মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা: স্বল্প মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোর্টার :: গতকাল ২৮ মে ছিল, বিশ্ব মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা দিবস। এই বছরের প্রতিপ্রাদ্য বিষয় হচ্ছে এমএইচএম ইনোভেশন: মেয়েদের কেন্দ্রে রাখা। দেশের অর্ধেক নারী ও কিশোরী। তাদেকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রজননক্ষম সকল নারী ও মেয়েদের জীবনে ঋতু বা মাসিক একটি প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক ঘটনা। মাসিক সম্পর্কিত যথাযথ তথ্য ও জ্ঞান প্রাপ্তি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাসম্বলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য অর্জন একটি অত্যাবশ্যকীয় মানবাধিকার। তাছাড়া মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অত্যাবশ্যকিয় উপাদান পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন এর উন্নয়ন হচ্ছে মানবাধিকার। এই নারী ও মেয়েদের সংশ্লিষ্ট তথ্যে অভিগম্যতা নেই। এদের কাছে স্যানিটারি প্যাড সহজলভ্য নয়, এমনকি নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ টয়লেট ও নেই।

মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের জন্য নারী ও কিশোরীদের স্কুলে, কর্মস্থলে, পথে, ঘাটে এবং বাড়ীতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সুবিধাগুলো সহজে পাওয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাড়ী থেকে শুরু করে স্কুল ও কর্মস্থলে মাসিক বান্ধব টয়লেট নেই বললেই চলে। গ্রামের মেয়েরা সাশ্রয়ী দামে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উপকরণ না পাওয়ায় পুরনো কাপড় ব্যবহার করছে। এ কারণে প্রজননতন্ত্রে সংক্রমনসহ (আরটিআই) অন্যান্য আক্রান্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি না মেনে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ৮৬ শতাংশ নারী ও কিশোরী মাসিক চলাকালে পুরাতন কাপড় ব্যবহার করে এবং গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে এটি বেশি দৃশ্যমান। আর মেয়েদের বিদ্যালয়গুলোতে মাসিককালীন পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার চিত্রটি আরও ভয়াবহ। মাত্র ১শতাংশ স্কুলে ব্যবহার করা প্যাড ফেলার ব্যবস্থা আছে। ৪০ শতাংশ ছাত্রী বলেছে, মাসিকের কারণে গড়ে মাসে তারা তিন দিন স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ কিশোরীকে এবং ৪৮ শতাংশ বয়স্ক নারীকে মাসিকের সময় ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয় না। সমাজে এখনও মাসিকের বিষয়টিকে লুকিয়ে রাখা হয়। ৪৯ শতাংশ নারী মাসিকের সময় ব্যবহার করা কাপড় শুকানোর জন্য ঘরের অন্ধকার স্থান বা গোপন স্থান বেছে নেন। এই সব সমস্যার প্রধান কারণ হলো স্বল্প মূল্যের স্যানিটারী ন্যাপকিনের অপ্রতুলতা, সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কুসংস্কার। কিন্তু নারী স্বাস্থ্যেও উন্নতির জন্য এই প্রচলিত কুসংস্কার বা প্রথাগুলোকে চিহ্নিত করে ভেঙ্গে ফেলার উপায় বের করার উপর জোর দেন।

অভিজ্ঞমহল মনে করেন, নারী স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য মাসিককালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যায় স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রাপ্যতা প্রত্যন্ত গ্রামে সবার কাছে পৌছানোর ব্যবস্থা করা।

মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা দিবস উপলক্ষ্যে বেসরকারি সংস্থা ‘ডরপ’, তার কর্ম এলাকায় আলোচনা সভা ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করছে। স্বল্প মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন ও বিতরণের লক্ষ্যে ডরপ ২০১৫ সাল থেকে ৫টি জেলায় উচ্ছ্বাস স্যানিটারি ন্যাপকিন স্থানীয় উৎদ্যোক্তার মাধ্যমে উৎপাদনের কাজ করছে।

এই প্রসঙ্গে ডরপ এর গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান বলেন, বর্তমান করোনা সংকটময় সময়ে এবং সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্পান আক্রমণ এলাকার নারী ও কিশোরীরা মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরন প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত। বেশীরভাগ এলাকার পানি এবং টয়লেট নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, নারী ও কিশোরীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুকিসহ মানুষিকভাবে বিপর্যস্ত।

এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের ব্যখ্যা করলে দারায়, মহামারির ক্রন্তিকালে মাসিক ব্যবস্থাপনায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত। সময় এখন কিছু করার – Time for Action। কিন্তু আদৌ কি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু হচ্ছে? পারিবারিক বাজেট বরাদ্দসহ রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে, যেমন বাজেট বরাদ্দ এবং কাচামালের ওপর ভ্যাট- টেক্স কমানো।

তিনি আরও বলেন, প্রতি মাসে নগদ টাকা খরচ করা প্রত্যান্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকা অত্যান্ত জোড়ালো হওয়া প্রয়োজন এবং পরিবারিক বাজেট বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত থাকা প্রয়োজন।

সিরাজগঞ্জ জেলার ন্যাপকিন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্যোক্তা মিসেস ফেরদৌসি বেগম জানান, স্বাস্থ্য সচেতনতায় স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার বাড়াতে ডরপ বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম করে যাচ্ছে। পরিবেশ সচেতনতায় প্লাসটিকের মোড়কগুলো সংগ্রহ করে ডরপ পুড়িয়ে ফেলছে। এছাড়া প্রত্যন্ত স্কুলে মেলার আয়োজন করে ছাত্রীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এখানে উৎপাদিত ন্যাপকিনগুলো স্বল্প মূল্য হওয়ার কারনে গ্রামের অনেক দরিদ্র নারীও এটি কিনতে পারছে।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীগণ বলেন, নারী ও কিশোরী স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহের দাবি জানান। তাছাড়া পরিবার পর্যায়, স্কুলে, কর্মস্থলে, বাজারে, রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনেসহ প্রয়োজনীয় সকল স্থানে কিশোরী ও নারীদের জন্য মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বান্ধব টয়লেট নিশ্চিতের দাবি জানান।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সুন্দরবনে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু

মোঃ শহিদুল ইসলাম, বাগেরহাট প্রতিনিধি :: সুন্দরবনের বনজ সম্পদ রক্ষা ও দস্যুদমনে ...

0Shares