মুক্ত জীবন চাইলে সবার আগে নিজেরে মুক্ত করতে হয়

 

সাদিয়া নাসরিন

সাদিয়া নাসরিন :: দেখেন, আমি মফস্বলের মেয়ে। বড় হইসি কক্সবাজারের অতি রক্ষণশীল, অতি ধার্মিক একটি পরিবারে, যে পরিবারে বারো বছর হইলেই মেয়েরা বোরকা পরে, পুরুষরা সাঈদিরে চাঁদে দেখে। যে বাড়ির লোকেরা এলাকার মেয়েদের জন্য জেলার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করসে। বাকি লেখাটুকু পড়ার সময় আমার এই বাড়ি এবং আমার বয়সরে দয়া করে মাথায় রাইখেন।

তো, এই বাড়িতে বাড়তে বাড়তে কিভাবে জানি আমি একটা মুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শিখে ফেলসিলাম। এইটা কখন কোন মুহূর্তে কীভাবে সম্ভব হইসিলো আমি জানিনা। কিন্তু এই স্বপ্নটুকু আমারে সত্য করতে হবে এইটা জানতাম। মুক্ত জীবন মানে আমার কাছে পরিষ্কার একটা বিষয় ছিল, জীবন যাপনের জন্য কোনভাবেই অন্য কারো উপরে নির্ভর না করা, হাত না পাতা।

এখন অন্য কারো উপর নির্ভর না করার মত মুক্ত একটা জীবন কাটাইতে গেলে অবশ্যই নিজের জীবনের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয় সেই বুঝটুকু আমার ছিলো। আমার মনে পড়েনা আমি সেই ছোটবেলা থেকেই কোনদিন নিজের বাড়তি কোনকিছুর জন্য বাপের কাছে হাত পেতে দাঁড়াইসি অথবা মায়ের কাছে বায়না ধরসি। আমার ছোটবোনকেও দেখিনাই।

তো, এই করতে করতে আমি কবে থেকে জানি মাথার উপরের ঘাড়টারে অসম্ভব রকমের শক্ত করে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম যেইটা একসময় আমার বাপ মাও পরিষ্কার বুঝতে পারলো এবং আমার বাপ আমার ক্রমবর্ধমান ঘাড় নিয়ে খুব একটা অস্বস্তিতে না ভুগলেও আমার মায়ের দুশ্চিন্তা বাড়তে বাড়তে বিয়ার সমাধানে আইসা পৌঁছাইলো।

আমার বাপ-মা যখন আমার বিয়া ঠিক করলো বলাই বাহুল্য তারা আমার অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তা, অবস্থা ও অবস্থান সমস্ত কিছু বিবেচনা করে যোগ্য পাত্রই খুঁজে বাইর করলো। কিন্তু আমার কাছে যখন মনে হইল এই বিয়া আমার জন্য অর্থবহ হবে না, আমি কারো সাথেই বিন্দুমাত্র আলোচনাও না কইরা, সমস্ত ধরনের নিরাপত্তা ও সমুখ সংকটের মুখে ছাই দিয়া সেই বিয়া ভাইঙ্গা দিলাম।

তখন আমার বয়স কতো জানেন? আমার বয়স তখন বিশ বছর এবং আমি চরম রক্ষণশীল একটি বংশের বড় মেয়ে এবং আমার পিঠে বিয়ের যোগ্য আরেকটি ছোটবোন এবং আমার চাচাতো ফুফাত বোনেরা বড় হইতে শুরু করসে যাদের কথাও আমার বিবেচনায় রাখাটাই কাম্য ছিলো। এইরকম পরিস্থিতিতে এইরকম একটি সিদ্ধান্ত নেবার জন্য কী পরিমাণ সাহস লাগে সেইটা তখন আমি বুঝিনাই, এখন বুঝি।

এবং বলাই বাহুল্য সেই একটি সিদ্ধান্ত আমার জীবনের একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার বাপ-মা কারো সাথে আলাপ আলোচনা করার প্রয়োজন আমি মনে করি নাই এবং অবশ্যই তার জন্য আমাকে আমার দায়িত্বটুকু প্রমাণ করতে হইসে, নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হইসে এবং নিজের ভালনারেবিলিটি নিয়ে বাপের দরজায় গিয়ে আমি দাঁড়াইনাই, আমার বাপ মা হাজার চেষ্টা করেও আমাকে নিতে পারেনাই।

