ব্রেকিং নিউজ

বেকিং যখন প্যাশনে রূপ নেয়

আমি সামছুত্তাব্রীজ বর্ণা, পেশায় একজন চিকিৎসক, জন্ম চট্টগ্রামে, বেড়ে উঠেছি চট্টগ্রাম আর ঢাকা মিলিয়ে, বর্তমানে থাকি রায়েরবাজারে।

আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ হলো শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ (ঢাকা) ও ভিক্টোরী মডেল হাই স্কুল(চট্টগ্রাম), নাসিরাবাদ ওমেন্স কলেজ (চট্টগ্রাম), জেড.এইচ.শিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল(ঢাকা)।

আমি খুবই অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলাম বিধায় কোনদিন কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করা হয়নি,এমনকি এখনো না।। হ্যা, ছোটবেলায় আম্মার উৎসাহে গানটা শিখেছিলাম বেশ কয়েকবছর।

তারপর ছায়ানটেও রবীন্দ্রসংগীতের উপর এক বছর গান করেছিলাম কিন্তু সেটা শেষ করা হয় নি। যেদিন থেকে বুঝতে শিখলাম, সেদিন থেকেই শুনে এসেছি আমাকে বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে।

আব্বা আম্মার স্বপ্ন আমাকে ডাক্তার বানানো। আলহামদুলিল্লাহ তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। এবার আমার স্বপ্নপূরণের পালা! যেহেতু মনে মননে ডাক্তারী আমার প্যাশন ছিল না, তাই ক্যারিয়ার এদিকে করব না সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। কবে কখন কিভাবে বেকিং এর প্রতি ভালবাসাটা হৃদয়ে গেড়ে বসল নিজেও জানিনা।

আমার মনে আছে ২০১২ সালে প্রথম একটা রান্নার পেইজে কেক এর ছবি দেখে কেক বানাতে ইচ্ছা হলো। প্রথমবার মোটেও ভাল হল না, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারও তেমন ভাল হল না।

এরপর নিজেই একটা রেসিপি করে নিয়েছি যা আজ পর্যন্ত চলছে। এরপর দীর্ঘ ৬ বছর কেবল নিজের আর পরিবারের জন্য কেক বানিয়েছি। ভাবছিলাম কি করা যায়, কিভাবে এটাকে আমি সামনে এগিয়ে নিয়ে যেগে পারি।

বন্ধুবান্ধবরা কেক খেয়ে যখন প্রশংসা করত, খুব খুব ভাল লাগতো। ওরা বলতো, এত ভাল কেক বানাই, একটা অনলাইন পেইজ খুলে আস্তে আস্তে এগোতে পারি! এরপর একদিন বরের সহায়তা নিয়ে ৭ই জুলাই ২০১৮ সালে আমার অনলাইন পেইজ “ডক্টর’স কিচেন” খুলে ফেললাম।

সেদিন থেকেই আমার ব্যবসায়ী /উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা। ২. একদম কোন পুঁজি ছাড়াই আমি আমার উদ্যোক্তা জীবন শুরু করেছি, একদম শূন্য হাতে। টুকটাক যা পেতাম সেটা থেকেই একটা একটা করে জিনিস কিনে কিনে কাজ করতাম, এখনো তাই করি।

অল্প স্বল্প ছোট খাটো কেক এর অর্ডার পেতাম সেটা না পাওয়ার মতই।সাথে খাজুরী পিঠা রাখলাম,এটার ডিমান্ড অবশ্য ছিল। এরপর মনে হলো সাথে ভ্যারিয়েশন কি করা যায়, মানুষ তো নতুনত্ব চায়! সিজন অনুযায়ী পিঠা, হাঁসের মাংস চালের রুটি আনলাম, হালুয়া, মিষ্টি করলাম।

শীতের সময়টা তুলনামূলক বেশি অর্ডার পেলাম, তবে টার্গেট পূরণ করার মত না। তবে মনে কোন শান্তি পাচ্ছিলাম না, বারবার মনে হচ্ছিল আমার প্যাশন হল বেকিং, এগুলো কেন করছি!

তারপরও করেছি, চেয়েছি পেইজটা চলতে থাকুক। তবে এই কাজগুলো করে আমার খুব খুব উপকার হয়েছে! আমার কাছে চালের রুটি বানানো একটা আতংক ছিল,আস্ত হাঁসের চামড়া পোড়ানো ও টুকরো করা ভীষন অসাধ্যের কাজ ছিল!

