‘ আগন্তুক ‘

মেহেরুন নেছা রুমা ::

আধখানি চাঁদের দিকে পলক পড়তেই নিঝুম আঁখি মুঁদে গ্রীবা উঁচিয়ে ধরে আপন জগতে ডুব দেয়, যেই জগতের খবর কেউ কখনো রাখে না। ঝরা পাতার মুড়মুড়ে ধ্বনি তুলে কারো আগমনের বার্তা সেই বেখবর জগতে পৌঁছে দিয়ে কপাট থেকে সরে দাঁড়ায় সে।

আগন্তুকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নক্ষত্রসম দুরত্ব অতিক্রমের পর যেমনটা আপন বলয়ে চলে আসার ঘনত্ব অনুভুত হত, তেমন আহলাদের আয়োজন নিয়ে বুক কাঁপে নিঝুমের।

আগন্তুকের চন্দ্রস্নাত কাপড় থেকে ছিটকে পড়া রুপা কুড়িয়ে নেয় নিঝুম। বকুলের মাতাল গন্ধখানি আঁচলে গিট বাধে, খসে পড়া ভক্তির ধূলোটুকুতে কেশবিন্যাশ সাজে, অন্তরপ্রকষ্ঠের পর্দা সরিয়ে গেঁথে থাকা দুঃখের এক পশলা নিয়ে আপন আঁখিতে কাজল পরে। অত:পর কপাট থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলে, যাও, জয় করে তবে এই রাজ্যে ফিরে এসো বাদশাহ হয়ে। নির্ভরতার আঁচলখানি বিছিয়ে
দেয়।

আগন্তুক চোখের সিঁড়ি বেয়ে একেবারে অন্দরকোঠায় নেমে পড়ে, বলে- এই কঠিন পরীক্ষায় ফেললে তবে?

হে মানব! তুমি জানো না বুঝি, মন ছুঁতে না পারলে শরীর ছুঁতে নেই? মনঃজগতের সকল কপাট খুলে রেখেছি আস্থা নির্ভরতা আর বিশ্বাসের মুক্ত বাতাসের জন্য। জয় করে আসো আগে সেই জগত, কথা দিলাম এই ভূমির মালিকানা তোমারই হবে। আঁধখানি চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি যদি অর্ধেক চন্দ্র আমায় দেও আমি দিব ভরা পুর্ণিমা। ভক্তিতে সম্মানে সেবায় প্রেমে তুমি ষেলআানা পাবে, তবে মায়ায় আমাকে কোন সীমানায় পাবে না তুমি। অসীমের খোঁজ তুমি কি করে নেবে বলো? আমার অসীম মায়ার জগতে তোমার অধিকারের কূল-কিনারা মেপে তুমি কেবল পরিশ্রান্তই হবে, ওজন করতে পারবে না। আমার সত্তাজুড়ে সকল মায়া তোমার আধখানা ঠোঁটের বিনিময়মূল্য হবে। কিন্তু তোমার ভালোবাসায় আমার কোন অংশ ছাড় নেই। হৃদয়জগতের আনাচ কানাচ, উপর নিচ, অলি গলি, ভুমি বাতাস,কঠিন- তরল, বাষ্প- বুদবুদ সবটুকু আমার অধিকারে থাকা চাই। গরমিল হলে বন্ধন ছিন্ন হবে, আর সেই ছিন্নতার সাজা জীবনভর তোমায় আরও বেশি পোড়াবে। ক্ষয় করবে তোমায়। কেননা তখনো তুমি আমার মায়ার সাগরে ডুবে থাকবে, কিন্তু আমার নাগাল না পাওয়ার বেদনায় রিক্ত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ তোমাকে না দেবে সাঁতরে তীরে উঠতে, না দেবে ভাসতে ।

না না এসব কি বলছ? আমি তো জয় করতেই এসেছি, ছিন্ন হতে নয়। সরে যাও কপাট ছেড়ে, আমায় প্রবেশ করতে দাও, আর জিতে আসতে দেও তোমার হ্দয়জমিন ।সবটুকু চাই আমার, আধখানা চাঁদ নয়, পুরো গ্যালাক্সির বিনিময়মূল্য তোমার ওই ঘন পাপড়িনিবিষ্ট একখানি চোখের পলক। আমি সবকিছু নিলামে দিয়ে কিনে নিতে চাই তোমার মনঃভুমি। সেথায় আত্মার নরম জমিনে আমায় রোপন করে দিও।

এবার তবে আমার যাত্রা শুরু হোক।

এক পা বাড়িয়ে ফের দাঁড়ায় আগন্তুক। নিঝুমকে লক্ষ্য করে বলে, আমি ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তো?

নিঝুম বলে, পরিচ্ছন্ন মন হোক তোমার হাতিয়ার। শুভকামনা রইল। এগিয়ে যাও তবে, আর পিছন না ফিরে। হৃদয়গলি তন্ন তন্ন করে অস্থির বেদনবদনে রোদনসিক্ত আঁখিদয় ভাসিয়ে ফিরে আসে আগন্তুক। যথাস্থানে কারো অবস্থানের চিহ্নটুকুও নেই। দশদিগন্ত খুঁজে নিরাশ মনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে। কুড়িয়ে পায় নিজের কাছ থেকে নিঝুমের সংগৃহীত সেই চন্দ্রস্নাত রুপার টুকরা, বকুলের সুবাস, ভক্তির ধুলো, এক পশলা দুঃখের কাজল, আর অতিরিক্ত একখানা ছেড়া কাগজ। তাতে লেখা, “ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তো?” তোমার এই প্রশ্নটিই আমাকে অপেক্ষা করতে দিল না আগন্তুক। আহত পাখির পাখা ঝাপ্টানো কষ্টের মূল্য পরিশোধের সাধ্য তোমার নেই। এতকিছুর পরেও এই অবিশ্বাস আর অনাস্থার পরাঘাতে আমি আপন হ্দয়ের কপাট সেঁটে দিয়ে সরে গেলাম।

কাগজের সম্পর্ক ভাঙতে গেলে কাগজ ছিড়ে ফেললেই হয়, যেখানে সম্পর্ক হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, সেই সম্পর্ক ভাঙতে গেলে হৃদয়টাই যে ভেঙে খানখান হয়। তুমি ফিরে যাও আপন জগতে আগন্তুক। যেথায় তোমার প্রশ্নের জবাব মেলবে অন্য কারো কাছে। তোমার প্রশ্নের কাছে হেরে গিয়ে আমি হৃদয়ে কপাট দিলাম আপন অভিলাষে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here