এবং আমি যখন নিজের জীবনের দায়িত্ব নিয়া নিজের সঙ্গী নিজে পছন্দ করলাম, যার সাথে আমার মনে হইসে সত্যিই একটা মুক্ত জীবন কাটাইতে পারবো, তার সাথে যৌথ জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও আমি একটা বারের জন্যও বিবেচনা করিনাই সে কী চাকরি করে, কতো টাকা বেতন পায়, কয়টা গাড়ি আছে, আমার কী কী নিরাপত্তা সে দিতে পারবে, তার বাপ কী করে, তাদের পারিবারিক অবস্থা ও অবস্থান কী, এমন কি সে একাডেমিক্যালি আমার চাইতে অধিক যোগ্যতর নাকি কম!!

পুরুষমানুষ মাত্রই ভালো রোজগার করতে হবে, বউ বাচ্চারে পালতে হবে, বউ এর চাইতে যোগ্যতর প্রমাণ করতে হবে, এইসব বেহুদাজাল থেকে আমি মুক্ত হইসি সেই সময়েই।

এবং বিয়া নামক চুক্তিতে আবদ্ধ হইলাম যখন, ট্রাস্ট মি, দেনমোহরের ঘরে একটা টাকার অঙ্কও আমি লেখিনাই। সে বারবার বলসিলো তার তখনকার সামর্থ্য অনুযায়ী একলাখ টাকা নগদ দিতে পারবে এবং সেইটা যেন লেখা হয়। আমি সেইটা লিখতে পারিনাই।

আমার মনে হইসিলো যে, একলক্ষ টাকা লেখা হোক বা এক টাকা, ঘটনা তো একই। সেই তো বেচা যাওয়া। এবং আমি কাবিননামায় সেই ঘরটা খালি রাইখাই সই করসিলাম এবং স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সেই কাবিননামা রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়নায়। আমরা দুইজনের কারো কাছেই সেই মহমূল্যবান নীল কাগজের কোন কপি নাই এবং তাতে আমার কোনধরনের নিরাপত্তাই এই পর্যন্ত বিঘ্নিত হয়নায়।

তো, আমি তো এমনিতেই অশিক্ষিত, তাক উপর গ্রামের মেয়ে, ভার্জিনিয়া উলফ পড়ি নাই, ব্রাউনমিলারকে চিনিনা, বেভোয়্যার সাথে পরিচয় নাই, নারীবাদ খায় না মাথায় দেয় সেইটাও জানিনা। কিন্তু এই যে কাবিননামায় “চলতি বাজার মূল্যে খোরপোষ দিতে বাধ্য থাকিবো” লেখা আছে সেইটা আমারে প্রচন্ড অবমানের বোধ দিসিলো। বেচাকেনার চুক্তি কোনদিন আমার স্বপ্নের মুক্ত স্বাধীন জীবন দেবেনা সেইটা আমার মতো ইমোশনাল বলদ ক্যামনে বুঝছিলো সেইটা আজও রহস্য।

এই চুক্তিটারে অস্বীকার করার বিকল্প রাস্তা আমার তখন জানাও ছিলোনা কিন্তু আমার অসম্মানের জায়গাটারে এড়ানোর সাহস আমি করতে পারসিলাম। একুশ বছর বয়সে, মাত্র সেইদিনই ঢাকা শহরে আসছি আমি, বিয়ে করসি বাম রাজনীতি করা একটা ভালোমানুষ টাইপের কমজোর লোকরে, তবুও এইরকম পাহাড়সম একটা সাহস আমি কীভাবে জানি করে ফেলসিলাম।

যাই হোক, এরপর আঠারো বছর যাবৎ সেই লোকটার সাথে যৌথ জীবনে একদিনের জন্যও পার্টনারশিপের যায়গা থেকে সরিনাই আমরা। দুইজন মানুষের মধ্যে আক্ষরিক অর্থে পার্টনারশিপের সম্পর্ক গড়ার জন্য অধিকার এবং দায়িত্বরে সমান সমান ব্যালেন্স করতে হয় সেই শিক্ষাটা আমরা দুইজনই কোথা থেকে জানি পাইসিলাম।

