ব্রেকিং নিউজ

মানুষ কেন্দ্রীক উন্নয়নে স্যানিটেশন পাঠ

ড. হামিদুল হক

ড. হামিদুল হক :: স্যানিটেশন যে কোন সমাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উন্নয়ন খাত । কোন কোন সমাজে ‘স্যানিটেশন উন্নয়ন’ শিখরে পৌঁছে গেছে, কোন কোন সমাজে স্যানিটেশন উন্নয়ন কাজ করে যেতে হবে আরও দীর্ঘকাল ।বাংলাদেশ এই দীর্ঘ যাত্রার অন্তর্ভূক্ত । অক্টোবর মাসব্যাপী স্যানিটেশন বিষয়ে ব্যাপক সচেতনাতামূলক কার্যক্রম চলছে বাংলাদেশে । শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সরকারি ও দাতা সংস্থার জোড়াল উদ্যোগের মাধ্যমে স্যানিটেশন মাস উদযাপন সফল হবে এটাই সকলের কাম্য ।

দীর্ঘ দিনের কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় একটি এনজিও ‘ডরপ’ এবারের স্যানিটেশন মাস উদযাপনের স্লোগান দিচ্ছে ‘উন্নয়ন হোক মানুষ কেন্দ্রীক’ । তাত্ত্বিক ভাবে এটি একটি যুতসই স্লোগান । কিন্তু তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে কাজ না হয়ে, উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত এবং বাস্তবায়ন হচ্ছে দাতা সংস্থার ‘ধারণাতত্ত্বের’ ভিত্তিতে । একটি বহুল আলোচিত অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক- ষাট-সত্তরের দশকে স্যানিটেশন উন্নয়নে গ্রামে ‘ওয়াটারসীলড’ ল্যাট্রিন বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয় । গ্রামবাসীরা ল্যাট্রিনের রিং দিয়ে তৈরি করেন হাঁস-মুরগির খোয়ার,  আর ল্যাট্রিন স্ল্যাব ব্যাবহার করেন পাগার/পুকর ঘাটে কাপড় কাঁচার পিরি হিসেবে । অনেক মোটিভেশনের পর কিছু  সংখ্যক মানুষ বাড়িতে ল্যাট্রিন বসায় । যাদের অভ্যাস খোলা জায়গায় বা খোলা/ঝুলন্ত ল্যাট্রিনে এক বদনা পানি খরচ করে ‘কাজ’ সেরে নেয়া, তাদের দেওয়া হল ‘ওয়াটারসীলড’ বা ‘জলাবদ্ধ’ ল্যাট্রিন যেখানে প্রতিবার ‘কাজ’ বা ‘টয়লেট’ সাড়ার পর কমপক্ষে এক বালতি পানি লাগে ফ্লাশ বা পরিষ্কার করতে যা সম্ভব হয়না গ্রামের মানুষের পক্ষে ! ল্যাট্রিনে ‘সীল’ বা ‘ওজ’ কাড়াইল বা লাঠির খোঁচায় ভেঙ্গে দেয় । এতে বিপর্যয় আরও বেড়ে যায় । ল্যাট্রিন কূপ থেকে নোংরা পানি ছিটকে এসে গায়ে লাগে । এরপর থেকে আর কেউ ঐ ল্যাট্রিনে ২য় বার যায়না ।

