মামুনূর রহমান হৃদয় :: লিওনার্দো দা ভিঞ্চির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মোনালিসা। ইতালির শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৬ শতকে এ ছবিটি অঙ্কন করেন। অনেক শিল্পী-বৈজ্ঞানিক রহস্যময় হাসির এই রমনীকে ফ্লোরেন্টাইনের বণিক ফ্রান্সিসকো দ্য গিওকন্ডোর স্ত্রী লিসা গেরাদিনি বলে ধারনা করেছেন।

ভিঞ্চির শিল্পকর্মটি ফ্রান্সের ল্যুভ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ল্যুভ জাদুঘরের তথ্যানুযায়ী প্রায় ৮০% পর্যটক শুধু মোনালিসার চিত্রটি দেখার জন্য ভীর জমান।

মোনালিসার হাসিটা কি বিষাদের নাকি আনন্দের? তাকি ইচ্ছাকৃত নাকি জোর পূর্বক? ছবি আঁকার ক্ষেত্রে মোনালিসা কি আগ্রহী ছিলেন নাকি নিতান্তই অনিচ্ছা থেকে সম্মতি দিয়েছিলে? এইসকল প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে জাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কী তার সেই হাসির রহস্য সেটা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে অনেক। এসেছে ভিন্ন ভিন্ন মতও। জানা যায়, যে বছরগুলোতে তিনি মোনালিসার হাসি ফুটিয়ে তুলছিলেন সেই বছরগুলোতে তিনি রাত কাটাতেন তার ফ্লোরেন্স স্টুডিওর কাছের একটি হাসপাতালে। সে সময়টাতে সেখানে তিনি পড়াশুনা করেছেন মানুষের ত্বক, পেশি ও স্নায়ু নিয়ে।

তিনি বিশেষ ভাবে আরও বেশি আগ্রহী ছিলেন মানুষের হাসি সম্পর্কে। কীভাবে হাসি শুরু হয়, কীভাবে মুখের প্রতিটি পেশি নিয়ন্ত্রিত হয় সে সময়টাতে সেই সব সম্ভাব্য পেশির নড়াচড়ার বিশ্লেষণ করেন তিনি। কারণ ঠোঁটের পেশি ছোট তাই তাদের বিভাজন অত্যন্ত কঠিন ছিল। তিনি লিখেছেন যেসব পেশি ঠোঁটকে আন্দোলিত করে তা অন্য কোনো প্রাণীর থেকে মানুষের মধ্যে অনেক বেশি। এসব অসুবিধা সত্ত্বেও লিওনার্দো মুখের পেশিকে অসাধারণ নির্ভুলভাবে চিত্রায়িত করেছেন তার মোনালিসা চিত্রকর্মে।

২০০৫ সালে ফ্রান্সের বৈজ্ঞানিক, যার নাম পাস্কেল কটেল, ছবিতটিকে ইসপেক্ট্রোলাইট টেকনোলজিতে হাই ইন্সেন্সিটিভ লাইট ও মাল্টি লেন্সের সাহায্যে চিত্রটির আলাদা আলাদা করে ছবি তোলেন। এবং এর থেকে তিনি যে তথ্য সংগ্রহ করেন তা সমগ্র বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে রং দিয়ে মোনা লিসার ছবিটি আঁকা হয়েছিল তার স্তর চল্লিশ মাইক্রোমিটার ছিল। যার মানে হলো একটি সরু চুলের থেকেও পাতলা এবং এই চিত্রটির মধ্যে আরো তিনটি চিত্র লুকিয়ে রয়েছে।

মোনালিসা ছবিটির মধ্যে আরো এক রহস্য রয়েছে। আলাদা আলাদা অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে এই ছবিটির মধ্যে থাকা হাসিটি পরিবর্তন হতে থাকে। স্যান্ডেলাইট ইউনিভার্সিটি তাদের সদস্য নিয়ে একবার মোনালিসা চিত্র টিকে সার্ভে করেছিলেন । সার্ভে করে তারা দেখেছিলেন, মোনা লিসার ছবিটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে সে হাসছে। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে মনে হয় যেন তার ঠোটগুলো একটু বাঁকা হয়ে রয়েছে। যার ফলে মনে হয় মোনালিসা চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে।

তাছাড়া একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যায় মোনালিসার ভ্রু নেই। তাহলে কি দ্য ভিঞ্চি মোনালিসার ভ্রু আঁকতে ভুলে গিয়েছিলেন? ভিঞ্চির মতো এত দক্ষ আঁকিয়ে এই ভুল করবেন, এটা নিশ্চয়ই এত সহজে মানা যায় না। ২০০৭ সালে মোনালিসার এই ভ্রু রহস্যের ইতি ঘটে।

ভিঞ্চির আঁকা মূল ছবিতে মোনালিসার ভ্রু ছিল। তবে সেটি খুবই সরু। তা এতটাই সরু ছিল Ñ হয় তা এত বছরে মিলিয়ে গেছে নয়তো মিউজিয়ামের কোনো এক কিউরেটর অতিরিক্ত পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে ভ্রুগুলোও মুছে ফেলেন!

মতান্তরে মোনালিসার নাম ছিল মাদোনা এলিজাবেথ। আবার অনেকে মনে করেন মোনালিসা তার মা। কেউ মনে করেন মোনালিসা তার বান্ধবী। আবার অনেকে প্রায় মোনালিসার মুখে দাড়ি লাগিয়ে স্বয়ং লিওনার্দোকেই আবিষ্কার করে ফেলেন। তারা দাবি করেন, মোনালিসা চরিত্রটি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নারীসত্তা! তবে মোনালিসা আসলে কে ছিলেন সেই প্রমাণ আজও মেলেনি। চিত্রকলার ইতিহাসে এই চিত্রকর্মটির মতো আর কোনোটি এত আলোচিত ও বিখ্যাত হয়নি। আর এর একমাত্র কারণ মোনালিসার সেই রহস্যময় হাসি যা আজো বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়।

 

 

লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজে,ঢাকা

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here