যাদুবিদ্যায় মানুষ রুপান্তরিত হলো কুমিরে!

মুশফিকা ইকফাত নাবিলা :: মাগুরা জেলার  মহম্মদপুর ও ফরিদপুর উভয়ের শেষ সীমানায় মধুমতি নদীতে ঘটনাটি ঘটে।যাদুবিদ্যায় মানুষ রুপান্তরিত হল কুমিরে। কিন্তু কুমির থেকে আর মানুষে পরিনত হতে পারেনি। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পূর্বপাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে মধুমতি নদী। এই নদীর একটি ঘাটের নাম নদের চাঁদ ঘাট। নদের চাঁদ একজন মানুষের নাম। নদের চাঁদ যাদুবিদ্যা শিখে মানুষ থেকে কুমিরে পরিণত হয়েছিলেন।
.
ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলাধীন গুনবহা ইউনিয়নের শেষ সীমানায়, মধুমতি নদীর তীরে ঘটে যায় এক নির্মম ট্রাজেডি। আবহমানকাল ধরে বাংলার লোকসাহিত্যে যে কাহিনি “নদেরচাঁদ” নামে কিংবাদন্তী হয়ে আছে। মধুমতি নদীর ঘাটে খেয়া নৌকার মাঝি ছিলেন তারাজ মন্ডল৷ দীর্ঘ দিন তারাজ দম্পতির কোন সন্তান হয় না৷  অনেক চেষ্টা তদবির, কবিরাজ, ওঝা, ফকির করে অবশেষে গর্ভবতী হন তারাজ মন্ডলের স্ত্রী৷নয় মাস অশেষ গর্ভ যন্ত্রণা সয়ে, মন্ডলের স্ত্রী কোন এক সকালে জন্মদেন এক ফুটফুটে পূত্রসন্তান। পিতা- মাতা, যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। পাড়া-প্রতিবেশরীদের সন্তানের জন্মের ষষ্ঠ দিনে দাওয়াত করে,  গ্রামের ইমামকে দিয়ে নাম রাখলেন-“চাঁদ মন্ডল”। পিতা মাতার একমাত্র পুত্র  আদর সোহাগে বড় হতে লাগল।
.
মধুমতির উত্তাল স্রোতে -সাঁতার কেটে, সবুজ শ্যামল ফসলে ভরা দিগন্তে -হেসে-খেলে বড় হতে লাগলো চাঁদ। গরিব সংসারে বড় আদরের সন্তান, মাঝে মাঝে পিতার সঙ্গে  নৌকা চালাতে জিদ ধরে চাঁদ, কিন্তু বাবা তারাজ মন্ডল – ছেলের সব আবদার পূরণ করলেও এ কাজে নিতে চাননা৷ দেখতে দেখতে, শৈশব – কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখে চাঁদ৷ পিতা-মাতা, চাঁদকে বিয়ে দিতে এ গ্রাম -সে গ্রামে ঘটক লাগায়। কিন্তু চাঁদ বিয়ে করতে রাজি হয় না। শৈশব থেকে মায়ের মুখে শুনে আসেছে একটি গল্প, কামরুপকামাক্ষা কোন এক তান্ত্রিকের তদবিরে তার জন্ম৷ চাঁদের মনে তা রেখাপাত করে৷ চাঁদেরও ইচ্ছা সে কামরুপকামাক্ষা  যাবে তন্ত্রমন্ত্র শিখে মানুষের উপকার করবে৷
.
মনের কথা কাউকে বলতে পারেনা৷ আর কামরুপকামাক্ষা  যাবার পথও জানা নাই তার৷ মনের বাসনা মনেই চেপে রাখে সে৷ কোন এক গ্রীষ্মে  তারাজ মন্ডল বসন্তরোগে আক্রান্ত হলে আক্ষেপ করে বলে- “আমি আর পূত্র বধুর মুখ দেখে যেতে পারলামনা৷”চাঁদের মনে পিতার এ আক্ষেপ তীরের মত বিঁধে যায় – পিতাকে সে কথা দেন – সে বিয়ে করবে৷ সেই দিনই প্রতিবেশী এক আত্মীয়ের কন্যার সংগে বিয়ে হয়ে যায় চাঁদের৷ পুত্রবধূর মুখ দেখে মানষিক ভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও – শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠা হয়নি তারাজ মন্ডলের৷ কিছু দিন গত হতেই জীবন খেয়ার পাঠ সমাপ্ত করে পাড়ি জমান পরপারে৷ সংসারে জোয়াল কাঁধে চাপে- চাঁদের ঘাড়ে৷ বৃদ্ধ মা, নতুন বধু, সংসারের চাপ, তবু তার মনে মাঝে মাঝে উকি দেয় কামরূপকামাক্ষা।
.