এত দশক পেরিয়ে গেলেও কি এই সমস্যার সমাধান হয়েছে ? যদি হত, তবে বলা যেত ‘স্যানিটেশন উন্নয়ন মানুষ কেন্দ্রীক’  হয়েছে ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘটে যাওয়া ভয়াল সাইক্লোনের পর ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ডরপ সহ বেশ কিছু এনজিও ঝাঁপিয়ে পরে তাদের জরুরী সাহায্য নিয়ে । এরা প্রধানত কুতুবদিয়া ও বাঁশখালীতে কাজ করেছেন। আমার প্রতিষ্ঠিত এনজিও ‘উন্নয়ন সহযোগী টিম (ইউএসটি)’ ও কাজ করে এদের পাশাপাশি । তখন আমি ছিলাম ইউএসটি’র নির্বাহী পরিচালক । বেশ কিছু দিন কাজ করার পর স্যানিটেশন উন্নয়ন কাজ শুরু করলে কোন সাড়াই মিলছিলনা । আমরা তখন কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের ভাই, যিনি ওখানে একটি বড় এতিমখনার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান, তার সাথে আলোচনা করলাম । জানতে পারলাম, গ্রামের নারী পুরুষ সবাই সাগর পাড়ে যায় টয়লেট করতো । পুরুষেরা সূর্য উঠার পর যে কোনো সময় এবং মহিলারা অন্ধকার সময় (সূর্য উঠার পূর্বে বা সূর্য অস্তমিত হবার পরে) টয়লেট করতে যায় ।

আমরা প্রশ্ন তুললাম, “তাহলে পর্দার খেলাপের ঝুঁকিটা থেকেই যাচ্ছে?” উনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “এছাড়া উপায় কী?” আমরা বললাম, “বাড়িতে ল্যাট্রিন বসালে মহিলারা সেটাই ব্যবহার করবেন।” এর পর উনার অনুরোধ (যা পরবর্তীতে সবার চাহিদা হয়ে উঠল) অনুযায়ী আমরা ইউএসটি’র অন্যান্য কর্ম এলাকা থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তনারীদের দশজনের একটি টিমকে এক মাসের জন্য কুতুবদিয়ায় নিয়ে আসি।

তারা ল্যাট্রিন বানালেন এবং স্থানীয় একটি নারী দল গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণ দিলেন।ক্রমান্বয়ে তারা তৈরি করলেন ‘ল্যাট্রিন বানানোর কারখানা’।এই উদ্ভাবনীকে কি ‘জনগণ কেন্দ্রীক উন্নয়ন’ বলা যাবে?

পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কিছুটা পড়াশুনালব্ধ জ্ঞান থেকে বুঝতে পারলাম এই উদ্ভাবন ও অনুশীলনকে Robart Chambers এর ভাষায়, “We participate  in ‘their’ project” বলাযায়।অর্থাৎ আমাদের (উন্নয়ন সংস্থার) কাজ হল গ্রামের মানুষের প্রকল্পে যোগান দেয়া।

অন্য একটি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।একটি দাতা সংস্থার সম্মানিত দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ‘ওয়াটার- স্যানিটেশন’ প্রকল্প ভিজিটে গিয়ে অনেক বাড়ির পেছনে ঝুলন্ত ল্যাট্রিন দেখতে পান।তারা বাড়িতে উপস্থিত সদস্যদের জানালেন, “আপনারা ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগবালাইয়ের শিকার হবেন এবং অন্যদের ও আক্রান্ত করাবেন।যার জন্য আপনারাই দায়ী থাকবেন। ” একটি পাড়ায় একটি বাড়িতে উঠানের কিনারায় একটি গর্তল্যাট্রিন পাওয়া গেল এবং দেখা গেল পোকা কিলবিল করছে, দুর্গন্ধ।বাড়ির প্রধানকে পাওয়া গেলে যিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ। তাকে ভৎসনা করা হল এবং এই অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন বসানোও ব্যবহার কারার দায়ে তাকে পুলিশে দেওয়া যেতে পারে বলা হল।

ঘরের পেছন থেকে মহিলার কান্না শুনে গিয়ে দেখা গেল বৃদ্ধলোকটির স্ত্রী কাঁদছেন।এইবুড়া-বুড়ি’র বাড়ির স্যানিটেশন এবং উন্নয়ন এ্যপ্রোচ যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, তার উত্তরের সন্ধান পাওয়া সম্ভব কি? তবেই-পুস্তক, লেখা-লেখি, আলোচনা-সমালোচনায় উল্লেখিত হতে দেখা যায় যে, দাতা সংস্থা, সরকারি সংস্থা, এনজিও তাদের আর্থিক ও আধুনিকজ্ঞান-দক্ষতাকে ক্ষমতাহিসেবে খাটায় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে।এই অনুশীলনকে পুঁথিগতবিদ্যায়টপ- ডাউনএ্যপ্রোচ বলা হচ্ছে। সেটাইকি ‘জনগণ বা মানুষ কেন্দ্রীক উন্নয়ন’ হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়?

