জাহিদ আবেদীন বাবু, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি :: আজ ২৫ জানুয়ারী বাংলা সাহিত্যে অমিতাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকাব্যের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৬তম জন্মবার্ষিকী। কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কেশবপুরের সাগরদাঁড়ীতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্বাবধানে ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে চলছে সপ্তাহব্যাপী “মধুমেলা”। গত ২২ জানুয়ারি থেকে এ মেলা শুরু হয়। আর এ মেলা চলবে ২৮ জানুয়ারী পর্যন্ত।

সপ্তাহব্যাপী মধুমেলার তৃতীয় দিন ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মুধ মঞ্চে বাংলা কবিতায় আধুনিকতা ও মাইকেল মধূসূদন দত্ত শীর্ষক বিষয় ভিক্তিক আলোচনায় আলোচকরা তাদের বক্তব্যে এ কথা বলেন, চতুদশপদী কবিতা (সনেট) প্রবর্তনের মাধ্যমে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার ছোয়ায় অলঙ্কৃত করেছেন, যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ এর সভাপতিত্ব প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশীদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা ও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড যশোরের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র।

আলোচক হিসাবে আলোচনায় অংশ নেন কবি ও মধূসূদন গবেষক খসরু পারভেজ, বাঘারপাড়া ডিগ্রী কলেজের অবসারপ্রাপ্ত সহকারি অধ্যাপক সুকুমারর দাস, চুকনগর কলেজের সহকারি অধ্যাপাক হাসেম আলী ফকির, কেশবপুর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সহকারি অধ্যাপক মশিউর রহমান, পিাজিয়া মনোজ ধীরাজ একাডেমীর পরিচালক এম এ হালিম। সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন পাঁজিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উজ্জ্বল ব্যানার্জী ও সাংবাদিক উৎপল দে।

জানা গেছে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি (বাংলা ১২ মাঘ) যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদ সংলগ্ন সাগরদাঁড়ী গ্রামের ঐতিহ্যবাহি দত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা রাজ নারায়ন দত্ত, মা জাহ্নবী দেবী। অসাধারণ মেধার অধিকারী মধুসূদন দত্ত ব্যক্তি জীবনে ছিলেন খাম খেয়ালি, বিলাস প্রিয়। যশ খ্যাতির মহে আচ্ছন্ন মধুসূদন দত্ত হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ১৮৪৩ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। যা তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিতর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে তিনি হিন্দু কলেজ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। মাদ্রাজে থাকাকালে নীলকর ডুগাল্ট্ ম্যাকটাভিসের আশ্রিত কন্যা রেবেকা ম্যাকটাভিসকে বিবাহ করেন। এরপর তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক ইংরেজ অধ্যাপকের কন্যা হেনরিয়েটাকে বিবাহ করেন। শিক্ষা জীবনে মধুসূদন গ্রীক, ফার্সি, জার্মান, ল্যাটিন, সংস্কৃত ভাষা সহ বহুভাষা রপ্ত করেন। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ’।

এ ছাড়া রচনা করেন কাব্য ‘তিলোত্তমা সম্বব, ‘ব্রজাঙ্গনা’ ‘বীরঙ্গনা’ চতুদর্শপদী কবিতাবলী, নীতিমূলক কবিতা, নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ ‘পদ্মাবর্তী’ ‘কৃষ্ণ কুমারী’ ‘মায়া কানন’, প্রহসন ‘বুড়োশালিকের ঘাড়ে রোঁ’ ‘একেই কি বলে সভ্যতা’, উপকথা-রসাল স্বর্ণ লতিকা, অশ্ব ও কুরঙ্গ, কুক্কট ও মনি, মেঘ ও চাতক, সিংহ ও মশকী। ব্যাঙ্গ রচনা- রোগ শয্যায়, দুর্যোধনের মৃত্যু। ইংরেজী রচনাবলী-THE CAPTIVE LAdIE, THE VISION OF THE PAST ইত্যাদি মধুসূদনের অমর সাহিত্য কম। মাইকেল মধুসূদন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ‘সমাধি লিপি’ নামে আট লাইনের একটি কবিতাটি লিখে বলেছিলেন ‘আমার মৃত্যুর পর আমার সমাধির উপরে লিখে দিও সমাধি লিপি কবিতাটি’। কবিতাটি হলো

“দাঁড়াও পথিক-বর জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল ! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যে মতি
বিরাম) মহীর পদে মহাদ্রিবৃত
দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন।
যশোর সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজ নারায়ন নামে জননী জাহ্নবী”।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত অসুস্থ্য হয়ে ১৮৭৩ সালে ২৯ জুন কলকাতাস্থ আলীপুরের জেনারেল হাসপাতালে বেলা ২ টার সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৩০ জুন সেন্ট জেমস চার্চ এবং ধর্মযাজকের উদ্যোগে খৃষ্টীয় রীতি অনুযায়ী কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোডের সমাধি স্থলে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবির মরদেহ সমাধি করা হয়।

এবারের মেলায় সার্কাস, মৃত্যুকুপ, নাগরদোলা ছাড়াও কুঠির শিল্প ও গ্রামীন পসরার প্রায় ৫ শতাধিক স্টল বসেছে। দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ব বৃহৎ এই মেলায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, কৃষি ও লোকজ সামগ্রীর সমাহার সহ বিভিন্ন প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। কবির জন্মজয়ন্তী ও মধুমেলা উপলক্ষ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মধুমেলায় উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতিদিন মহাকবির জীবনীর উপর আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সার্কাস, ইঞ্জিন ট্রেন, মৃত্যুকুপ ও বিসিকের স্টল বসেছে। প্রতিদিন কবির সৃষ্টি, সাহিত্য ও জীবনীর উপর বিষয় ভিত্তিক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কবি সাহিত্যিকগণ। এ ছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যায় মধু মঞ্চে দেশের বরেণ্য খ্যাতিমান শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করছেন।

মেলা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান সাংবাদিকদের জানান, শান্তিপূর্ন পরিবেশে প্রতিদিন মধুমেলায় কবির সৃষ্টি ও সাহিত্য কর্মের ওপর কবিসাহিত্যিকদের অংশ গ্রহণে আলোচনা সভা, আবৃতি অনুষ্টিত হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here