পিতার রেখে যাওয়া সামান্য জমি আর খেয়া নৌকা চালিয়ে সুখেই দিন চলছিলো৷ হঠাৎ একদিন বৈরী আবহাওয়ার সন্ধ্যায় কেউ একজন নদী পারাপার হতে আসে চাঁদের বাড়িতে। বৈরী আবহাওয়ার কারনে চাঁদ  নৌকা ঘাটে বেধেঁ বাড়ী এসে স্ত্রীর সংগে খোশ গল্পে মেতে ছিলো৷ বাইরে থেকে অতিমানবীয় কন্ঠে ডাক শুনতে পায় – “তারাজ বাড়ি আছো”? পিতার নামে ফুৎকার শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে চাঁদ।বাইরে বেরিয়ে আসে তার বৃদ্ধা মাও৷ বৃদ্ধা চোখে ঝাপসা দেখলেও কন্ঠ শুনে, চিনতে কষ্ট হয় না বৃদ্ধ ফকিরকে৷ এই সেই ফকির যার তদবীরে সে সন্তানের মা৷ চাঁদকে তার মা ফকিরের পরিচয় জানায়৷ চাঁদ তান্ত্রীক ফকিরকে সম্মানের সঙ্গে আহ্বান জানান আতিথ্যে৷ বৃদ্ধ ফকির চাঁদকে বলেন-তাকে এখনি মধুমতির অপর পাড়ে যেতে হবে একজন জরুরী রোগী  দেখতে৷ বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে চাঁদ বৈঠা হাতে বেরিয়ে আসেন ফকির বাবাকে পাড় করতে৷ পথ চলতে চলতে তার মনে আবারও উঁকিঝুকি দেয়- কামরূপকামাক্ষা৷ফকির বাবার থেকে বেশ কৌশলে জেনে নেয় কামরূপকামাক্ষা যাবার রাস্তা৷
.
এতদিন যে স্বপ্ন সে দেখেছে আজ তা হাতের মুঠোয় ৷খুব গোপনে সে সংগ্রহ করতে থাকে পথের পাথেয়৷ মাস ছয়েক পর, কোন এক নির্জন রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে পা বাড়ায় চাঁদ – আসামের কামরূপকামাক্ষার উদ্দেশে৷ স্ত্রী, বৃদ্ধা মা, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কত না খোঁজ করে এ জায়গা, সে জায়গায় হাট, মাঠ, ঘাট। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায় না চাঁদকে৷ অবশেষে জানতে পারে সে কামরূপকামাক্ষা গেছে তন্ত্রমন্ত্র শিক্ষা নিতে৷  চাঁদের বৃদ্ধা মা- ভরা যৌবনা পূত্রবধুকে নিয়ে বেশ কষ্টে দিন কাটায়৷অনেকে বলে – “কামরূপকামাক্ষা কোন পুরুষ গেলে, সে মায়ারজালে বন্দী হয়ে আজীবন দাশ হয়ে থাকে, ভুলে যায় অতীত, ভুলে যায় স্মৃতি, এমন কী প্রিয় মানুষের মুখও – কোন দিনই আর ফিরে আসে না৷”বৃদ্ধা মা তবুও আশা ছাড়ে না, পূত্রবধুকে বুকে জাপটে ধরে বলে- “দেখিস আমার চাঁদ ফকির বাবার মতো একদিন ঠিক ফিরে আসবে৷”
.
বৃদ্ধা মা দর্গায় দর্গায় মানত মানে, মসজিদে মাদ্রাসায় শিন্নি পাঠায়, নামাজ পড়ে অকুতি জানায় আল্লার দরবারে৷মায়ের সে প্রার্থনা ব্যর্থ হয়নি৷সাত বছর আবার কার মতে দশ বছর পর ফিরে আসে চাঁদ৷ বৃদ্ধা মন্ডলের স্ত্রী সত্যই ফিরে পান যেন আকাশের চাঁদ৷ পাশেই শশুর বাড়ী থেকে ফিরে আসে  স্ত্রী৷ গ্রামের পর গ্রামের লোকজন দেখতে আসে চাঁদকে৷ সকলেই জানতে চায়, কামরূপকামাক্ষার কথা৷দেখতে চান, কী যাদু- মন্ত্র শিখেছে সে৷ সবাইকে নিরাশ করে, কোন কথাই বলে না চাঁদ৷গ্রামের বাসিন্দারা তাকে টাউট বাটপার বলতে থাকে, তবুও সে কোন প্রতিবাদ করেনা কার কথার৷ গ্রামের মেয়েছেলেরাও তার স্ত্রীকে উঠতে বসতে খোটা দিতে থাকে৷ অসহ্য লোকনিন্দায়, একদিন রাতে স্ত্রীকে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে চাঁদ জানায় – সে কাল ভোরে একটা ভয়ঙ্কর তামাশা করবে৷
.