একটা দিনের জন্যও আমরা কেউ কারো বেতনের খবর নিইনাই, যে যার রোজগার অনুযায়ী সংসারের খরচ ভাগ করে নিসি। আমার টাকায় পার্লার শাড়ি আর তার টাকায় চাল তেল নুন গাড়ি বাড়ি এইসব সুবিধাবাদীতা করিনাই। একটা সময় যখন সে চাকরি ছাইড়া দিয়া ব্যবসা শুরু করলো, নতুন ব্যবসায় টাকা আটকাইতে থাকলো, বাচ্চাদের বেসিক খরচের টাকা দিতেও তার অসুবিধা হইতে লাগলো সেইটা নিয়েও আমার বা বাচ্চাদের বা তার মধ্যে কোনরকমের কমপ্লেক্স আমি তৈরী হইতে দিইনাই।

এবং একটা সময় গিয়ে আমার যখন মনে হইসে যে আমাদের পারষ্পরিক বোঝাপড়ার যায়গাটা কাজ করতেসে না, আমাদের একটু স্পেস দরকার, আমি তখনই তা নিসি। সামাজিক নিরাপত্তা, কে কি বলবে, এই সমস্ত জিনিস ভাবার কোন প্রয়োজন মনে করিনাই।

বরং আমার কাছে মনে হইসে দুইজন মানুষের মধ্যে বোঝাপড়াটা কাজ করতেসেনা সুতরাং বাচ্চাদের সামনে পাঙ্গাপাঙ্গী লাগায়ে নষ্টামী করার চাইতে প্যারেন্টাল রিলেশন এবং স্পাউসাল রিলেশনরে আলাদা করা দরকার। আমি তাই করসি, এই সমাজের মাঝখানে বইসাই করসি এবং বাচ্চাগুলারে এই দুইটা আলাদা সম্পর্কের সাথে অভ্যস্ত করছি।

না, যতো সহজে আমি লিখে ফেললাম আর আপনারা পড়ে ফেললেন, এতো সহজ যে এই বিষয়গুলা ছিলোনা সেইটা নিশ্চয়ই আপনারা বুঝতে পারতেসেন। আগুন গিলে অঙ্গার প্রসব করে করে নিজেদের তৈরী করতে হইসে আমাদের দুইজনরেই।

এখন এইগুলারে যে নারীবাদ বলে, আবার কোনটা কোন তরঙ্গের নারীবাদ সেইসব মাপ আর খাপ মিলায়ে তো তখন এইসব করিনাই আমি।

করসি এই বিশ্বাস থেকে যে, মুক্ত জীবন চাইলে সবার আগে নিজেরে মুক্ত করতে হয়, স্বাধীনতার পূর্ব শর্ত হইলো অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা, নিজের অধিকার চর্চা করার প্রাথমিক যোগ্যতা হইলো দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা অর্জন করা। আমি তাই করসি সারাজীবন। এবং আমাদের বাচ্চাদেরও আমি ঠিক এই ভাবেই বড় করতেসি।

এখন দেখেন এই সমস্ত কিছু করার অবসরে আমি যখন আপনাদের মতো “নারীবাদ করা” বিশাল বিশাল মানুষগুলারে দেখলাম, আমার কেমন মোহের মতো লাগলো। আমার মনে হইলো আমি আরো কিছু মানুষের দেখা পাইলাম যারা আমার মতো স্বাধীন ও মুক্ত জীবন যাপন করে এবং অন্য মেয়েদের সেই স্বপ্ন দেখায়। আমি আপনাদের কাছে গেলাম, দলে ভিড়লাম।

কিন্তু বিশ্বাস করেন, দূর থেকে যতোটা সবুজ আপনাদের দেখায় আপনারা কাছ থেকে ততোটাই ফ্যাকাশে। এই বই পড়া মুখস্থ “নারীবাদ করা” আপনারা যে পরিমাণ কনফিউজড আমারে করসেন এই পর্যন্ত আর কোনকিছুই পারেনাই।

আমি হতভম্ব হয়ে দেখলাম আপনারা ভয়ঙ্কর সিলেকটিভ এবং কনফিউজড এবং কনট্রোভার্শিয়াল। আপনারা নিজেরাই জানেননা আপনারা কী চান। বরং যারা জানে কী চায়, তাদেরকে অন্ধের হাতি দেখায়ে আধাপাগল করে ছেড়ে দেন আপনারা।

ভাগ্যিস আপনাদের সাথে দেখা হওয়ার আগেই আমি নিজের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাঠটুকু সম্পূর্ণ করসিলাম, না হলে এই সহীহ অসহীহর দড়ি টানাটানিতে সেইটারও দফা শেষ হইতো এবং আপনাদের মতো অর্ধসত্য জীবন যাপন করতে হইতো আমারেও।

