আশনা হাবিব ভাবনা

আশনা হাবিব ভাবনা :: বুঝতে শেখার পর থেকে নিজেকে বেঙ্গী নামেই চিনতাম। বেঙ্গী শব্দের অর্থ আসলে কি? তা এখনও আমি জানি না। কিন্তু এটুকু ধারনা করতে পারি আমি পরিপূর্ণ না বলেই আমাকে পরিবারের সবাই বেঙ্গী বলে ডাকত। কোন কাজ করতে দিলে ঠিকমত পারতাম না, সুন্দর জিনিসকে অসুন্দর করাই ছিল আমার কাজ।দেখতেও আমি ছিলাম অসুন্দর। আর সবচেয়ে অসুন্দর ছিল আমার দাঁত। আঁকা-বাঁকা এবং সামনের সারি উচুঁ। তাই বাসার সবাই আবার নতুন নাম দিল ‘দাঁত উঁচি’।

আমি সবসময় সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার আগে নিয়ম করে একবার দাঁত বের করে হাসতাম।আমার বাথরুমের আয়না ছাড়া আর অন্য কেউ আমার হাসি কোনদিন দেখে নাই।

সেদিন আমাকে দেখতে এসেছে, মানে বিয়ের জন্য। আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম,একেবারে ১০০ তে ১০০।যখন বলল হেসে দেখাও, তখনই হলো ঝামেলা।মা শিখিয়ে দিয়েছিল- আমি যেন কোনভাবেই দাঁত বের করে না হাসি। বারবার ওরা আমাকে হেসে দেখাতে বলে।হাসো মা, হাসো…বলে বলে নিজেরাই হাসছে। ওরা এমনভাবে হাসছিল যে ওদের হাসি দেখে আমার পেট গুরগুর করে হাসি চলে আসল।জোরে হেসে ফেললাম।অমনি মা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, বুঝে গেলাম আজকে আমার খবর আছে।

মা কিছুই বললনা আমাকে। তবে আমার ভাই খোঁচা মেরে বলল-‘সারা জীবন বেঙ্গীই থেকে গেলি’।
মায়ের সেকি টেনশন।ওরা আমার হাসি দেখে নিশিত না বলে দেবে ।

কিন্তু আমার কপাল ভালো।তারা আমাকে পছন্দ করেছে।

আমার মায়ের সে কি আনন্দ,একেবারে ক্লাসে প্রথম হওয়ার মত।সবাই আমার বিয়ের জন্য খুব খুশি।আমারও খুশি হওয়া উচিত। জীবনে প্রথম বাবা, ভাই, মা সবাই আমাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে।ভালো লাগছে,তবে খুশি কিনা জানি না।

শুধু ভাবছি আমার বিয়ে কার সাথে হবে? সেদিন আমাকে দেখতে পাঁচ জন পুরুষ এসেছিল, কাউকেই আমি মাথা তুলে দেখিনি।

আজ ৩ আগস্ট, আমার জন্মদিন। এই দিনেই আমার বিয়ে হবে এক অজানা মানুষের সাথে। আমাকে সাজানো হলো দামী শাড়ি, গয়না পরিয়ে।আর একদম একটা অচেনা মানুষের সাথে আমাকে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিল আমার বাবা-মা।অথচ তারা আমাকে বলেছিল অপরিচিত কারো সাথে কথা না বলতে। কেউ কিছু দিলে না খেতে।

সেই মুহুর্তে আমি প্রথম অনুভব করলাম বাবা- মা ও মিথ্যা কথা বলে।একটা অচেনা লোকের সাথে সবাই মিলে আমাকে একা ঘরে হাসতে, খেলতে, পাঠিয়ে দিল।

সেই রাতে, মানে ৩ আগস্ট আমার জন্মদিনের রাতে আমার প্রথম ধর্ষণ হয়।মূল আসামী আমার স্বামী।অন্যান্য আসামী আমার বাবা, আমার মা, আমার ভাই।

আমার বাবা-মা টাকা পয়সা খরচ করে, সুন্দর করে সাজিয়ে, যৌতুক দিয়ে, ৫০০ জন লোক দাওয়াত করে খাইয়ে, আয়োজন করে নিজের মেয়েকে ধর্ষণ হতে পাঠিয়েছিল। সেদিন আমার বাসর রাত হয়নি। হয়েছিল ধর্ষণ রাত।

সেই রাতের ১৩ বছর পর আজ মামলা করার পর বুঝলাম,আমি আসলেই এত্তগুলো বছর বেঙ্গী ছিলাম।

মাও আমার কানে কানে বলল ‘তুই আর বেঙ্গী নাই, তুই আজকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ’।

মা কেন একথা বলল তা সেই জানে। আমিও জানতে চাইলাম না ।

১৩ বছরে কত দিন হয়, কত মিনিট হয়, আল্লাহ-ই জানে।

আমি মাত্র মেট্রিক পাশ। অংকে কোন দিন ভালো ছিলাম না। অংক ক্লাসে একটু মনোযোগী হলে ১৩ বছরের হিসাবটা ঠিকঠাক বের করতে পারতাম।

থানা থেকে বেরিয়ে রিক্সায় করে যাচ্ছি।একটা নরম বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল।কত রকম বাতাস মানুষের জীবনে আসে।আমার জীবনে বিয়ের বাতাসটা ছিল সবচেয়ে বিশ্রী।এমন দুর্গন্ধ বয়ে এনেছিল,দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

আজ ১৩ বছর পর নতুন এক বাতাসের ঠিকানা আমি পেয়েছি, যে বাতাসে কোন দুর্গন্ধ নেই। যে বাতাস প্রতিরাতের ধর্ষণের ভয় উড়িয়ে নিয়ে আমাকে নির্ভয়ে বাঁচার প্রেরণা দেয়, ছুঁয়ে দেয় সরলতা।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here