স্ত্রী জানতে চায়,-কি করবে সে? চাঁদ শুধু বলে-কী করি দেখতেই পারবে৷খুব ভোরে উঠে স্ত্রীকে ঘুম থেকে জাগায় চাঁদ।তারপর দুজনে মিলে, মধুমতির ঘাটে সূর্যোদয়ের আগেই গোসল করে, মাটির কলসীতে উজান ভাটির পানি ভরে ফিরে আসে বাড়িতে। চাঁদ বধূ তখনও জানতে চায় -সে কী করবে? চাঁদ শুধু বলে-দেখতেই পাবে।তবে এই যে কলসী ভরতি পানি – যা আমি পড়ে দিবো৷ তা দিয়ে আমাকে গোসল করিয়ে দিবে৷ তা হলে আমি আবার আমার অবয়বে ফিরে আসবো৷ তবে, আমি যাই হই, সেটা গ্রামের সকলকে ডেকে দেখাবে, তারপর এই পানি আমার গায়ে ঢালবে৷” আহ্লাদিত স্ত্রী তখনও জানে না কী ভয়ঙ্কর পরিনীতি অপেক্ষা করছে!
.
অতি উৎসাহী স্ত্রী অধীর আগ্রহে প্রতিক্ষায় থাকে আজ তার স্বামী কিছু একটা করবে।আর সে গ্রামের ঝি-বৌদের ডেকে এনে দেখাবে তা৷ তারপর এত দিন যে গঞ্জনা সহ্য করেছে, তাদের মুখের উপর দুটো বেশি কথা শুনিয়ে দেবে। চাঁদ শরীরের লজ্জা নিবরণের জন্য কাঁধের গামছায় নিন্ম অংশ পেচিয়ে-বাকি সব বস্ত্র খুলে ফেলে৷ কলসীতে রাখা পানি মন্ত্রপড়ে ফুঁকতে থাকে৷ আর স্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেয়  তামাশা শেষে যা করতে হবে তাকে৷ স্ত্রী মাথা নেড়ে সায় দেয়। স্ত্রীর দিকে একটু মিষ্টি হেসে, নিজের শরীরে মন্ত্র পড়ে পড়ে ফুঁকতে থাকে সে৷ স্ত্রীকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে আলতো চুম্বন করে অধরওষ্ঠে! স্বামীর আলতো সোহাগে লজ্জায় মুদে আসে চোখের পাতা। নিজেকে স্বামীর আলিঙ্গন থেকে ছাড়াতে দুহাত চাপ দিয়ে বলে – “ছাড়ুন ছাড়ুন কেউ দেখে ফেলবে।”
.
নিজেকে ছাড়িয়ে চোখ মেলেই অবাক চাঁদ বধূ, চাঁদ নয় একটা কুমির তাকে জড়িয়ে ধরে আছে চাঁদের স্ত্রী কিছু বুঝে ওঠার আগেই চাঁদ মানুষ থেকে কখন যে কুমিরের রূপ ধারণ করেছে সে কী তা জানে? অকস্মাৎ এমন কান্ড দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ভয়তড়াসায় তড়িঘড়ি ছুটতে গিয়ে, উঠনের মলন বাঁশে আঘাত খেয়ে ছিটকে পড়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন চাঁদের স্ত্রী৷ সবে মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ পড়ে ঘরে ফিরছিলো মুসল্লীরা, হিন্দু পাড়ায় গৃহবধূরা প্রভাতী পুজোর আরতী, উলূধ্বনী – কাসরঘন্টা বাজাচ্ছিলো৷ এমন সময় গগনবিদারী চিৎকারে – প্রতিবেশীরা ছুটে এলো চাঁদের বাড়ী৷ সকলেই অবাক আস্তমস্ত একটা কুমির উঠানের মাঝে৷ আর তার গা ঘেঁষে সংজ্ঞাহীন পরে আছে চাঁদ বধূ৷ মাথা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। সাহসী দুএক জন বৌটিকে কুমিরের কবল থেকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে গেল। কুমিরটি নির্বাক।
.
