মেঘনার ভাঙনে নিঃস্ব রামগতি-কমলনগর উপজেলার লাখো মানুষ

মেঘনার ভাঙনে নিঃস্ব রামগতি-কমলনগর উপজেলার লাখো মানুষ

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:: মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা আরো বেড়েছে। গত এক মাসের ভাঙনে এই দুই উপজেলার শত-শত ঘর বাড়ি, ফসলের জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাট-বাজাসহ বহু স্থাপনা নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে বহু সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, বিদ্যালয়, ঈদগাঁহ, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, ঘর-বাড়ি, ফসলের জমিসহ আরো বহু স্থাপনা। প্রতিদিই বিলীন হচ্ছে এই দুই উপজেলার কোন না কোন এলাকা।

মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে এই দুই উপজেলার লাখো মানুষ এখন নিঃস্ব। এক সময় তাদের ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, সাজানো বাগান, বাড়ির সামনে ফসলি জমি। এখন তাদের কিছুই নেই। মেঘনার ভাঙনে তারা এখন নিঃস্ব। মেঘনা তাদের বাড়ি-ঘরসহ সব গিলে খেয়েছে।

সারা বছর ধরে রামগতি ও কমলনগরে নদী ভাঙন অব্যাহত থাকে। তবে বর্ষা এলেই ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। নদীর পানি বাড়তে থাকায় ও বর্ষায় বৃষ্টির প্রভাবে মেঘনা ভাঙন আরও বেড়ে যায়। গত তিন-চার সপ্তাহের ভাঙনে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অনেক ঘর-বাড়ি ভেঙেছে। বহু সাজানো সংসার লন্ডভন্ড করে দিয়েছে রাক্ষুসী মেঘনা। এ এলাকার মানুষের মুখে এখন বিষাদের চাপ। দুশ্চিন্তা আর হতাশায় তাদের দিন কাটছে। তাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই কারও। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এ জনপদের মানুষকে তাড়া করছে মেঘনা। এক এক পরিবার আট/দশবার ভাঙনের কবলে পড়েছে। এখনও এখানকার হাজার হাজার পরিবার নদী ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা।

মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে এই দুই উপজেলার মাইলের পর মাইল বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে মেঘনা উপকূল অরক্ষিত। জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এ জনপদ। বর্ষা এলেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। তলিয়ে যায় ফসলের মাঠ। বাড়ির উঠান মাড়িয়ে ঘরে উঠে জোয়ারের পানি। বর্ষা এলেই এখানকার মানুষের মনে বেড়ে যায় দুশ্চিন্তা। এ যেনো প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা।

তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে রামগতি ও কমলনগরে মেঘনার ভাঙনে হারিয়ে গেছে, রাস্তাঘাট, হাট বাজার, ফসলি জমি, আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মসজিদসহ বহু সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। বিলীন হয়ে গেছে বেড়িবাঁধ। বেড়িবাঁধ না থাকায় বর্ষা মৌসুমে মানুষের দুঃখের আর অন্ত থাকে না।

আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে চার ফুট পানি বেড়ে যায়। এ সময় জোয়ারের পানিতে ভাসতে থাকে মেঘনার উপকূলীয় এলাকা। ক্ষতি হয় সড়ক ও কাঁচা ঘরবাড়িসহ হাজার হাজার একর জমির ফসল। এছাড়াও হুমকিতে পড়ে গবাদি পশু।
এভাবে অব্যাহত নদী ভাঙতে থাকলে নিঃস্ব হবেন আরো হাজার হাজার পরিবার। হারিয়ে যাবে রামগতি ও কমলনগর। এমন পরিসি’তিতে দ্রুত নদীভাঙন ঠেকাবে সরকার, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