গ্রামীণ স্যানিটেশন সম্পর্কিত আরও একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই।শিশু উনয়নে সহযোগিতা প্রদানকারী একটি দাতা সংস্থার একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা (যিনি একজন এমবিবিএস ডাক্তার) প্রকল্প পরিদর্শনে গ্রামের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে স্কুল ছাত্রীদের মা-বাবার সাথে কথা বলেন।

বাড়িতে ল্যাট্রিন আছে কিনা, খাবার পানির উৎস এবং চিকিৎসা বিষয়ে খোঁজ খবরনেন।ল্যাট্রিন বসানর লাভ কী? এর জবাবে একজন মা বললেন, “ল্যাট্রিন বসানোর আগে আমরাকে বলরাতের অন্ধকারে বাড়ির আশেপাশে ‘কাজ’ (টয়লেট) সারতে পারতাম।অনেক সময় একদিন/ দুই দিন পরপর ‘কাজ’ সারতাম।আমি যখন আগেরবার গর্ভবতী ছিলাম তখন আমার খুব কোষ্ঠ্য- কাঠিন্যের সমস্যা হয়ে ছিল।এখন আমি সাত মাসের গর্ভবতী।এবার আমার এই ধরনের কোন সমস্যা এখনও হয়নি।কারণ আমার বাড়িতে এক বছর হল ল্যাট্রিন বসিয়েছি।আমার প্রয়োজনের সময় আমি ‘কাজ’ সারতে পারি যা আগে সম্ভব ছিল না।”

পরের পরিবারগুলোতেও মায়েদের কাছে ল্যাট্রিনের উপকারিতা সম্পর্কে ডায়রিয়ার চেয়ে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত উপকারের কথা জানতে পেরে ছিলেন ঐ কর্মকর্তা। উনি আমাকে মন্তব্য করেছিলেন, “আমার দীর্ঘদিনের কর্ম জীবনে এই ধরণের অভিজ্ঞতা পাইনি।” আমরা গ্রামবাসীর কাছে শুনে, জেনে, বুঝে এবং তাদের আগ্রহ, চাহিদা ও সামর্থ্যের অনুকূলে প্রকল্প গ্রহণ করেছি।গ্রামবাসীর প্রকল্পে আমরা যোগান দিয়েছি।আমরা একটি আদর্শ ভিত্তিক কর্ম-নীতি অনুশীলন করেছি: Go to the People, Live with them, Plan with them, Start with what they know, Build on what they have.  যাই হোক বাংলাদেশের সার্বিক গ্রামীণ কাঠামো যেমন চরাঞ্চল, হাওড়অঞ্চল, জোয়ার ভাঁটার উপকূলীয় অঞ্চল এবং খোরা প্রবণ অঞ্চল বিবেচনায় নিয়ে স্যানিটেশনের সংজ্ঞা, ধ্যান-ধারণা এবং কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে উপযোগী পরিবর্তন আনা আবশ্যক। মানুষ কেন্দ্রিক স্যানিটেশন উন্নয়ন চাইলে মানুষের জ্ঞান-গরিমাভিত্তিক স্যানিটেশন কর্মসূচিগ্রহণও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

 

 

 

লেখক: গবেষক। ইমেইল: [email protected]

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

করোনা মোকাবেলায় আরো তিন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সাহায্যের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ডেস্ক রিপোর্ট:: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ মোকাবেলায় মানসম্পন্ন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের সার্বজনীন ও ...