ব্রেকিং নিউজ

ভারতে মদ ও মদের অর্থনীতি 

শংকর লাল দাশ :: না, ছবি দেখে আঁতকে ওঠার কারণ নেই। আমাদের দেশের ত্রাণের জন্য জনারণ্যের কোন ছবি নয়। এটি ভারতের ছবি। তাও ত্রাণের ভিড়ভাট্টার ছবি নয়। স্রেফ মদের দোকানের সামনে মানবের দীর্ঘ সারির। ছবিটি তোলা হয়েছে তামিলনাড়ুর চেন্নাই থেকে বৃহস্পতিবার সকালে। চল্লিশ দিন বন্ধ থাকার পর গত সোমবার ৪ মে মদ বিক্রি শুরু হতেই ভারতের সর্বত্র প্রায় একই ধরণের দৃশ্য দেখা গেছে।
দীর্ঘ সারির পাশাপাশি সারা ভারত জুড়ে মদ নিয়ে শুরু হয় হুলস্থূল। কর্ণাটকে মদ বিক্রি স্বাগত জানাতে বাজি ফুটিয়ে, বাদ্য বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হয়। দিল্লিতে খরিদ্দারদের ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। মুম্বাইয়ে ভিড় সামলাতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কলকাতাসহ বহু জায়গায় আগের রাত থেকে দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন পড়ে। কোথাও কোথাও এক কিলোমিটার লম্বা লাইন পড়ে। খরিদ্দার সামাল দিতে অনেক জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মদের চাহিদা তুঙ্গে ওঠায় বহু রাজ্যে ৭০ ভাগ পর্যন্ত কর বাড়ানো হয়। অর্থাৎ এক হাজার টাকার মদের দাম ধরা হয় ১৭ শ’ টাকা। এতেও চাহিদা কমে না। এক পর্যায়ে নিয়ম করা হয় কাউকে দুই বোতলের বেশি দেয়া হবে না। এতেও ভিড় কমেনি। শিকেয় ওঠে সামাজিক দূরত্ব। এখন অনলাইনে মদ সাপ্লাই চালুর চিন্তা চলছে।
এদিকে মদ বিক্রি নিয়ে ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে বহু নারী আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। বিক্ষুব্ধ নারীদের দাবি, এমনিতেই পুরুষরা মদ খেয়ে পয়সা ওড়ায়। সংসারে টানাটানি চলে। মাতাল পুরুষরা চালায় নির্যাতন। এতদিন মদ বিক্রি বন্ধ থাকায় সংসার মোটামুটি ভালো চলছিল। নারীদের আশংকা তাদের আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে।
সরকার অবশ্য নারীদের এসব দাবি নিয়ে ভাবতে রাজি নয়। তাদের দরকার অর্থ। এমনিতেই করোনার কারণে রাজস্ব আয় কমে গেছে। তাই এ সুযোগ ভাড়ার যতটা পূর্ণ করা সম্ভব। কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গে প্রথম তিন-চার দিনে শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে প্রথম দিনে শত কোটি টাকার মদ বিক্রি হয়েছে। সম পরিমাণ বিক্রি হয় দিল্লি, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশসহ কয়কটি রাজ্যে।
রাজস্বের কথা যখন এসেছে, তাহলে এক নজরে দেখা যাক গোটা ভারতে মদ রাজস্বের খতিয়ান।
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে ভারতের ২৯টি রাজ্য এবং দিল্লি ও পুঁদুচেরীর মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল একত্রে মদ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল এক লাখ ৭৫ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। যা এর আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোর পরিকল্পনা ছিল শুধুমাত্র মদ থেকে বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা। যা রাজ্যের মোট রাজস্ব আদায়ের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ। বিভিন্ন রাজ্যের অর্থ দফতরের প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থ বর্ষে উত্তরপ্রদেশ মদ বিক্রি থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করেছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। কর্ণাটক প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। মহারাষ্ট্র প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। পশ্চিমবঙ্গ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।  কিন্তু করোনা এবং তার জেরে লকডাউনের কারণে প্রথম এক মাসে সেই অর্থ আয় করতে পারেনি রাজ্যগুলি। রাজ্যগুলির প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। অন্য খাতেও রাজস্ব আদায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সাধারণত, পেট্রোলিয়াম থেকে সব চেয়ে বেশি রাজস্ব আয় করে রাজ্যগুলো। মদ দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে। ফলে সার্বিক ভাবেই অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে।
তাই মদ দিয়ে চলছে অর্থনীতি চাঙা করার একটা চেষ্টা।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে “আওয়ার রোড টু ফ্রিডম”

স্টাফ রিপোর্টার :: হেরিটেজ ট্রাভেলার এলিজা বিনতে এলাহি নির্মাণ করেছেন ট্রাভেল ডকুমেন্টরি ...