হাতে কাটা চুই পিঠা এজীবনে কোনদিন বানাই নাই, ভাপা পুলি, দুধ পুলি, ভাজা পুলি সবকিছুই অর্ডারের কাজেই প্রথম বানিয়েছি। এ আমার জীবনে বিশাল এক পাওয়া।

বড় আনন্দ নিয়ে কাজগুলো করেছিলাম। তবে এটা ঠিক এগুলো কন্টিনিউ করার কথা ভাবি নি। একটা সময় সব বন্ধ করে দিলাম, ফোকাস করলাম শুধু কাস্টোমাইজড কেক নিয়ে।

সাথে রাখলাম শুধুমাত্র খাজুরী পিঠা। কেক এর অর্ডার তেমন পেতাম না, কিন্তু খাজুরী পিঠা খুব চলল। তখন বিভিন্ন বড় বড় গ্রুপে বিনা পয়সায় নিজের পেইজ শেয়ার দেয়া যেতো, তেমন কয়েকটা গ্রুপে পেইজ শেয়ার দিতাম, আর অর্ডার নিতাম।

হঠাৎ একদিন গ্রুপগুলোতে নিয়ম করল টাকা পয়সা ছাড়া ফ্রি ফ্রি কোন পেইজ শেয়ার করা যাবে না। মনটা খারাপ হলো কারণ এমন অবস্থা নাই যে টাকা দিয়ে পেইজ শেয়ার দিব।

অর্ডার কমে গেল। তা-ও মেনে নিলাম কারণ জানতাম তাড়াহুড়োর কাজে সফলতা জলদি আসলেও, ঝরে পড়তেও বেশি সময় লাগে না। একক সংসার, চাকরী, সন্তান সব সামলিয়ে পেইজের কাজ করেছি, করছি।

চাকরীর পাশাপাশি ব্যবসা করার ক্ষেত্রে আমি কারো কাছ থেকে সেরকম বাধা বা উৎসাহ কোনটাই তেমন পাইনি। সবার কথা ছিল, ” তোমার যদি ভাল লাগে করতে তাহলে এগিয়ে যাও।

তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবে, আমরা তার সাথেই আছি”। ডক্টর’স কিচেন নামটা করার পিছনে একটা কারণ আছে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা আমি ডাক্তারী পড়ার পিছে দিয়েছি যা কোনদিন আমার ভালবাসা ছিল না।

মানুষ কষ্টের দিনগুলো মনে করতে কেন যেন অদ্ভুত আনন্দ পায়, আমিও আমার অতীতের কষ্ট থেকে জ্বালানী যেন পাই তাই চোখের সামনে “ডক্টর” লেখাটা রেখেছি।

৩. ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হতে চাওয়ার পিছে আমার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, দুনিয়াতে একমাত্র আমার পেইজ টাই আছে যা কেবলমাত্র এবং একমাত্র আমার নিজের বলে বলতে পারি।

এখানে কারো কোন অংশীদারিত্ব নেই, আমার সাম্রাজ্যের আমিই একচ্ছত্র অধিপতি। আয় বৃদ্ধি করাটাও একটা বড় কারণ। আমি মূলত কাস্টোমাইজড কেক এর কাজ করি।

আমার ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে চকলেট ময়েস্ট কেক। আমার কেক তারাই বেশি পছন্দ করে যারা স্বাদের দিকে মনযোগ দেয় বেশি। একটাই কথা আমার ক্লায়েন্টদের, মজা যেন হয়।

কাস্টোমাইজড কেক বানানোর উপকরণ কিনি অর্ডার আসার পর, আর্জেন্ট অর্ডার নেই না, অন্তত তিনদিন আগে অর্ডার নেই, কারণ তাতে কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায় না, উপরন্তু নানা টেনশনে জর্জরিত থাকতে হয়, সব ঠিকমত হচ্ছে তো? আমি আমার ব্যবসা নিয়ে কোনদিন তাড়াহুড়ো করিনি।

এক বছর পার হওয়ার পরও মনে হচ্ছে আমি এখনো হাঁটছি, তবে গতি বেড়েছে। অসুবিধা তো নাই! আস্তে ধীরেই গতি বাড়তে থাকুক না! ব্যবসায়ী / উদ্যোক্তা হতে হলে ফোকাস করতে হবে ধীরে সুস্থে এগোনোর দিকে।

ভিত শক্ত করা ছাড়া উপায় নাই। সৎভাবে কাজ করা, ভাল ব্যবহার, নমনীয়তা, নিজের কাজ ও নিজের উপর বিশ্বাস, এগুলো থাকলে আপনার সামনে এগিয়ে যাওয়া কেউ কোনদিন ঠেকাতে পারবে না,কেউ না।

