীশী ও ধর্মগুরু) যীশুর সব কথা, প্রচার এবং তথ্য সংগ্রহ করে করে কয়েকটি অভিযোগ এনে দাঁড় করালো। যেমনঃ যীশু বলতেন, ’তিনি ঈশ্বর পুত্র’। তাই তাদের অভিযোগ হলো তিনি নিজেকে ঈশ্বর পুত্র বলেছেন এবং এটি ঈশ্বর নিন্দা। যীশু বলেছেন যে, তিনি ইহুদীদের রাজা এবং তিনি জেরুশালেম মন্দির ভেঙ্গে আবার তা তিন দিনের মধ্যে গড়ে তুলতে পারেন। এমন কতগুলো অভিযোগ যীশুর বিরুদ্ধে সমাজপতি ও ধর্মগুরুরা সাজিয়ে তাঁকে দোষী সাবস্ত করার ষড়যন্ত্র করে। অবশ্য উপরের যীশুর কথাগুলোর নিগুঢ় রহস্য সমাজপতি, ফরীশী এবং ধর্মগুরুরা বুঝতে পারেন নাই। তারা শুধু কথাগুলোর আভিধানিক অর্থই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন’ যীশুর কথাগুলো যে ঐশতত্ত্ব নির্ভর এবং এর যে নিগুঢ় অর্থ আছে এবং এগুলো যে জাগতিক কথা নয় তা তারা বুঝতে পারেনি। এমন সব অভিযোগগুলো এনে যীশুকে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য ফরীশীরা দলবল নিয়ে যীশুকে গেৎসিমানী নামক বাগান থেকে, যেখানে যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে প্রাথর্না করছিলেন সেখান থেকে আটক করেন। আটক করে তারা প্রধান যাজক কাইফার কাছে বিচারের জন্য নিয়ে যায়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ইস্রায়েল তখন রোম সাম্রাজ্য দ্বারা পরিচালিত হতো। রোম সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ রোম সম্রাট কর্তৃক নিয়োজিত শাষনকর্তারা নিতে পারতেন। সমাজিক ও কম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ ’মহাসভা’ যা ৭১ জন সদস্য দ্বারা গঠিত তারাই নিয়ে থাকতেন। এই ৭১ জন সদস্যের মধ্যে ছিলেন যাজক বংশের মানুষ, ইহুদী জাতির প্রবীণ নেতা, সুপন্ডিত বা শাস্ত্রজ্ঞ। এই মহাসভার প্রধান হলেন প্রধান যাজক যাকে মহাযাজকও বলা হতো। এই মহাসভা বা প্রধান যাজকই সমাজের সাধারণ সমস্যাসমূহ সমাধান করতেন। কিন’ যেখানে মৃত্যুদন্ডের মত সিদ্ধান্ত থাকত বা এ ধরণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতো তা মহাসভার সুপারিশ মত বা তাদের সুপাশি অগ্রাহ্য করেও রোম সম্রাটের স্বার্থ বজায় রাখার জন্য যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন কেবল মাত্র রোম সাম্রাটের নিয়োজিত শাষণকর্তা। যীশুর সময়ে ইহুদীদের শাষণকর্তা ছিলেন পিলাত এবং রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন সিজার।

তাই যীশুকে ধর্ম যাজকেরা, সমাজের নেতারা এবং ফরীশীরা ধরে এনে মহাযাজক কাইফার নিকট দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের জন্য নিয়ে গেলেন। ইতিমধ্যেই শাস্ত্রীরা এবং প্রবীণ নেতারা মহাসভায় উপসি’ত হয়েছেন এবং যীশুর বিরুদ্ধে শক্ত অভিযোগ গঠনের চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত তারা যীশুর বিরুদ্ধে ঈশ্বর নিন্দা এবং রাজদ্রোহিতার অভিযোগ অভিযোগ গঠন করেন। যীশুকে দোষী সাব্যস্ত করতে সেদিন মহাসভার ২টি অধিবেশন বসেছিল। একটি বিকাল রাতে এবং আরেকটি ভোর রাতে। মহাসভা অভিযোগ গঠন করার পর তারা রোম সাম্রাজের শাষণকর্তা পিলাতের নিকট নিয়ে যায়। পিলাত সবকিছু দেখে এবং শুনে যীশুকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার মত কোন দোষই খুঁজে পেলেন না। তাই তিনি তাঁকে মুক্তি দিতে চেষ্টা করলেন।

