ভক্তরা কেঁদে বুক ভাসালেন: আইয়ুব বাচ্চুর দাফন আজস্টাফ রিপোর্টার :: ‘আর কত এভাবে আমাকে কাঁদাবে/ আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেবো আকাশে।’ নিজের গাওয়া গানের মতোই আইয়ুব বাচ্চু ‘রূপালি গিটার’ ছেড়ে অসময়ে ‘উড়াল দিলেন আকাশে’। আর তার ভক্তরা কেঁদে বুক ভাসালেন। মানুষের স্রোত বাঁধ মানছিল না, বাঁধ মানছিল না চোখের পানি। প্রিয় শিল্পীকে এক নজর দেখতে, তার বুকে ফুলের সৌরভ দিতে দলে দলে এসেছিলেন ভক্তরা। আইয়ুব বাচ্চুর কফিন ছেয়ে গিয়েছিল ভক্তদের ভালোবাসার ফুলে, শোকের অশ্রুতে।

শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নেমেছিল। দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের, সঙ্গীত অঙ্গনের দিকপালরা যেমন এসেছিলেন, তাদের ছাপিয়ে ঢল নেমেছিল সাধারণ মানুষেরও। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর ছাড়িয়ে জনস্রোত চলে গিয়েছিলে আশেপাশের রাস্তায়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তারা প্রিয় শিল্পীর কফিনে শেষ শ্রদ্ধা ঢেলে দিয়েছেন ফুলেল অর্ঘ্যে।

শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সুমনা হক, ফোয়াদ নাসের বাবুসহ অগণিত ভক্ত-অনুরাগী।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় আইয়ুব বাচ্চুর কফিন ঘিরে ছিলেন তার সহযাত্রীরা। এরা হলেন- তপন চৌধুরী, সাফিন আহমেদ, মানাম আহমেদ, কুমার বিশ্বজিত্, রবি চৌধুরী, কবির বকুল, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, আইয়ুব বাচ্চুর ছোট ভাই ইরফান চৌধুরী প্রমুখ। পরে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।

স্মৃতিকথায় আইয়ুব বাচ্চু: আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ব্যান্ড সঙ্গীতে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এ কারণেই তিনি সবার ভালোবাসা পেয়েছেন। তার চলে যাওয়া একেবারেই আকস্মিক। সঙ্গীত ভুবনে তিনি শূন্যতা রেখে বিদায় নিলেন। আমার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম তার দেখানো পথে চলে নবচেতনায় উজ্জীবিত হবে।’

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘সঙ্গীতে তিনি নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন। গানের মাধ্যমে কষ্ট, বেদনাসহ জীবনের নানা অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। নতুন প্রজন্ম বয়ে নিয়ে যাবে তার এই সুরের সাধনাকে।’ নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘শিল্পী হিসেবে আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তরুণ প্রতিনিধি। এই শিল্পী সঙ্গীতে নতুন ভাষা দিয়েছেন। আগামি প্রজন্ম তার সঙ্গীত ধারাকে অনুসরণ করবে।’

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের সুরে মুগ্ধ হয়েছে অগণিত শ্রোতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুনবে তার গান।’ তপন চৌধুরী বলেন, ‘এই শহীদ মিনারে এত মানুষ ভালোবাসা জানাতে এসেছেন— এটাই একজন শিল্পীর জীবনে অনেক বড় প্রাপ্তি।’ ব্যান্ডদল ফিডব্যাকের ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, ‘গানের জন্য তার পরিশ্রম, সাধনা ও ফ্যাশন ছিল সার্বক্ষণিক। তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন।’ সুমনা হক বলেন, ‘আশির দশক থেকে আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে কাজ করেছি। কত শত স্মৃতি! সব স্মৃতি একটি একটি করে হূদয়ে বাজছে।’

জাতীয় ঈদগাহে জানাজা: শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শিল্পীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠে। সেখানে বাদ জুম্মা তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও মানুষের ঢল নামে। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আইয়ুব বাচ্চুর প্রাণপ্রিয় রেকর্ডিং স্টুডিও মগবাজারের ‘এবি কিচেনে’। সেখান থেকে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই ভবন প্রাঙ্গণে। সেখানেও শিল্পী, শুভার্থী ও সহকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাদ আসর তৃতীয় জানাজা পড়ানো হয়। এরপর স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয় শিল্পীর মরদেহ।

আজ শনিবার ভোরে তার দুই ছেলেমেয়ের ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তারা আসার পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে জন্মভূমি চট্টগ্রামে। সেখানে চতুর্থ জানাজা শেষে এনায়েত বাজারের পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। পারিবারিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মারা যান দেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পী গিটারের জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here