মেঘনার ভাঙনে নিঃস্ব রামগতি-কমলনগর উপজেলার লাখো মানুষ

রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বর্ষায় মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। হুমকির মুখে রয়েছে দুই উপজেলার হাজার হাজার মানুষের মূল্যবান সম্পদ। বিশেষ করে কমলনগর উপজেলার পাটওয়ারীর হাট, চরফলকন, সাহেবের হাট, মাতব্বরহাট, লুধুয়া ও রামগতি উপজেলার গাবতলী, বাংলা বাজার, বড়খেরী ও আসলপাড়াসহ বহু এলাকা ভাঙনের হুমকির মুখে।

কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে হাফিজ মিয়া বাড়ির ভিটেমাটিতে বসে আছেন। তার বাড়ির উঠানেই জেলেরা ইলিশ ধরছেন। ঘরের কোণে নারিকেল গাছটি নদীতে হেলে পড়েছে। ভাঙনের মুখে আরো কয়েকটি সুপারিগাছ। বাপ-দাদার গড়া বাড়িটি বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটিও চলে যাচ্ছে নদীতে। এমন পরিসি’তিতে নদীর প্রতিটি তীব্র ঢেউ যেনো তার বুকের ওপর আচড়ে পড়ছে।

প্রতিবেশীরা জানান, দেড় একর জমিতে হাফিজের বাড়ি ছিল। পাকা বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। নদীর ভাঙনে ঘর-বাড়ি সবই গেলে তার। সব হারিয়ে প্রতিদিন বাড়ির ভিটায় বসে থাকেন। আর নীরবে কাঁদেন। আগামী দু’তিন দিনের ভাঙনে বিলীন হয়ে যাবে তার ভিটেমাটিও।

এদিকে ভাঙন কবলিত ফলকন ইউনিয়নের লুধুয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স’ানীয় লোকজনসহ আশপাশের বাসিন্দারা বাঁশ ও গাছের খুঁটি দিয়ে বেড়া তৈরি করেন। বেড়ার ভেতর দিয়েছেন ঝোপ-জঙ্গল। এ ছাড়া জিও ব্যাগে বালু ভরে নদীর পাড় স্থাপন করছেন। গত দুই সপ্তাহে এভাবে প্রায় ২৫০ মিটার বাঁধ তৈরি করেছেন তারা।

স্থানীয়রা বলছেন, তাদের দাবির মুখে, সরকারিভাবে এক কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করা হয়। মাত্র এক কিলোমিটার বাঁধ কমলনগরের নদী ভাঙন প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আরো আট কিলোমিটার। এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ শেষে বাঁধের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হওয়ার কথা থাকলেও তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। যে কারণে অব্যাহত ভাঙনে ওইটুকু বাঁধে দেড় বছরে ধস নেমেছে অন্তত ১০ বার।

তাই তারা এখন নদীতে জংলাবাঁধ দিচ্ছেন। জংলাবাঁধের কারণে নদীর ঢেউ পাড়ে সরাসরি আঘাত করতে পারবে না। এতে ভাঙন কিছুটা হলেও প্রতিরোধ হবে। এভাবে বর্ষা মৌসুম পার করতে পারলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা করছেন তারা।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় ৩৫ কিলোমিটার নদী তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে কমলনগরে এক কিলোমিটার ও রামগতিতে সাড়ে চার কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে কমলনগররে আট কিলোমিটার ও রামগতিতে সাড়ে সাত কিলোমিটার এবং তৃতীয় পর্যায়ে ১৪ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুমোদন না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ থেমে আছে।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা বলেন, মেঘনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে দ্বিতীয় পর্যায়ের তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগ) আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন, সারাবছর ধরে মেঘনার ভয়াবহ ও অব্যাহত ভাঙনে কমলনগর ও রামগতির মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এ ভয়াবহ ভাঙন রোধে সরকারি ভাবে বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রবাসীকে ভয় দেখিয়ে আদায় করা টাকা ফেরত দিল পুলিশ

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, নোয়াখালী প্রতিনিধি:: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে প্রবাসীকে ভয় দেখিয়ে আদায় করা ...