ব্রেকিং নিউজ

মধ্য শ্রেণীর ঈদ: এ যেন এক ঋণ উৎসব

জুঁই জেসমিন

লেখক- জুঁই জেসমিন

জুঁই জেসমিন :: ঈদ অর্থ খুশি! এ খুশি ধনী গরিব সবার। হ্যাঁ একদম তাই। ঈদ এলেই ধনী গরিবরা মহা আনন্দে ঈদ উপভোগ করে। কিন্তু মধ্য শ্রেণী? মধ্য শ্রেণীর ঈদ মানেই মাথায় হাত! ঈদ নয়, যেন এক ঋণ উৎসব। ঘরে থাকুক আর না থাকুক নতুন জামা কাপড় ছেলে মেয়ে, জামাইকে দিতেই হবে। এই মধ্য শ্রেণী না পারে কারো কাছে হাত পাততে না পারে পরিবার পরিজনকে খুশিমত ভাল কিছু দিতে।

এখন প্রশ্ন মধ্য শ্রেণী কারা? বাংলাদেশে আশি শতাংশ মানুষ কৃষিজীবী। কৃষির উপর নির্ভরশীল জীবন ও পরিবার। কৃষক শ্রেণী ও সহকারী শিক্ষক তথা সরকারি ও বেসরকারির দ্বিতীয় শ্রেনীর মানুষ এরা মধ্য শ্রেণীর, এরা কখনওই ধনী মানুষ হতে পারেনা। পনেরো থেকে বিশহাজার টাকার মাসিক বেতনে ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ, দৈনন্দিনের বাজার, ওষুধ, আসবাবপত্র ক্রয় এবং অপ্রত্যাশিত বিপদ আপদ ব্যয়ে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা হয়ে যায়।

ঈদে বোনাস দশ হাজার টাকা দিয়ে কি পুরো পরিবারের নতুন কাপড় কেনা সম্ভব হয়? হয়না! কাপড়ের কেমন দাম ভাবুন তো একটু? নিজ বাড়ি থেকে কর্মস্থল দূরে হওয়ার কারণে বেশিরভাগ এনজিও ও বিভিন্ন কোম্পানি বা গার্মেন্টসের কর্মীসহ চাকুরীজীবী মানুষ, বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। আয়ের অর্ধেক টাকা বাসা ভাড়াতে চলে যায়! বাকি টাকা সন্তানের পড়ালেখার খরচ, বাজার, ওষুধ, ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অভাব পূরণে জীবনের হেরফের অবস্থা হয়ে যায়। এতে কি তারা মনেরমত ঈদ করতে পারে? পারেনা!

আর গরীবদের কথা বলি, গরিব শ্রেণী ফিতরা, যাকাত ও সাহায্য যা পায় তাতে তাদের চাহিদা অপূর্ণ থাকে না, একাধিক নতুন বস্ত্র জোটে তাদের, কারণ তারা হাত পেতে সবার কাছে চাইতে পারে। আর এখন অনেক পয়সাওয়ালাও ফেসবুক স্ট্যাটাসের জন্যই গরীবদের খাদ্য বস্ত্র দান করে ঝকঝকে ছবি আপলোড দেয়। যেখানে হাদিসে লেখা আছে এক হাতে দান করলে অন্য হাত যেন জানতে না পারে। সেখানে সারা বিশ্ব জানছে কে কত খাদ্য-বস্ত্র দান করলো!

ঈদের দিনে ধনীরা গরিবদের ঘরেই রকমারি খাবার দিয়ে আসে, পাশের বাড়ির মধ্য শ্রেনীর পরিবার যে অর্থের অভাবে গরু মাংস কিনতে পারেনি বা চাহিদা প্রয়োজন অনুযায়ী সেমাই চিনি কিনতে পারেনি, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা এক টুকরো খাসি বা গরু মাংস খেতে কতইনা আকুতি করে মায়ের কাছে, বয়লারের মাংসই তাদের ঈদের বিশেষ খাবার।দ্রব্যমূল্যের এতো বেশি দাম যে, মধ্য শ্রেনীর মানুষদের ‘ইচ্ছে চাহিদা’ রোজ রোজ দাফন করতে হয়।

কৃষক শ্রেণীর ঈদের কথা বলি, চরম মধ্যশ্রেণীর মানুষ হলো কৃষক পরিবার। এরা যে হারে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদন করে যাচ্ছে সে হারে তাদের পরিশ্রম স্বার্থক হচ্ছে না। না পারে ফসল বিক্রি করে প্রিয়জনের পছন্দ চাওয়া অনুযায়ী কেনাকাটা করতে, না পারে মাছ মাংস বা চাহিদা অনুযায়ী ভাল খাবার খেতে! নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা।

মাননীয় কৃষি মন্ত্রী জনাব ড. আব্দুর রাজ্জাক ফসলের দাম সস্তা ব্যাপারে বলেছেন, দেশ এখন বেশ উন্নয়নে তাই ফসলের দাম কমানো হয়েছে। আমি মাননীয় মন্ত্রীর কথাতে একমত হ্যাঁ দেশের উন্নয়ন হয়েছে, এখানে প্রশ্ন যেখানে কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত, যেখানে ৮০ শতাংশ কৃষকের মুখে হাসি নেই! যেখানে এতো উৎপাদন এতো উন্নয়ন হওয়া সত্তেও মানুষ নিজ অবস্থান থেকে উন্নত না, অভাবের পীড়ায় দুমড়ে মরে! সেখানে দেশ উন্নয়ন কোন যুক্তিতে বলতে পারি আমরা?

