ব্রেকিং নিউজ

বৃষ্টি ও পুকুরের পানিই তাঁদের ভরসা

আ হ ম ফয়সল, খুলনা ও বাগেরহাট থেকে ফিরে :: রেহানা পারভীন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই দিন কাটাচ্ছে। সংসারে তেমন একটা অভাব নেই। তবে অভাব রয়েছে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানির। গরমের সময় গ্রামের পুকুরে পানি থাকে না, তাই খাবার পানির খুব কষ্ট হয় তাদের। আবার বর্ষায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বড় পত্র নেই। দৈনন্দিন জীবনে ‘পানি’ই তাদের চিন্তার বিষয় বস্তু। লবনাক্তার কারনে পকুরে পানি থাকা পর্যন্ত পুকুরের পানি, আর বর্ষা থাকা পর্যন্ত বৃষ্টির পানিই তাদের একমাত্র ভরসা। এ সমস্যা শুধুমাত্র রোহানা পারভীনের একার নয়। রেহানারমত হাজারো পরিবারে যুগের পর যুগ কাটছে এভাবেই। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলয় কয়েকটি উপজেলার এ চিত্র নিত্য দিনের। খুলনার পাইগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নে রেহানা পারভীনের বাড়ি। পানির সমস্যা নিয়ে তার সাথে কথা বলতেই একের পর এক প্রতিবেশিরা জড় হতে থাকেন। বেড়ে যায় মানুষের জটলা। সবার চোখে মুখে বিশুদ্ধ পানি পাবার আকূতি। কিছু বল্লে হয়ত তাদের পনি সমস্যার আশু সমাধান হবে- এমন প্রত্যাশায় ঘিরে ধরে।

এখানকার অনেকে আবার ফিল্টারের পানি পান করে। সেই ফিল্টারে সংখ্যাও আবার কম। কয়েক গ্রাম পর একটি/দুটি ফিল্টার চোখে পড়ে। অনেক ফিল্টার আবার অকেজ হয়ে পড়ে আছে দেখতে পাওয়া যায়। এ ফিল্টারগুলোকে বলা হয় পন্ড সেন্ট ফিল্টার (পিএসএফ)। এগুলো বড় পুকুর পাড়ে তৈরী করা হয়েছে। গরু, ছাগল, মানুষজন যাতে পুকুরে নামতে না পারে, তাই সে পুকুরটিকে নেট-কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। টিউবয়েলের সাহয্যে সেই পুকুরের পানি পিএসএফ এ তোলা হয়, সেখান থেকে ফিল্টারিং হয়ে অন্য স্থান দিয়ে পানি পড়ে। এ ধরণের ফিল্টার পানি সংগ্রহ করার জন্য দুই চার গ্রাম নয়, ২/৩ কিলোমিটার দূর থেকেও মানুষ আসে এক কলসি বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করার জন্য। পানি সংগ্রহে প্রতিযোগিতায় বিবাদে জড়ানোর ঘটনা এসব এলাকায় নিত্য দিনের। এটা পর্যায়ে পুকুরের পানি শেষ হয়ে গেলে খালের পানিই খেতে হয় তাদেরকে।

এমন বাস্তবতায় স্থানীয় প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এসব এলাকায় কিছু কিছু পন্ড সেন্ট ফিল্টার (পিএসএফ) নির্মান করে দিয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য প্লাষ্টিক ট্যাংক বিতরণ করেছে। যার পরিমান চাহিদার তুলনায় নামে মাত্র। বিশেষ করে পিএসএফ গুলো নির্মানের করে দিয়ে স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তরের যেন দায়িত্ব শেষ। রক্ষণাবেক্ষনের উদ্যোগ বা ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবহারের কিছু দিন পর অধিকাংশগুলো অকেজ অবস্থায় পড়ে থাকে। ২০১৭ সালে বেসরকারি সংস্থা ডর্‌প এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় সরকারিভাবে ২৫৩টি পন্ড সেন্ড ফিল্টার-পিএসএফ স্থাপন করা হলেও তার মধ্যে ১৪৭টি সচল ও ১০৬টি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকায় বিভিন্ন এনজিও পিএসএফ বসানোর উদ্যোগ নেয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও সংস্কার করারমত দক্ষ লোকবলের অভাবে অনেক পিএসএফ অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

এদিকে অকেজ অবস্থায় পড়ে থাকা পিএসএফগুলোকে সংস্কার করে মানুষের মুখে বিশুদ্ধ পানি পৌছে দেয়ার উদ্যোগসহ বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সংস্থা ‘ডর্‌প’। হেলভিটাস বাংলাদেশ সহায়তায় ডর্‌প মোড়েলগঞ্জে ২০১৭ থেকে, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় ২০১৯ সাল থেকে ‘পানিই জীবন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ২য় ফেইজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় জনস্বার্থ বিবেচনা করে পানি নিয়ে নানামূখি উদ্যোগ ও এডভোকেসির ফলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের পানি ও স্যানিটেশন খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

