ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা

স্টাফ রিপোর্টার :: টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে।

হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এছাড়া তিস্তা ও ধরলাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দেশের অনেক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৌসুমের ফসলি জমি।

আকস্মিক বন্যায় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ও তলিয়ে যাওয়ায় অনেক উপজেলায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

লালমনিরহাট : টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে।

জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ও হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারীর ধুবনী এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এছাড়া চরের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ডুবে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

এদিকে তিস্তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণা করায় তিস্তার চরাঞ্চলে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান জানান, শুক্রবার সকাল ৯টায় তিস্তার পানি প্রবাহ দোয়ানি পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এদিকে ধরলার পানি কুলাঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, সিংগিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

এদিকে শুক্রবার বন্যা পরিস্থিতি দেখতে  হাতীবান্ধার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখেন লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর।

এ সময় তিনি পানিবন্দী লোকজনের সাথে তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। ভাঙা রাস্তা মেরামতের জন্য ৫ হাজার বালির বস্তা বরাদ্দ দেন। এবং জেলায় ৬৮ টন চাল ত্রাণ হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এদিকে গড্ডিমারী ইউনিয়নের ছয়আনী গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, গত তিন দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় থাকলেও তারা কোনো প্রকার ত্রাণ পাননি।

শেরপুর : শেরপুরে ঝিনাইগাতীর বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও মৃগী নদীতে পানিবৃদ্ধির সাথে তীব্র স্রোতের কারণে ভাঙন শুরু হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে মৃগী নদীর ভাঙনে নকলার বাছুর আলগা দক্ষিণ পাড়া গ্রামের আফাজ উদ্দিনের বাড়ির বসতভিটাসহ মাহবুব হাজী ও জামাল চৌকিদারের ১০ শতক আবাদী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভারী বর্ষণের কারণে চন্দ্রকোণার চিকারবাড়ী ঘাট সংলগ্ন ২০ ফুট পাকা রাস্তার নিচের মাটি সরে যাওয়ায় ওই সড়কে যোগযোগ বন্ধ রয়েছে।

বিকালে নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদুর রহমান জানান, নদী ভাঙনের হাত থেকে সতর্ক থাকার জন্য এলাকাবাসীকে নির্দেশ ও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষকে বাড়িঘর সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

এদিকে ঝিনাইগাতীর উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি ভাটির দিকে নামতে থাকায় ঝিনাইগাতী সদর ও ধানশাইল ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মালিঝিকান্দা, হাতিবান্দা ও গৌরিপুর ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বর্তমানে ওই ৫টি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল মাহমুদ। তবে যেকোনো পরিস্থিতি সামালাতে  ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নেত্রকোনা : নেত্রকোনার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে থাকায় উপজেলা ও জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার দুর্গাপুর, বারহাট্টা ও কলমাকান্দা উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।

বন্যার কবলে তিন উপজেলার তিন শতাধিক গ্রামের প্রায় ৫০ হাজারের মতো মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে।

জেলার প্রধান নদী কংস, সোমেশ্বরী, ধনু ও উব্দাখালীতে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যায় সীমান্ত উপজেলা কলমাকান্দার আটটি ইউনিয়ন বড়খাপন, রংছাতি, লেঙ্গুরা, খারনৈ, নাজিরপুর, পোগলা, কৈলাটি ও কলমাকান্দা সদরসহ দুর্গাপুরের গাওকান্দিয়া, কুল্লাগড়া, বাকলজোড়া, কাকৈরগড়া ও বিরিশিরির আংশিক এলাকা এবং বারহাট্টার রায়পুর ও বাউসী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিন উপজেলায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। স্কুল, মাদরাসায় পানি ঢুকছে। কলমাকান্দার পাঁচগাও, লেঙ্গুরা, বড়খাপন, চারালকোনাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামীণ বাজার পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

এছাড়া বড়খাপন, চাঁনপুর, ধীতপুর, পাঁচকাঠা, পালপাড়া, কলেজ রোডসহ বেশ কয়েকটি গ্রামীণ পাকা সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

দুর্গাপুরে বিরিশিরি ও কাকৈরগড়া ইউনিয়নের ১৯৬টি পরিবার ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের ইন্দ্রপুর এলাকায় সেতু ও সড়ক ঝুঁকিতে রয়েছে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মঈন উল ইসলাম জানান, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আপাতত ২০ টন জিআর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া দুই উপজেলায় ৬০০ প্যাকেট শুকনা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্টের নিকটবর্তী পারকুল এলাকায় নদীর বাঁধের মাত্র ১ ফুট নিচে পানি অবস্থান করছে। যেকোনো সময় বাঁধ উপচে পাওয়ার প্ল্যান্ট আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে শুক্রবার সকাল থেকেই বাঁধের ওই স্থানে বালুর বস্তা ফেলে তা উঁচু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে কুশিয়ারা নদীতে শুক্রবার সকাল থেকেই পানি বাড়তে থাকে। দুপুরের পর পানি বিপদসীমার ওপর চলে যায়। সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে পানি বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।

সিলেট : সিলেটের বেশ কয়েকটি উপজেলা বন্যার কবলে পড়েছে। জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জসহ আরও কয়েকটি উপজেলার নিচু এলাকার রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। অনবরত বৃষ্টির কারণে শুক্রবারও নতুন করে বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে।

এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন অন্তত ১০০টির বেশি গ্রামের মানুষ। এছাড়া ১০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।

নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ও ধলাই এবং গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি ও জাফলং পাথর কোয়ারির সকল প্রকার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জানান, টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদের পানি বাড়ছে।

এদিকে কোম্পানীগঞ্জে বন্যার কারণে অন্যতম পর্যটন স্পট সাদা পাথর পানিতে তলিয়ে গেছে এবং প্রবল স্রোতের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ধলাই, পিয়াইন ও জাহাজ খালি অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার সবকটি হাওর তলিয়ে গেছে। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০ ভাগ গ্রামের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়েকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়ায় উপজেলার ৬০টি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জী জানান, উপজেলার সকল আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম জানান, এখানে উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন নিচু এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার দুটি পাথর কোয়ারি ও প্রায় ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার পাল জানান, উপজেলার প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে মোকাবেলা করে দ্রুত রিপোর্ট দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী ত্রাণসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শুক্রবার বিকালে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেট-এর কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে,  কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ১১১ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমা ৩৬ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা বিপদসীমার ১২৩ সেন্টিমিটার, আমলসীদে কুশিয়ারা বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার এবং সারি নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পাউবোর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার জানান, সিলেটের সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও আগামী ২৪ ঘণ্টা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

বগুড়া : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতের ফলে বগুড়ায় সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপদসীমার এক মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। বন্যায় উপজেলার চর এলাকার ৬টি ইউনিয়নের নিচু এলাকা ডুবে গেছে।

আউশ ধান, আমন বীজতলা ও শাকসবজির খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে কৃষি বিভাগ ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেনি।

স্থানীয়রা জানান, পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের তেলিগাড়ী ও শিমুলদাইড় গ্রামে নদী ভাঙনে জমি-জমা ও বাড়িঘর যমুনা নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষ্যে কলাপাড়ায় শোভাযাত্রা

মিলন কর্মকার রাজু কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি :: “জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দূর্ঘটনা আর ...