বিশেষ সংবাদদাতা। কলকাতা, ভারত :: সেবা! এই শব্দটির ভেতরে অনেকগুলি ইতিবাচক মর্মার্থ মিশে আছে। আমরা যদি পুরাণ, ইতিহাস কিংবা মহামানবদের ফিরে দেখি, দেখব, সবসময়ই ওঁরা ‘সেবা’ শব্দটিকে সামনে রেখেছেন। আসলে সেবা-ই যাঁদের ধর্ম, তাঁদের কখনও পিছু ফিরে তাকানোর অবকাশ থাকে না।
হাওয়া বদলের জন্যে ভারতের উত্তরবঙ্গের জল-হাওয়া পর্যটকদের বরাবরই খুব পছন্দের ও মনের নিবিড়তম স্থান। শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতবর্ষ না, বৈদেশিক পর্যটকদের পাখির চোখ এই পর্যটন কেন্দ্রটি। সুতরাং খুব সহজেই অনুমেয়, এই অঞ্চলের একটি বড় অংশের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান সর্বক্ষণই নির্ভর করে আছে পর্যটন শিল্পের ওপর। কিন্তু নোভেল করোনাভাইরাস যখন থেকে সমগ্র বিশ্বে বিষচক্ষু প্রদর্শন করল, তখন থেকেই সমগ্র বিশ্বের মতোই ভারতের সর্বত্র-ই সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ল তীক্ষ্ণভাবেই। এই রোগের প্রভাবে যেমন অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হল, কর্মসক্ষম প্রধান মানুষদেরও হারাল অনেক পরিবার। তেমনি কর্মচ্যুত হয়ে কর্মহীন হয়েছেন অসংখ্য দিন আনা দিন খাওয়া মানুষজন। যা এখনও অব্যাহত।
মনে রাখতে হবে, এই চিত্রটি সামগ্র বিশ্বের। কিন্তু পর্যটন ও চা-শিল্পের ওপর ভারতের উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের জনজীবন স্থির থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তীব্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এঁদের অনেকেরই পিছু ছাড়েনি। পাশাপাশি স্বল্প আয়। ভরা সংসার। স্বাস্থ্যহানিও লক্ষ্যণীয়ভাবে এইসময় বেড়েছে। তবু আশার আলো, প্রথম থেকেই বর্তমান সরকারের সতর্ক দৃষ্টি উত্তরের দিকে। সরকারি প্রোজেক্টের সমস্ত সুবিধাও পৌঁছচ্ছে জনসাধারণের কাছে।
ঠিক তেমনি ভাবে, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদের নিজেদের পরিধির ভেতর থেকে এইসমস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, নিজেদের শ্রেষ্ঠটুকু দিয়েই। জলপাইগুড়ির দক্ষিণ ধূপঝোরা এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষজন এই সংস্থাটির সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচীকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন ও করছেন। ‘এ.আই. এম. ফাউণ্ডেশন ‘ নামের এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি
প্রতি তিন মাস ব্যবধানে যেমন একান্তে জনসাধারণের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির অনুষ্ঠিত করে, তেমনি বিনামূল্যে চিকিৎসা পরবর্তী ঔষধও বিতরণও করে। চলমান কোভিড-১৯ সময়কালে দীন-দরিদ্র বহু মানুষের খাদ্য ব্যবস্থা করে ওঁদের পাশে আছেন এই সংস্থার কর্মীরা। ‘আমরা উপকৃত। সরকার যেমন আমাদের পাশে আছে, এই নিঃস্বার্থ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীরাও আপনজন হয়ে উঠেছে।’ চোখে মুখে পরিতৃপ্তির হাসি নিয়ে বললেন স্থানীয়রা।
‘জীবন সংগ্রাম চলবে। মানুষ সামনে যাবে, কখনও পিছিয়ে পড়বে। এটাই জীবনধর্ম। কিন্তু তাঁদের পাশে সাধ্যমতো যদি সামান্যও দাঁড়াতে পারি, একটু আস্থার হাত তাঁদের কাঁধে রাখতে পারি, তাহলেই মনে হয় মানবজন্মের কাছে ঋণী থাকব। আমরা সেই চেষ্টাই করছি।’ এমনভাবেই নিজেদের কাজের মূল্যায়ন করেন এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির সার্বক্ষণিককর্মী শ্রীমতী বনশ্রী ভট্টাচার্য। শুধু উত্তরবঙ্গ-ই না পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন এঁরা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন এই সংস্থার স্বেচ্ছাসেবীরা। আমফান বিধ্বস্ত সুন্দরবনের কিছু অংশের মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, ওষুধ, স্যানিটারি ন্যাপকিন। কোভিড প্রোটেকশনের জন্যে মাস্ক, স্যানিটাইজার ও সর্বপরি সুস্থ্য স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রভৃতি।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ ‘জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ’। ‘এ আই এম ফাউণ্ডেশন ‘ উত্তর কলকাতার রেড লাইট এরিয়াতে ১২০ জন শিশুকে নিখরচায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ, স্বাস্থ্য পরামর্শ, খাদ্য সামগ্রী, পৌঁছে দিল সম্প্রতি। এশিয়ার সর্ববৃহৎ এই রেড লাইট এরিয়ার নারী ও শিশুদের অপুষ্টি থেকে বের করে নিয়ে আসার কাজ সরকারি উদ্যোগে বহুদিন থেকেই চলছে। তেমনি ‘এ. আই. এম. ফাউণ্ডেশন’ ( Associated initiative for mankind foundation) এ-এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান শুরু করছে এ-মাসের (সেপ্টেম্বর) ৫ তারিখ থেকে। এদিনের ক্যাম্পে তাঁরা জানান, এখানে তাঁরা নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্প করবেন। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সোনাগাছি, লোহাপট্টি, রামবাগান ইত্যাদি অঞ্চলের জনসাধারণ। এই মেডিক্যাল ক্যাম্পটিকে সহযোগিতা করেছে উত্তর কলকাতার আনন্দ মন্দির। উল্লেখ্য, সম্প্রতি কলকাতার চৈতন্য লাইব্রেরীতে অনুষ্ঠিত এই স্বাস্থ্য শিবিরে উপস্থিত ছিলেন ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)’-এর পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধি।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here