ব্যাংকারদের জন্য সম্মিলিত ব্যাংক হাসপাতাল চাই

অনিমেষ চৌহান :: সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল সংক্ষেপে সিএমএইচ। সমস্ত সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এখান থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং ঔষধ পেয়ে থাকেন। এখানকার সব ডাক্তার সামরিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে এএফএমসি/এএমসি স্নাতক। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছাড়াও চিকিৎসা খরচ বহন সাপেক্ষে বেসামরিক ব্যক্তিরাও সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

সামরিক কর্মকর্তারা দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের সুচিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। আর সিএমএইচ থেকে বিনামূল্যে তা পেয়েও থাকেন। একটা দেশের জন্য সামরিক শক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অর্থনৈতিক শক্তিকেও অবহেলার সুযোগ নেই। আর এই অর্থনৈতিক শক্তির যোগানের একটা বড় অংশ হলো ব্যাংক।

একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যত সুশৃঙ্খল, সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং উন্নত। একটা ব্যাংকের কর্মীবাহিনী যত মেধাবী, যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত সহজ। আর সুস্থ চিন্তার জন্য সুস্থ থাকা আবশ্যক।

একজন ব্যাংকার যদি অসুস্থ হন, তাকে সাধারণ মানুষের মতো হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে চিকিৎসার জন্য ঘুরতে হয়। চিকিৎসার পাওয়া এদেশে যখন ভাগ্যের ব্যাপার, তখন বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া কথা চিন্তা করাও কল্পনাতীত।

অথচ প্রতিটি ব্যাংকার এদেশের একজন অর্থনৈতিক যোদ্ধা। তাকে অবহেলার সুযোগ নেই। কারণ একটা দেশের সামরিক শক্তির পূর্বশর্ত তার অর্থনৈতিক শক্তি। অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল হলে সামরিক শক্তি যেখানে ভিত্তিহীন হয়ে দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, দেশের ৬৪টি ব্যাংকে মোট এক লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৫ কর্মকর্তা রয়েছেন। এরা সবাই দেশের একেকজন অর্থনৈতিক যোদ্ধা। সামরিক কর্মকর্তাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। অথচ সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। এদের মধ্যে নারী ব্যাংকার ২০ হাজার ৬০২ জন। নারী কর্মকর্তার এ সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

এদের পরিবারে যদি চারজন করে সদস্য থাকে, তবে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৮০ জন সদস্য হয়। আর সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সদস্য আছে এক লক্ষ ৬০ হাজার (সূত্রঃ বিবিসি)। পরিবারে চার জন সদস্য হলে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪০ হাজার।
অর্থ্যাৎ সামরিক ও অর্থনৈতিক যোদ্ধাদের সংখ্যা প্রায় সমান বলা যায়। কিন্তু স্বাস্থ্যগত সুযোগ সুবিধায় কি সমান?

একজন ব্যাংকার অসুস্থ হলে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে অসহায়ের মতো ঘুরতে থাকেন, বিপরীতে একজন সামরিক কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গেই সিএমএইচে ভর্তি হয়ে যান। এছাড়া কর্মগত পদ্ধতির কারণে একজন ব্যাংকারের অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা যেখানে শতভাগ, সেখানে একজন সামরিক কর্মকর্তার সম্ভাবনা হয়তো ১০ ভাগের বেশি নয়।

একজন ব্যাংকার সাধারণত যে সকল রোগে ভুগে থাকেন, সেগুলো হল- কার্ডিওভাসকুলার জটিলতা। এটা অনেকক্ষণ ধরে একই ভাবে বসে কাজ করার ফলে উচ্চ রক্ত ​​চাপ ও উচ্চ মাত্রায় কলেস্টেরল বাড়ার ফল।

এছাড়া একজন ব্যাংকার যখন দীর্ঘ সময় বসে থাকেন, তখন শরীরের পেশীর কোষগুলি উৎপাদিত ইনসুলিনকে সহজেই সাড়া দেয় না। ফলস্বরূপ, অগ্ন্যাশয় আরও ইনসুলিন তৈরি করে, যা থেকে ডায়াবেটিস হতে পারে।

পাশাপাশি কর্পোরেট জীবনধারায় মানুষের বাড়তে থাকে হাইপারলর্ডিস, টাইট হিপস এবং লাম্প গ্লিউটস, পায়ের সমস্যা, চাপের মাত্রা বৃদ্ধি, ওবেসিটি, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ, হার্টের অসুখ, কোমরের সমস্যা বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে সব পেশায় মাথার কাজ শরীরের তুলনায় বেশি, সে সব পেশার মধ্যেই অসুখের বীজ বেশি।

তাই ব্যাংকারদের জন্য সম্মিলিত ব্যাংক হাসপাতাল (সিবিএইচ) স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই দায়িত্ব নিতে পারে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে আমাদের টিকে থাকতে হলে ব্যাংকারদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অবিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংকেই মূল ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

লেখকঃ ব্যাংকার এবং মুক্ত গণমাধ্যমকর্মী

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হবে

মো: মিজানুর রহমান :: আসলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাবের জন্য দীর্ঘকালীন প্রভাব ভুলে যাই ...