মসজিদ ধুয়ে পানি পান করছে শত-শত মানুষ

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: খুব ভোরে নারীদের জটলা দেখে যে কেউই ভাবতে পারেন, হয়তো কোন ঘটনা দেখার জন্য উৎসুক জনতার ভীড়। কিন্তু কাছে যেতেই বুঝা যায় সে রকম কিছুই নয়। মূলত জটলার পাশে থাকা আধা-পাকা মসজিদ ঘরটি ধুয়ে দেয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা নারীদের ভীড়। এমন দৃশ্য দেখে সবাই হতবাক। শত-শত নারী মসজিদ ধোয়ার নিয়ত করে প্রতি শুক্রবার ভোরে ভীড় জমায়। কেউ কেউ ২ রাকাত নামাজও আদায় করেন। অনেককে মসজিদের দরজা, দেয়াল এবং মেহরাব ধরে কাঁদতেও দেখা যায়।

লক্ষ্মীপুরে রোগ-বালাইসহ বিভিন্ন সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে মানত করে মসজিদ ধুয়ে পানি পান করেন শত-শত মানুষ। জেলার কমলনগরে চর মার্টিন ইউনিয়নে ছেরাজ আমিন জামে মসজিদে প্রায় ২০ বছর ধরে এ ঘটনা ঘটে আসছে।

কমলনগরের হাজিরহাট থেকে ছুটে আসা মধ্য বয়সী নারী জেবুন্নেছা জানান, তিনি মসজিদ ধোয়া কিছু পানি বোতলে ভরে নিয়েছেন। বাড়িতে গিয়ে সেগুলো পান করবেন রোগ মুক্তির আশায়।

তরুণ রহমান নামে আরেকজন জানান, মা-বাবার অনুরোধে তিনি মসজিদ ধুয়েছেন এসএসসি পরীক্ষায় পাশের নিয়তে।

মসজিদ এলাকার বাসিন্দা সালেহা বেগম জানান, যারা একবার পানি দিয়ে মসজিদ ধুয়েছে তাদেরকে আসতে হবে পরপর তিন শুক্রবার। তিনি আরো জানান, তরুণী থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের নারীরাই বিভিন্ন নিয়তে এখানে আসছে অন্তত ২০ বছর যাবত।

তবে এখন নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও আসা শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতি শুক্রবার পূর্বের তুলনায় লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে মসজিদ ধোয়া পানি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন খাওয়ার নিয়তে। অনেকে নিয়ত করে নামাজও পড়ছেন। কেউ কেউ মসজিদের দেয়াল ছুঁয়ে কান্নাকাটি করছেন।

জানা গেছে, বহু বছর আগে মেঘনা নদী যখন (আনুমানিক ১৯৫০ সাল) ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বর্তমান লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ এলাকায় পৌঁছে, তখনকার ভবানীগঞ্জ এলাকার স্থানীয় করিম বক্স জামে মসজিদটি নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে। মুসল্লিরা করিম বক্স জামে মসজিদটি খুলে নিয়ে বর্তমান কমলনগর উপজেলার নতুন জেগে ওঠা চর মার্টিন গ্রামের বর্তমান স্থানে নতুন ভাবে স্থাপন করে। জেগে ওঠা চরের এ স্থানটি জনৈক ছেরাজ আমিনের দখলে থাকায় স্থানীয়রা নতুন মসজিদকে ছেরাজ আমিন মসজিদ নামে নামকরণ করে। মসজিদটি প্রথমে খড়ের ছাউনি থাকলেও পরে টিনের ছাউনি দেয়া হয়। অন্যান্য মসজিদের ন্যায় সাধারণ মসজিদ ছিল এটি।

গ্রামের শাহে আলম পূর্বের মুরব্বীদের বরাত দিয়ে জানান, তিনি শুনেছেন প্রায় ২০ বছর আগে বর্তমান ইমামের বাবা নাকি স্বপ্ন দেখেন, যেসব নারী শুক্রবার এ মসজিদ ধুয়ে দিবেন, বিনিময়ে তার মনের আশা পূরণসহ রোগ মুক্তি হবে। একথাটি কোন এক নারীর কান হয়ে এখন হাজার হাজার নারীর কানে পৌঁছে গেছে। এখন প্রতি শুক্রবারই শত-শত নারী ছুটে আসছেন মনের আশা পূরণের জন্য।

ইমাম মাওলানা জাহের বলেন, ঘটনাটি প্রায় ১৬/১৭ বছর ধরে চলে আসছে সত্য। কিন্তু কীভাবে এটা শুরু হয়েছে তা জানেন না তিনি। তিনি আরো জানান, মহিলাদেরকে এ রকম কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে না। তিনি এটাকে বিদআত হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন।

এদিকে নিয়ত করে মসজিদ ধোয়াকে ধর্মীয় কুসংস্কার ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত কাজ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধ করতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মুসল্লিরা।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

করোনা থেকে রক্ষা করছে মাস্ক: গবেষণা

ডেস্ক নিউজ :: করোনায় ফেস মাস্ক পরায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণঘাতী ভাইরাসটি ...