দেশ উন্নয়নে যেহেতু ধানের দাম সস্তা দরে নামানো হয়েছে তাহলে বাকি সব দ্রব্যমূল্যও সস্তা দরে নির্ধারণ করা হয়নি কেন? কেন এতো দ্রব্যের উচ্চ দাম? বাংলাদেশের প্রাণ যেখানে কৃষি ও কৃষকের হাসি, সেখানে এই ঈদ উৎসবে কৃষকের মুখে হাসির বদলে মাথায় হাত। আর মাঠে নেমেছেন ধান কাটতে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে, সারা দেশের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাসহ সাংবাদিক, ছাত্র ও রাজনীতিবিদরা।

প্রশ্ন হলো কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য চেয়েছেন, নাকি জেলা প্রশাসক, ইউএনও, সাংবাদিকদের কাছে ধান কেটে নিতে চেয়েছেন? কত জন কৃষকের ধান কেটে দেবেন তাঁরা? শ্রমিক মজুরেরা কি করবে? হাত পা গুটিয়ে পেটে গামছা বেঁধে বড় বড় অফিসারদের ধান কাটা দেখবে? নাকি ঘুমাবে? আমি বুঝতেছিনা দিন মজুরদের পেটে লাত্থি মারা হচ্ছে নাকি তাদের জন্য ঈদ বরাদ্দ দিয়ে রেস্টে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটা কৃষকের ধান কি মাননীয় সাহেবগণ কেটে দিতে পারবেন? এটা কি গড়পড়তা কৃষকের সমাধান বয়ে নিয়ে আসতে পারে, না আসে?

শুধু মাত্র ফেসবুক স্ট্যাটাস মাত্র- মিডিয়ার বড় শিরোনাম- কৃষকের ধান অফিসারেরা কেটে দিচ্ছেন। প্রতিটি কৃষকের এতে ন্যায্য মূল্য উঠে আসার প্রশ্নই আসে না। স্থানীয় বাজার গুলোতে ধান প্রতি কেজি ১০টাকায় ছাড়তে হচ্ছে কৃষকদের। সরকারিও ঘোষণায় ছাব্বিশ টাকা কেজি দরে ধান কৃষক কি বিক্রি করতে পারছেন ? পারেন না! সরকারি গোডাউন গুলোতে কি সত্যিই সব কৃষকের ধান, গম, ভূট্রা রাখা হচ্ছে? হচ্ছেনা। ব্যবসায়িকরা স্থানীয় বাজার থেকে ধান, গম, ভুট্রা সস্তা দরে কিনে কৃষক সেজে সরকারের কাছে বিক্রি করছে বৃহৎ লাভে! সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে আর এক ব্যবসার হাট ঈদ বাজারে, দোকানদার ও ব্যবসায়ীকদের।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক- কোম্পানি ও গার্মেন্টস গুলোতে একটানা সাত বা দশ দিনের ছুটির ব্যবস্থা নেই! ঈদের পাঁচদিন বা সাতদিন আগে বাড়ি আসতে পারেনা! ঈদের আগের দিন ও ঈদের পরের দিন ছুটি- এই তিন দিন বা চারদিনের ছুটিতে শ্রমজীবী মানুষ কি করে বাড়ি ফিরবে, জ্যামের কারণে বাড়ি ফিরে ঈদের নামাজটাও আদায় করতে পারে না। অথচ গাড়ির টিকিট কাটতে লাইন পেতে আর লাইনে থেকে লম্বা শ্বাসপ্রহরে সহস্র ফোটা ঘাম ঝরাতে হচ্ছে!

শুধু প্রিয়জনদের সাথে ঈদ করার প্রত্যাশায়। এই হলো মধ্যশ্রেণীর ঈদ উৎসব। আর মধ্য শ্রেণীর মানুষেরাই মূলত শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মেহনতি মানুষ – এরা কাউকে শোষণ করে না, এরা শোষিত ও বঞ্চিত হয় উচ্চ শ্রেণীর তর্জনীনির্দেশে। দেশের তিনভাগ মানুষ মধ্যশ্রেণীর, ভাবুন কতজন মানুষ শান্তিপূর্ণ ভাবে ঈদ করতে পারছে?

 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী, ঠাকুরগাঁও। jui.jesmin306@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

sfd rAS

সাহিত্য দিগন্ত কবিতা উৎসব ও একজন লেখকের কথা

রহিমা আক্তার মৌ :: সারাদিনের ব্যস্ততা শরীর পুরোই ক্লান্ত। এশার নামাজ পড়তে ...