বিশ্বাস রাখুন নিজের প্রতি, মনে মনে আওরাতে থাকুন,”আমি পারবই,পারতে আমাকে হবেই।” কারো সাধ্য নেই আপনাকে আটকে রাখার। আমার পণ্যের প্রচার আপাতত ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমেই হচ্ছে।

আমাদের এখন কোথাও শোরুম নেই, তবে ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে বড় পরিসরে বেকিং স্কুল খোলার। এখন প্রাথমিকভাবে শুরু করেছি বেকিং স্কুলের, অফলাইন ও অনলাইন দুইভাবেই শেখাচ্ছি,আপুদের কাছ থেকে বেশ ভাল সাড়া পাচ্ছি। ৪. প্রচারেই প্রসার, ব্যবসার ক্ষেত্রে কথাটা একদম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে।

নেটওয়ার্কিং বা জনসংযোগ না বাড়ালে ব্যবসা কোনভাবেই এগোবে না। একজন থেকেই আরো দশজনের কাছে পণ্যের খোঁজ পৌছায়।

নতুন স্টার্টআপে ভালো করতে হলে তরণ উদ্যোক্তাদেরকে অবশ্যই পাবলিক রিলেশনের দিকে গুরুত্ব সহকারে নজর দিতে হবে। এছাড়া ব্যবসায় প্রসারের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না। কথাটা খারাপ লাগলেও এটাই ঠিক। আমি চাকরী আর ব্যবসা নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো আছি।

অন্য কোন খানে আর নিজেকে ব্যস্ত করার ইচ্ছা নেই। আমি যুক্ত আছি in search of female enterpruner গ্রুপের সাথে যার প্রতিষ্ঠাতা উর্মি রহমান আপু।

অত্যন্ত মেধাবী আর বিনয়ী একজন মানুষ যিনি নিজেও পরিশ্রম করতে ভালবাসেন, যারা পরিশ্রম করেন, তাদেরকেও সম্মান করেন। আমি এখনো নিজেকে সে অর্থে সফল বলব না কারণ অনেক অনেক দূর যাওয়া বাকী।

অনেক কাজ করা বাকী। হ্যা, যতটুক এসেছি পথটা খুব মসৃণ ছিল না কখনোই। সবার আগে যেটা নিজের মধ্যে আনতে হবে তা হল বিনয়।

অহংবোধ থাকলে এ জীবনে কোনদিন ব্যবসায় অন্তত উন্নতি করা যাবে না,এক কথায় অসম্ভব। এর সাথে সততা, পরিশ্রমী আর উদ্যমী হতে হবে।

আমার প্রেরণা আমি নিজেই। এই কাজে নিজের ভাললাগা, ভালবাসা আর প্যাশন খুঁজে পেয়েছি বলেই আজ যে অবস্থানে আছি তাকে যদি সফল বলা চলে তবে আমি সফল।

কিছুদিন আগে বিডি বেকারস আয়োজিত দেশের সবচেয়ে বড় বেকিং ফেস্টিভ্যালে অংশ নিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আমার চলার পথের ভীষন গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় হয়ে থাকবে। আমার সিদ্ধান্তের সাথে সর্বপ্রথম একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন আমার বর।

প্রথম থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যা যা সম্ভব আমাকে সাপোর্ট করে এসেছেন। এরপর করেছিলেন আমার আম্মা, আমার শ্বাশুড়ি মা, আর আব্বা৷ আমার ছোট বোন ওর যে কোন অনুষ্ঠানে, কিংবা কোথাও উপহার দিতে গেলে আমাকেই আগে বলে।

এই পাশে থাকার বিষয়গুলাই নিজেকে আরো সামনে নিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা যোগায়। আমার সন্তান যাকে নিয়ে আমি কেক বানাই, যখন ক্লাস করাই, এক পাশে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে। আমার পুরো পরিবারের সবার কাছেই আমি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।

৫. রাস্তায়, বাসে, যে কোন জায়গায় নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে চলাচল করতে পারি যেন আমরা সবাই, এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি আমি।

 

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লীলাবতী হাসপাতাল থেকে ‘জলসা’য় অমিতাভ বচ্চন

ডেস্ক নিউজ :: করোনাভাইরাস রিপোর্ট পজিটিভ আসার ২২ দিন পর হাসপাতাল থেকে ...