মোড়েলগঞ্জের সদর ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের মমতাজ আক্তার এতদিন কলসিতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতেন। সম্প্রতি ডর্‌প থেকে এক হাজার লিটারের প্লাষ্টিক ট্যাংক পেয়ে ঘরের সামনে বসিয়েছেন। ঘরে চালের সব বৃষ্টির পানি ট্যাংকে এসে জমা হয়। তার পার্শবর্তী নাসিমা বেগম পানগুছি নদী ভাঙ্গনের মুখে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। তিনি ঘরটি অন্যত্র নিয়ে উঠানোর জন্য সহায়তা চাচ্ছেন এবং ডর্‌প এর কাছ থেকে একটি এক হাজার লিটারের প্লাষ্টিক ট্যাংক পাবার আশায় রয়েছেন।

সংস্থাটির মোড়েলগঞ্জ উপজেলা সমন্বয়কারি সওকাত চৌধুরী জানান, ২০১৭ সালে আমরা যখন মোড়েলগঞ্জে কাজ শুরু করি তখন ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গড়ে জনপ্রতি পানি ও স্যানিটেশন খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩/- টাকা। আমাদের এডভোকেসির ফলে প্রবিছর এখানে বরাদ্দ বাড়ছে। এখন ইউনিয়ন পরিষদগুলোর এ খাতে জনপ্রতি বাজেট বরাদ্দ ৩৯ টাকা।

তিনি আরও জানান, এ বছর আমাদের দেনদরবারের ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৩টি পিএসএফ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের জন্য দরিদ্র পরিবারের মাঝে ৬৪টি ৩ হাজার লিটারের পানির ট্যাংকি বিতরন ও স্যানিটেশ অবস্থার মান উন্নয়নের জন্য ৪৫০ সেট ল্যাট্রিন বিতরন করেছে। আমরা এবছর প্রকল্প হতে ৩টি পিএসএফ সংস্কার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের জন্য ৬৪টি পানির ট্যাংকি বিতরন করেছি।

পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনয়নের সলুয়া গ্রামে সংস্কারকৃত পিএসএফ দেখতে গেলে পানি ব্যবহার কমিটির সদস্য মিতা দাস বলেন, বর্তমানে এটা ডর্‌প এর পানিই জীবন প্রকল্প থেকে মেরামত করে দিয়েছে। প্রথমে যারা তৈরী করেছিল তারা রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য কোন কমিটি বা কাউকে দায়িত্ব দেননি। ডর্‌প এর পরামর্শে এবার আমরা এটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি পানি ব্যবহার কমিটি গঠন করেছি। এছাড়াও আমরা ৬০ জন প্রতি মাসে ১০ টাকা করে সঞ্চয় জমা করছি। কখনো প্রয়োজন হলে সাথে সাথে এ টাকা থেকে মেরামত করতে পারব।

পানি ব্যবহার কমিটির সভাপতি মনোতোষ দাস বলেন, এটা আমরা আমাদের সার্থেই জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করব, কোনভাবেই নষ্ট হতে দেবনা। এছাড়া পানি ব্যবহারকারি মিতা দাস বলেন, আগে এর গুরুত্ব বুঝতাম না, এখন বুঝেছি, তাই এখন আর নষ্ট হয়ে পড়ে থাকবে না। এবার আমারাই এটা ঠিক করবো।

ডর্‌প এর পাইকগাছা উপজেলা সমন্বয়কারী মোঃ আবু সায়েম হোসেন জানান, গত এক বছরে পানিই জীবন প্রকল্প হতে কয়রা ও পাইকগাছায় ৪টি পিএসএফ মেরামত করা ও এডভোকেসির ফলে আর ৪টি পিএসএফ মেরামত হয়। স্বাস্থ্যগ্রাম দলের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারে ১৬১টি প্লাষ্টিক ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরাপদ পানি বিক্রি করার জন্য দুইজনকে ২টি ভ্যান প্রদান করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, করোনা পরিস্থিতিতে ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ৬টি হাত ধোবার ডিভাইস তৈরীসহ ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এছাড়াও এ বছর প্রকল্প থেকে ১০টি পিএসএফ মেরামত ও ৩৫০টি প্লাষ্টিক ট্যাংক বিতরণের পরিকল্পণা রয়েছে।

প্রকল্পের সমন্বয়কারি আমির খসরু জানান, দেশের দক্ষিন পশ্চিম উপকুলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানিতে লবনাক্ততার উপস্থিতি প্রকট। জলবায়ূর পরিবর্তন ও এর বিরূপ প্রভাবে এসকল উপজেলার মানুষ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতির সম্মুক্ষিন হচ্ছে। টেকসই উন্নয়নে পানিইজীবন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয়দেরকে যথাসাধ্য সহায়তা ও ক্ষমতায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় এ্যাডভোকেসী প্লাট ফর্ম স্বাস্থ্যগ্রাম দল, মা-সংসদ, ওয়াশ বাজেট মনিটরিং ক্লাবের মাধ্যমে এ খাতে সেবার মান উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং প্লাটফর্মের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গুলির কার্যকারিতা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে ও বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করছে।

তিনি আরও জানান, মাঠ পর্যায়ে পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে ডর্‌প পানি ও স্যানিটেশন ক্ষাত উন্নয়নে লভি এডেভোকেসি চলমান রেখেছে।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সাগরে নিম্নচাপ, বন্দরে ৩ নং সতর্ক সঙ্কেত

ডেস্ক রিপোর্ট :: সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ার শঙ্কায় সমুদ্র বন্দরগুলোকে তিন ...