কিন্তু যাজকেরা, প্রবীণেরা, নেতারা, ফরীশীরা জনতাকে লেলিয়ে দিলেন। তাই সমবেত জনতা বার বার চিৎকার করে বলতে লাগল যে ’তাকে যেন ক্রুশে দেয়া হয়’। তারা পিলাতকে এমনও বললেন যে পিলাত যদি যীশুকে ক্রুশে না দেয় তবে তিনি সিজারের বন্ধু নন বরং শত্রু। সিজার তখন রোজ সাম্রাজ্যের সম্রাট। পিলাত উভয় সংকটেই পড়লেন। জনগণ একটা গন্ডগোল সৃষ্টি করতে পারে যা হবে পিলাতের জন্য খারাপ এবং তারা রোম সম্রাট সিজারের নিকট অভিযোগ তুলবেন। অন্যদিকে একজন নিরাপরাধ মানুষকে কিভাবে মৃত্যুদন্ড দিবেন তা ভেবেই পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত পিলাত জনতার ও সমাজপতিদের নিকট হেরে গেলেন এবং যীশুকে জনতার চাহিদা মত রাজদ্রোহের অভিযোগে ক্রুশীয় মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিলেন। তবে তিনি জনতার সামনে হাত ধূয়ে বললেন যে, এই নিরাপরাধ ব্যক্তির রক্তপাতের জন্য তিনি দায়ী নন। ক্রুশের উপরে মৃত্যুদন্ড দেয়া ছিল তখন সমাজের নিষ্ঠুরতম অপরাধ।

ক্রশীয় মৃত্যু দন্ডাদেশের পর যীশুকে শাষণ ভবনে নিয়ে তার পরিহিত জামাকাপড় খুলে নিয়ে একটা বেগুনী রঙের পোষাক পরিয়ে দিল। সৈন্যরা কশাঘাত করল। তখন ইহুদী সমাজে নিয়ম ছিল যে কোন অপরাধীকে ৩৯টির বেশী আঘাত করা যাবে না। কিন’ যীশুকে এ সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশী আঘাত করা হয়েছিল যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁকে যে কাপড়ে দাফন করা হয়েছিল সে কাপড় থেকে; যা এখনো সংরাক্ষিত আছে। কশাঘাতের সাথে সাথে তাঁকে চড়, থাপ্পর, মাথায় কাঁটার মুকুট, থুথু ইত্যাদির মাধম্যে অপমান ও বিদ্রুপ করা হলো। এভাবে বিদ্রুপের পালা শেষ হলে সে বেগুনী রঙের কাপড় খুলে নিজের কাপড় আবার পড়িয়ে দিলেন এবং তাঁকে নিজ ক্রুশ বহনে বাধ্য করে কালভেরী পথে রওনা দিলেন। কালভেরী হলো সেই জায়গা যেখানে যীশুকে ক্রুশে দেয়া হয়েছিল এবং জায়গাটি শহরের খুব নিকটে এবং অনেক লোক সেখান দিয়ে যাতায়াত করত। কালভেরীতে যীশু অনেক কষ্ট করে পৌঁছানের

পর দুইদিকে দুইজন দস্যু এবং মাঝখানে যীশুকে ক্রুশে দেয়া হলো। ক্রশের উপর তিন ঘন্টা অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে মৃত্যুবরণ করলেন। তখন অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। জেরুশালেম মন্দিরের পর্দা দুভাগ হয়ে গেল। যে পর্দার পিছনে মন্দিরের মহা পবিত্র স্থান এবং যেখানে একমাত্র যাজক ছাড়া আর কেউ সেখানে যেতে পারতেন না। পর্দা দু’ভাগ হয়ে যাওয়ার ঐশ তাত্ত্বিক অর্থ হলো সমাজে আর কোন ভেদাভেদ থাকল না। এছাড়াও পৃথিবী অন্ধকার হয়েছিল এবং আরো অনেক আশ্চার্য ঘটনা ঘটেছিল। যেহেতু পরের দিন ছিল নিস্তার পর্বের প্রস্তুতিবার। তাই যীশুর কয়েকজন শিষ্য এবং আরো কিছু মানুষ যীশুকে সব নিয়ম মেনে তাড়াহুড়ো করে কালভেরীর পাশেই একটি নতুন কবরে সমাধিস্ত করা হয়।

তিন দিন কবরে থাকার পর তৃতীয় দিনে তিনি পুনুরুত্থান করেন। তিনি মৃত্যুকে জয় করলেন। রবিবার খুব সকালে কয়েকজন মহিলা তাঁর কবরের নিকট গেলেন এবং দেখতে পেলেন কবরে কেহ নাই। কবরের এককোণে যীশুকে যে কাপড়ে সমাধিস্ত করা হয়েছিল সে কাপড়গুলো পড়ে আছে। তখন যীশুর শিষ্যেরা সেখানে গেলে মহিলারা সে কথা জানাল। প্রথমে তারা ভাবল যে তাঁর শরীর কেহ চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু যীশু তাদের দেখা দিলেন এবং বললেন যে তিনি মুত্যু থেকে জীবিত হয়েছেন। মৃত্যু তাকে আটকে রাখতে পারে নি। এ এক মহা আশ্চর্য ঘটনা। যীশুর জন্ম, কর্ম-জীবন, মৃত্যু ও পুনুরুত্থাণ এক মহা ঐশ নিগুঢ় তত্ত্ব। খ্রীষ্ট ধর্মের বিশ্বাসের মূল কেন্দ্রই হলো যীশুর পুনুরুত্থান। যীশু পুনুরুত্থিত হয়েছিলেন বলেই খ্রীষ্ট বিশ্বাস দুঢ় হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী তা প্রচারিত হয়েছে।

 

 

 

লেখক: উন্নয়ন কর্মী। ইমেইল:[email protected]

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here