তো, এখন আমি জানি যে, এতোদিন একা একা ঘরের মধ্যে নাম সংজ্ঞা না জাইনা যে নারীবাদের চর্চা করসি আমি, সেইটাই আক্ষরিক অর্থে মুক্তির। এবং অপ্রিয় সত্য হইলো, আপনাদের কাছে সেই মুক্তির জায়গাটার চাইতে জরুরী হইল ক্লাস। আপনাদের কাছে জরুরী হইলো নারীবাদের বই এর নাম, ছবি।

আপনাদের কাছে স্বাধীনতা হইল মদের আসরের ছবি আপলোড করা। আপনাদের কাছে বিপ্লব হইলো অসৎ এবং অনিয়ন্ত্রিত যৌনতা, গাজার পিনিক এবং সিগারেটের ধোঁয়া। আপনাদের কাছে সমাজ পরিবর্তনের মানে হইলো ছোট ছোট কাপড় পইড়া ছবি আপলোড করা।

এবং এসব যারা করেনা বা করতে পারেনা বা করতে চায়না, তাদের প্রশ্নবিদ্ধ করা যে, সমাজের পছন্দমতো চইলা তারা সমাজের কী পরিবর্তন করতে চায়?

এখন দেখেন এইসবের কোনটাই তো আমি বা আমার মতো অনেকেই করতে পারিনা, বা চাইনা। আমারে আমার সমাজরে গুনতে হয় বা আমি গুনতে চাই। এখন এই দলছুট আমি সমাজরে গুইনা সমাজের কী পরিবর্তন করবো এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে সত্যিই নাই।

আমি শুধু জানি, আজকে আমারে দেইখা কক্সবাজারের বা পঞ্চগড়ের যে মেয়েটা পাঁচিল টপকানোর সাহস করতেসে, স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনতেসে তার জন্যই আমারে এই সমাজকে গুনতে হবে। আমি শুধু জানি সমাজরে পরিবর্তন করতে চাইলে অবশ্যই সমাজের প্রতি কিছুটা দায়িত্বশীলতা আমারে দেখাইতে হবে। নীড এবং নেসেসিটির মাজেজা বুঝতে হবে।

সুতরাং আমার জন্য মদের পার্টিতে গিয়ে ছবি আপলোড করলে সমস্যা হয়, গাঁজার আসরের বিপ্লব আমার পোষায়না, আমি নারীবাদের তরঙ্গ গুনতে গুনতে যে কারো সাথে শুয়ে পড়তে পারিনা। এখন এই সমস্যা গুলো আমার হয় বইলা আমার মতো কম পড়ালেখা জানা, সমাজকে গুনে চলা মানুষের নারীবাদরে আপনারা খারিজ করে দিতেই পারেন। দেন।

কিন্তু খারিজ করার আগে নিজেদের দিকে একবার দেখেন তো কোনধরনের কন্ট্রাডিকশন আর কন্ট্রোভার্সির জীবন আপনারা আপনারা যাপন করতেসেন? এবং যে জীবন আপনারা যাপন করতেসেন তার কতোটুকু সত্যি আর কতটুকু প্রিটেন্ড করা? “এইটা আমার জীবন” বলার মতো দৃশ্যমান কোন মড়েল আপনারা দাড় করাইতে পারসেন কিনা? যে নারীবাদ আপনারা করতেসেন তার সাথে এই দেশের, সাব কন্টিনেন্টের কতো শতাংশ নারীদের কানেক্টিভিটি তৈরী হইসে?

বরং আপনাদের চাইতে বহুগুণ এগিয়ে থাকা কতো নারীরাই যে আপনাদের হাতে কোন না কোনদিন, কোন না কোনভাবে অপদস্ত হইতেসে, পিঞ্চড হইতেসে, বুলিয়িং এর শিকার হইতেসে, শেইমিং এর শিকার হইতেসে, সেই তালিকা একদিন আমি দিবো। দিবোই।

 

 

লেখক: প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ।

ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে ঢাবি শিক্ষার্থীর আবেগঘন চিঠি

আরিফ চৌধুরী শুভ :: হারিয়েছি না হেরে গেছি আমরা? আ্যাম্বুলেন্স চলছে সারেইন ...