আরিফ চৌধুরী শুভ

আমাদের সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যায় আত্মকেন্দ্রিকতার বাহুডোরে। আত্মকেন্দ্রিক বলতে শুধু নিজের বিষয়কে অত্যাধিক প্রাধান্য দেয়াকে বলছি না আমি, অন্যের বিষয়কে প্রয়োজনের চেয়ে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেয়াকেও আত্মকেন্দ্রিকতা বলে। অহেতুক আত্মসমালোচনা যেমন ভালো না, তেমনি পরচর্চা বেড়ে গেলে সমাজে সম্পর্কগুলো ঠুনকো হয়ে পড়ে। অস্থিরতা যখন সর্বোচ্চ চুল্লিতে পৌঁছে, ঠিক তখনই চিন্তা করি সম্পর্কটা আসলে কিসের? হয়তো সেটা আত্মীয়তার, নয়তো অর্থের; কিন্তু মানবিক সম্পর্কগুলো সমাজে কোথায়? সেটা কি মসজিদ, মন্দির, গির্জায়, দেবালয় নাকি ফুটপাতে?

আত্মকেন্দ্রিক সমাজে কোরবান দিলেন লাখ টাকার গরুতে, কিন্তু পাশের প্রতিবেশির খোঁজ নেয়ার সময় কি একটুও হয়েছে? শহর থেকে গ্রামে, এ চর্চা এখন বড়ই বেমানান ও বেরসিক বলে হাসাহাসি করি তাদের নিয়ে, যারা সামর্থ না থাকা সত্ত্বেও অন্তত প্রতিবেশির খোঁজ নেন। অসহায়ের সাহায্যে অন্যকে এগিয়ে আসতে বলেন। প্রকারন্তে, নিজেকে সুরক্ষার নামে বাড়ির সীমানা প্রাচীর তুলে আজ আমরা শুধু একা হচ্ছি না, প্রতিবেশির সাথে সম্পর্কটাও ছেদ করছি। এই ছেদের সম্পর্ক ইট পাথুরের শহরে প্রতিটি এপার্টমেন্টে, অলিতে গলিতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু আত্মপ্রচার দেখি, অপপ্রচার দেখি, কিন্তু মানবিকতা দেখি না। সন্তানকে যদি বাবা মা প্রতিবেশির প্রতি মানবিক হতে উৎসাহিত না করেন, তাহলে দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়লে দোষ দিবো কার?

সবাই মিলে যে সমাজ এতদিন আমরা জেনে এসেছি, সে সমাজে ধনী গরিবের বৈষম্য কি শুধু কোরবানীতেই পরিমাপ করবেন? কোরবানতো বছরে একদিন, কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে প্রতিবেশির সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল। কেমন আছে গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটি কিংবা সড়কে প্রাণ হারানো পিতার এতিম সন্তানগুলো? ফলের মৌসুমে ভুল করেও কি কিছু ফল কিনে সামর্থহীন মানুষের বাড়িতে আপনার পা রেখেছেন?

আমি জানি এসবের বেশির ভাগের উত্তরই আত্মকেন্দ্রিক সমাজে ‘না’ হবে। ‘আমি আয় করছি, আমি খরচ করছি, এটা আমার দেখার বিষয় না’; যেদিন থেকে এই চিন্তা আমাদের নিউরণে জন্ম নিয়েছে, সেদিন থেকেই সমাজের বিচ্যুতি শুরু হয়েছে! রাষ্ট্রের উপরিতলা থেকে নিচতলা, সবখানেই এখন এই চিন্তার শেকড়। নতুবা মানবতার ঘর ভেঙ্গে পড়তো না, জীবন রক্ষাকারী নদীর বাঁধ ভেসে যেত না, হরিলুট হতো না প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রের অর্থ ও চিকিৎসা সামগ্রী।

দাম্ভিকতার সমাজে আপনি যেটাকে দায়িত্ব মনে করছেন না, প্রকারন্তে সেটাই আপনার মানবিক ও বড় দায়িত্ব তা কিন্তু আপনার জানা নেই। আর যদি থেকেও থাকে, তাহলে আপনি উপলব্ধিহীন। মানবিক পরিবারগুলো সন্তানদের মানবিক হতে বলে। আর দাম্ভিক বাবা মা সন্তানকে বাহুবলে সাফল্য শেখায়। বাম হাতকে উৎসাহিত করে। দখল করতে চায় ক্ষমতার চেয়ার। আপনার সন্তানকে মানবিক মানুষ হতে বলুন।

আজকের সমাজে আত্মীক এবং আর্থিক সম্পর্ককে আমরা ঠিকই চর্চা করছি গুরুত্বের সাথে এবং প্রতিষ্ঠিতও করছি, কিন্তু মানবিক সম্পর্ককে সেই কবেই ছুটি দিয়েছি সমাজ থেকে। বছর ঘুরে শুধু কোরবান আসলেই লাখ লাখ টাকা দিয়ে বড় বড় গরু কিনে বিত্তবানের মানবিক হওয়ার প্রতিযোগীতা যে সমাজে, সে সমাজে মানবিক বিয়ের গল্পটাও একরকম বৈধ? আসলে কি এভাবে মানবিক ও পবিত্র হওয়া যায়?

লেখক

শিক্ষার্থী, মার্স্টাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here