একটি অস্ফুট স্বরে গো গো করছে। সকলে দাঁড়িয়ে দেখছে দৃশ্যটি৷ গ্রামের লোকজন ভাবলো, মধুমতি নদী থেকে কুমিরটা ওঠে এসেছে৷ স্থানীয়রা লাঠি, সড়কি, বর্শা নিয়ে আক্রমন করলো কুমির টিকে৷তাদের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও স্থির দাঁড়িয়ে রইলো কুমির রূপি চাঁদ৷ আর চারদিক মাথা ঘুরিয়ে একজনকে খোঁজতে লাগলো৷ তখন জ্ঞান ফিরেনি চাঁদ বধূর৷ গ্রামের ঝি-বধূরা তার মাথায় তেল পানি দিচ্ছে,  কেউ বা হাত পায় তেল মালিশ করছে৷ছেলে ছোকড়ারা এবার প্রচন্ড আক্রমন শুরু করলো৷চাঁদ সে আক্রমন সহ্য করতে না পেরে, এদিক ওদিক ঘুরতেই লেজের ঝাপটে ভেঙে গেল কলসী৷ দরদর করে মন্ত্র পড়া পানিতে ভেসে গেল উঠানের মাটি৷সে পানি কুমিরের যে অংশে লাগলো তা থেকে বেরিয়ে এলো মানুষ রূপ৷যা বেশীর ভাগই ছিলো পেটের দিকের অংশ৷ যত সময় চাঁদ বধূর জ্ঞান ফিরলো – তত সময় মাটি শুষে নিয়েছে পড়া পানি৷ সংজ্ঞা ফিরে ছুটে এলো চাঁদ বধূ , ততক্ষণে সব শেষ৷ বিন্দুমাত্রও পানি নেই কলসীতে৷উপস্থিত গ্রামবাসিদের খুলে বলল সব। হায় হায় রব পরে গেল সমস্ত গ্রামে। চাঁদ বধূর, আর বৃদ্ধা মায়ের আকাশ বিদারী আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠল চারপাশ৷কান্নার রোল পরে গেল সমস্ত গ্রামে৷ গ্রামের লোকজন চাঁদের ক্ষত বিক্ষত শরীরে লতাপাতা লাগিয়ে বন্ধ করলো রক্ত ঝরা। বৃদ্ধা মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কুমির রুপি চাঁদের কপালে চুমু খেয়ে, সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, কান্না জড়িত কন্ঠে বলে চললেন- আমি তোকে আবার মানুষ করব।
.
চাঁদও মায়ের কোলে মাথা রেখে চোখের জল ছেড়ে দিল। মা তার আচলে ছেলের চোখের পানি মুছে গ্রামের এক ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সেই তান্ত্রিকের খোঁজে। সে তান্ত্রিক কী আর এক জায়গায় থাকার মানুষ! আজ এখানে তো কাল অন্য কোন গাঁয়ে। একদিন, দুদিন কেটে গেল, না চাঁদের মা ফিরে আসে না। গ্রামের লোকজনও বেরিয়ে পড়ে তান্ত্রিকের সন্ধানে। সকলেই ফিরে আসে ভগ্ন মনরথে।কিন্তু মা আর ফিরে আসে না। দিনরাত, খাওয়া দাওয়া সব ভুলে মা ছুটে চলে এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে।
.
দু দিন গত হলেও, না চাঁদ বধূ কিছু মুখে তুলে না কুমির রুপি চাঁদ। গ্রামের লোক, আত্মীয় স্বজন সবাই অনুনয় করে। না, চাঁদ মুখে কিছুই তুলে না। কেবল পথের দিকে কারো পায়ের আওয়াজ পেলেই মাথা তুলে তাকিয়ে থাকে। এই বুঝি মা তান্ত্রীককে নিয়ে আসে।ছয় দিন ছয় রাত কেটে গেলে – চাঁদ বুঝতে পেরে তার আর মানুষ হবার নয়। মনুষ্য সমাজও তার নয়।
.
