ব্রেকিং নিউজ

বুলবুলের মূল আঘাত ভারতে: উপকূলের মানুষের নির্ঘুম রাত

স্টাফ রিপোর্টার ::  ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় বুলবুল শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হেনেছে। রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফ্রেজারগঞ্জ ও সাগরদ্বীপ হয়ে ঢুকে পড়ে সুন্দরবনের ভারতের অংশে। ঝড়ের মূল অংশ বা চোখ স্থলভাগে উঠতে লেগে যায় প্রায় ৪ ঘণ্টা। সুন্দরবনের উভয় দেশের অংশে ঝড়টি মূল অংশ রাতভর তাণ্ডব চালায়।

পশ্চিমবঙ্গে আঘাতের সময় ঝড়ের ডানদিকের অগ্রভাগ পৌঁছে যায় বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা খুলনা, পটুয়াখালী ও বরগুনা উপকূলে। মধ্যরাত নাগাদ এটি পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূল অতিক্রম সম্পন্ন করে। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল একরকম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। তবে ঝড়ের কারণে শনিবারের রাতটি নির্ঘুম কেটেছে বাংলাদেশের উপকূলের ৯ জেলার লাখ লাখ মানুষের।

শনিবার বিকাল ৩টায় ঝড়টির গতিবিধি ও তীব্রতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি বা বাংলাদেশ মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট) বলেছে, সাগরে থাকাকালে ১৫ কিলোমিটার বেগে এগোচ্ছিল এটি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ঝড়টির কেন্দ্র থেকে ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার। কিন্তু এটি যতই উপকূলের কাছাকাছি আসছিল ততই এর অগ্রগতি কমছিল। সন্ধ্যা ৬টায় ঝড়টির আগানোর গতি ছিল ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার। রাত ৯টায় তা ৮ কিলোমিটারে নেমে আসে। পাশাপাশি এর বাতাসের গতি সন্ধ্যায় কমে ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার হয়। কিন্তু রাত ৯টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার হয়েছিল। এভাবে তা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হচ্ছিল। ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় রাত ১২টার মধ্যে ‘প্রবল’ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। রাত সাড়ে ১২টায় এক ব্রিফিংয়ে বিএমডি জানায়, রোববার ভোরে এটি দুর্বল হয়ে সাতক্ষীরা-খুলনা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।

তখন এটি একটি সাধারণ ঘূর্ণিঝড়রূপে থাকবে। অবশ্য ভারতীয় আবহাওয়া অধিদফতর (আইএমডি বা ইন্ডিয়া মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট) বলছে, পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার গতি ছিল এই ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের। উপকূল অতিক্রমকালে এটি প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরে যায়। ফলে বাংলাদেশের পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় মূল আঘাত হানতে পারেনি। তবে রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানে। এর ৫ ঘণ্টা আগে বিকাল ৩টা নাগাদ ঝড়টির অগ্রবর্তী অংশ পৌঁছে যায় পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে। স্থলভাগে উঠে ঝড়ের বড় একটি অংশ মধ্যরাতে আঘাত হানে বাংলাদেশের খুলনায়।

