মলিন মুখ: জেলেদের বেকার জীবন

শিপুফরাজী, চরফ্যাশন প্রতিনিধি :: থেমে গেল সবার ব্যস্ততা। ২২দিন (৯-৩০ অক্টোবর) উপকূলীয় জল সীমানায় মা-ইলিশ শিকার বন্ধ। ইলিশ মৌসুমের শুরুতে যেভাবে ইলিশ ধরার প্রস্তুতি দেখেছি, ঠিক সেভাবেই মৌসুম শেষে জেলেদের ঘরে ফেরার প্রস্তুতিও দেখেছি। ঢালচরে মাছঘাটের আলো হঠাৎ নিভে গেল। রোজগার যা হয়েছে, তা নিয়েই ঘরমুখো সবাই। মাছধরা ট্রলারে থাকা সৌরবাতির প্যানেল, ব্যাটারি, কাঁথা-বালিশ, জাল, দড়িসহ সবকিছু নিয়ে ছুটছে মানুষগুলো। কারও হাতে রশিতে ঝোলানো দু’এক হালি ইলিশ।

টাকা-পয়সার হিসাবের জন্য কেউ কেউ বসে আছেন রাস্তার ধারে। এতসব দৃশ্যপটের মাঝেও মানুষগুলো মলিন মুখ। কারণ,ইলিশ ধরার প্রধান মৌসুম এই চার মাসের শ্রমে যা পাওয়া গেল- তা এক কথায় ‘সমান সমান’ অথবা ‘ক্ষাণিকটা ঘাটতি’। শ্রমজীবী মানুষগুলো কয়েকদিন ভালো খাবে। ধারদেনা শোধ করবে।কেউ নতুন মোবাইল সেট কিনবে। কেউবা নতুন কাপড় কিনবে। অনেকে আবার অবসরে শহরে বেড়াতে যাবে।

ঢালচরের এইসব দৃশ্যপট চিন্তা করতে করতে কথা হয় ঢালচরের জেলে আমীরুল ইসলামের সঙ্গে। খেটে খাওয়া মানুষটার পোড়া শরীর। ইলিশের ভরা মৌসুমে টানা খাটুনিতে এখন বেশ ক্লান্ত। কালচে বুকের ওপর থেকে মাংস ঠেলে সামনে বেরিয়ে এসেছে হাড্ডিগুলো। শরীরে খাটুনির ছাপ স্পষ্ট। চার মাসে ইলিশ ট্রলারের একজন সাধারণ জেলে হিসাবে পেয়েছেন সামান্য কিছু টাকা। ধারদেনা শোধেই তা শেষ হবে।

এরপর দীর্ঘ বেকার জীবনের সূচনা। সারাজীবন খেটেছেন মানুষটা। ভিটে হারিয়েছেন নদীর ভাঙনে। পরিজনসহ এখন থাকেন ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের নিচে। ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারনে ২২দিন (৯-৩০ অক্টোবর) বেকার থাকতে হবে। কীভাবে চলবেন জানেন না আমীর। তবুও তার পান খাওয়া লালচে ঠোটে হাসির রেখা। আমীরুলের মত অধিক কষ্টে লড়াই করে টিকে থাকেন চরফ্যাশনের ঢালচর উপকূলের হাজারো জেলেরা।এবার ঢালচরের প্রায় সকল জেলে নিষেধাজ্ঞা শুরুর একদিন আগেই মাছধরা বন্ধ করেছেন। আড়তদারদের সঙ্গে হিসাব নিকেশ করা, ট্রলারের মালামাল নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য দেখে কোনভাবেই মনে হচ্ছেনা, এদের কেউ নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরতে নামবেন।

এদিকে নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জন্য যে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটা এখনও মাঠে যায়নি। আবার মাঠে গেলেও সেটা সকলের কাছে পৌঁছায় না। সরকারি সহায়তা বিতরণে রয়েছে নানান ধরণের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। নিষেধাজ্ঞা সময়ে জেলেদের নদী-সমুদ্রে যেতে বারণ করার আগে এইসব বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি।

তাছাড়া ট্রলার থেকে উঠে সব মালামাল নিয়ে যে জেলে ঘরে ফিরলো, তাকে অন্তত ২২দিন (৯-৩০ অক্টোবর)বেকার থাকতে হবে। শীত মৌসুমে মাছ ধরতে নামবেন এখানকার খুব কম জেলে। সামনে মার্চ-এপ্রিলে আবার ঝাটকা মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ে জেলেরা কী খাবে? বেকার এইসময়ে কাজের সুযোগ করে দিলে, জেলেরা হয়তো নিষেধাজ্ঞা ভেঙে আইন অমান্য করে নদী-সমুদ্রে আর জাল ফেলবে না। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মিনার হোসেন বলেন , শিগগিরই জেলেদের মাঝে সরকারিভাবে পুনর্বাসনের চাল বিতরণ করা হবে। আমরাও চাই অধিক ব্যয়সাপেক্ষ অভিযানও না করতে। জেলেরা যাতে নিজেদের কথা চিন্তা করেই নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

অনুদানের চেক পেল ৫৪ টি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: বাংলাদেশ মহিলা কল্যাণ পরিষদের অনুমোদন ক্রমে ...