ষষ্ঠ দিনের শেষে রাতের কোন এক প্রহরে, চাঁদ – ধিরে ধিরে পা বাড়ায় মধুমতির সেই ঘাটের দিকে। যেখানে তার পিতা, পূর্বপুরুষ জীবিকা সন্ধানে নিবিড় মিতালী গড়ে তুলেছিল। যেখানে ছলাৎছাত ছলাৎছাত বৈঠা’র আঘাতে জলে সংগীতের বাজনা বাজত সে একদিন। হাজারো মানুষকে এপাড় থেকে ঔ পাড়ে পারাপার করেছে। সেই ঘাট, সেই পানি তাকে ডাকছে। সেকি আর ঘরে বসে থাকতে পারে? না মনুষ্য সমাজে খাপ খায়? সপ্তম দিনে যখন মা ফিরে আসে সেই বৃদ্ধ তান্ত্রিককে সঙ্গে নিয়ে তত সময় দেরি হয়ে গেছে অনেক। সেদিনই ক্ষুধার্ত চাঁদ জলজ প্রাণী আহার করে। তান্ত্রীক শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তখন তার মুখে মাছের আশঁটে দেখে কপাল চাপড়াতে থাকে তান্ত্রিক। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে কেন তাকে শত চেষ্টা করেও আহার করানো যায় নাই।আবারও কান্নার রোল পরে যায় মধুমতির কুলে।ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে মায়ের অকুল পাথার কান্নায় ভারী হয়ে উঠে আকাশ-বাতাস।
.
নিয়তি কে মেনে নিয়ে মা সারা দিন ছেলেকে নিয়ে বসে থাকে মধুমতির ঘাটে। না তাকে আর বাড়ি ফিরিয়ে আনা যায় না। রোজগারের একমাত্র উপায় হারিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মা খাবার জোগাড় করে আনত। গ্রামের লোকজনের সাহায্য সহযোগিতা যা করতো তা সংগ্রহ করে মধুমতির পাড়ে দাঁড়িয়ে ডাকত “চাঁদ আয় রে।”মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে উঠে আসতো চাঁদ। মায়ের সাথে আহার করে আবার ফিরে যেত মধুমতি নদীর জলে।
.
কয়েক মাস যেতে না যেতেই ঘটে যায় হৃদয় বিদীর্ণ সেই করুণ কাহিনী। মধুমতি ঘেঁষে ইংরেজ বণিকদের বেশ কিছু নীলকুঠি ছিল। তেমনই এক নীল কুঠিতে যাবার জন্য ষ্টিমার নোঙর করে সেই ঘাটে যেখানেই চাঁদ থাকে।প্রতিদিনের মতো সে দিনও চাঁদ ভেসে ওঠে পানির উপর ইংরেজ সাহেবরা ভাবেন সত্যি কুমির। গুলি চালায় এক ইংরেজ সাহেব। মুহূর্তে মধুমতির পানি রক্তে লাল।ছুটে আসে বৃদ্ধা মা, ছুটে আসে চাঁদ বধূ,  ছুটে আসে গ্রামের শত শত মানুষ। ততক্ষনে সব শেষে!
.
চাঁদ কত সময় পানির উপর ছটফট করে ধিরে ধিরে পানির অতলে তলিয়ে যায়। গ্রামের মানুষ আবারো হাতে তুলে নেয় সেই সড়কি, বর্শা।যেই সড়কি, বর্শা দিয়ে চাঁদকে একদিন তারা আঘাত করেছিল। ঘিরে ফেলে ইংরেজদের ষ্টিমার, প্রচন্ড আক্রমনের শিকার হন কয়েক জন ইংরেজ। প্রাণ বাঁচাতে নোঙর তুলে ছুটে পালায় সাহেবেরা। সে রাতেই মধুমতির সেই ঘাটে গলায় কলসী বেঁধে আত্মহত্যা করে চাঁদ বধূ। চাঁদ বধূর দেহ উদ্ধার করা গেলেও চাঁদের দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। চাঁদ ডুবে জলের অতলে আন্তরিণ হলেও বেঁচে আছে লোককাহিনি আর বোয়ালমারী তথা বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে।
.
বোয়ালমারীর মানুষ চাঁদকে স্মরণ রাখতে মধুমতি নদের  সঙ্গে চাঁদের নাম যুক্ত করে স্থানটির নামকরণ করেছে নদের চাঁদ যা এখন লেখা হয় নদেরচাঁদ। নদেরচাঁদের  নামে রয়েছে একটি মৌজা, একটি গ্রাম, একটি বাওর, একটি ব্রিজ, একটি বাজার ও হাট। রয়েছে পোষ্ট অফিস, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি হাইস্কুল।
.
.
.
.
লেখক: শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে “আওয়ার রোড টু ফ্রিডম”

স্টাফ রিপোর্টার :: হেরিটেজ ট্রাভেলার এলিজা বিনতে এলাহি নির্মাণ করেছেন ট্রাভেল ডকুমেন্টরি ...