তবে রাত ২টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস ছিল- ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের চোখ আজ (রোববার) ভোর নাগাদ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরা-খুলনার ওপর দিয়ে এটির বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওই এলাকা অতিক্রমকালে ঘণ্টায় এর বাতাসের গতিবেগ ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব শনিবার সন্ধ্যা থেকেই পড়েছিল গোটা উপকূলে। এ সময় বয়ে যায় প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া। এ কারণে শনিবার দুপুরেই খুলনা-বরিশাল বিভাগের ৯ জেলায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছিল।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে ছিল ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। আর কক্সবাজারে ছিল ৪ নম্বর স্থানীয় সংকেত। রাত ২টায়ও ওই সতর্কতা বহাল ছিল। উপকূলজুড়ে এখনও সতর্কতা জারি করা আছে। জনগণের জানমাল রক্ষার্থে সরকার ইতিমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বিএমডি আগেই ঘোষণা করেছিল, পূর্ণিমার জোতে এই ঝড়ের আবির্ভাবের কারণে উপকূলীয় এবং চরাঞ্চলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়েও ৫-৭ ফুট উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো, মূল ঝড়টি আঘাতের সময়েই ভাটা শুরু হয়েছিল। রাত ৩টার দিকে জোয়ার শুরু হয়। ততক্ষণে ঝড়ের চোখ ভারতের সুন্দরবন অংশের রায়দীঘি ও হলদিবাড়ি এলাকার মাঝখানে অবস্থান করছিল।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ভয়াবহতা ও ছোবল থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। উপকূলীয় ১৯ জেলায় দুর্যোগ মোকাবেলায় শুক্রবার রাত থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়। উপকূলীয় এলাকা থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। যদিও অনেকে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু রেখে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চায়নি। ওই অবস্থায় যারা যেতে চায়নি তাদের জোরপূর্বক ধরে নেয়ার নির্দেশনা ছিল সরকারের। জনগণকে সতর্ক করতে শনিবার সকালের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে লাল পতাকা টানানো হয়। পৌনে ৫ হাজার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি সাগরতীরের লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরে যেতে মাইকিং করা হয়। মজুদ করা হয় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১১৬ থানায় দেড় হাজার মেডিকেল টিম গঠন করে।

এর আগে শুক্রবার থেকেই সব নৌযান ও ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়। চট্টগ্রাম ও মোংলাসহ বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে পণ্য ওঠানামাও বন্ধ করে দেয়া হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সাতক্ষীরায় মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি সেখানকার ১৪ জেলায় আনসার-ভিডিপি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। কাজ করছেন পুলিশ সদস্যরাও।

৮টি কমিউনিটি রেডিও বিশেষ সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শনিবারের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা বন্ধ ছিল। আজকে কোনো পরীক্ষা নেই। কালকের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা ইতিমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। সোমবারের জেএসসি ১৩ নভেম্বর এবং জেডিসি পরীক্ষা ১৬ নভেম্বর নেয়া হবে। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি উভয় দল কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম খুলেছে।

শনিবার মধ্যরাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়া এবং ঘরের চালা উড়িয়ে নেয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাগরে এবং উপকূলের নদ-নদীতে জোয়ারের পানি বেড়েছে। সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে খুলনা, বরগুনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন চর।

সে াতের তোড়ে অনেক স্থানে ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধ। সেই ভাঙা দিয়ে পানি ঢুকে পড়ছে লবণাক্ত পানি। কোথাও ভেসে গেছে মাছের ঘের। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সাগরমুখী মাছ ধরার অনেকগুলো ট্রলার উপকূলে ফিরে আসেনি। ১৫ জন জেলে নিখোঁজ ছিল।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, এ ধরনের ঝড় অনেকটা স্থানজুড়ে আঘাত হানে। বুলবুলেরও বাংলাদেশ এবং ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে আছড়ে পড়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে গতিপথ পশ্চিম দিকে সরে যায়। ওই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের উপকূল অতিক্রম করে রাত ১১টার দিকে। যদি ঝড়ের বিদ্যমান গতি অটুট থাকে তাহলে পরে ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন হয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। রোববার ভোর ৭টার পর তা খুলনা এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছাতে পারে। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব পড়ত শুরু করেছিল। ওই এলাকায় ছিল প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়কে চার ভাগে ভাগ করা হলে এর ডানপাশে বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেদিকই ছিল বাংলাদেশ অংশে। যে কারণে খুলনা, বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূল প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ আছে। এর সঙ্গে বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাস থাকে। সবচেয়ে আতঙ্কের হয় যদি আঘাত হানার সময়ে সাগরে জোয়ার এবং পূর্ণিমার মৌসুম থাকে। তখন জলোচ্ছ্বাস বেড়ে যায়।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মিস ইউনিভার্স মুকুট জিতলেন জোজিবিনি তুনজি

ডেস্ক নিউজ :: এ বছরের মিস ইউনিভার্সের মুকুট উঠল দক্ষিণ আফ্রিকার সুন্দরী ...