দেলোয়ার  জাহিদ ::

বাংলাদেশের পাবলিক ও বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি ও অনৈতিকতার চর্চা  যেন এখন মহামারী হিসেবে দেখা দিয়েছে এর থেকে মুক্ত নয় দেশের স্কুল-কলেজগুলো ও। গত  ২৫ মে, ২০২২  সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ধানমন্ডি আইডিয়ালের অধ্যক্ষ ও দুই শিক্ষকের পিএইচডি ভুয়া, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের তদন্তেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

সেখানে ১১ শিক্ষকের নিয়োগ :অবৈধ  ১১ কোটি টাকার নেই কোন হিসাব। শিক্ষক পদে নিয়োগের প্রলোভনে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিচয়ে প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা চলছে । এনটিআরসি শিক্ষক প্রার্থীদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সতর্ক করেছে। শিক্ষক হতে মিথ্যা আশ্বাসে লেনদেন না করতে প্রার্থীদের অনুরোধ জানিয়েছে এ  প্রতিষ্ঠানটি । দৈনিকশিক্ষা ২৩ মে, ২০২২ জানায় নর্থ সাউথের চার ট্রাস্টিকে পুলিশের হাতে তুলে দিলো হাইকোর্ট: ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চার সদস্যের জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। তাদের শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিম্ন আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছে। রোববার (২২ মে) বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ এর  হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি: ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কঠোর হতে হবে শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় যুগান্তরে গত ১৮ মে ২০২২ প্রকাশিত হয়েছে।  যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর, সেহেতু সেখানকার অনিয়ম-দুর্নীতি শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেবল যে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে তাই নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন রকম অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তো শিউরে ওঠার মতো অভিযোগও উঠেছে অতীতে। অথচ একসময় আমাদের দেশের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেই গৌরবের কত অংশ আজ অবশিষ্ট আছে? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে যারা সরাসরি যুক্ত, তারা কি এর দায় এড়াতে পারেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানোর মধ্যে কৃতিত্ব নেই। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যারা যুক্ত তাদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।—তবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা গবেষণার সুনাম ধরে রাখার পাশাপাশি আর্থিক খাতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন, দেশবাসী এটাই আশা করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে যদি আত্মসম্মান বোধের দৃষ্টান্ত স্থাপনে অনীহা সৃষ্টি হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমরা আশা করব, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করার চেষ্টা করবেন।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি এখন মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে কয়েকটি হাতেগুনা  বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া এ অবস্থা থেকে যেন মুক্ত নয় কেউ,  হোক তা পাবলিক অথবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়; এমতবস্থায় শিক্ষার্থীদের নৈতিক বুনিয়াদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে । আলোচনার সুবিধার্থে অবক্ষয়ের কয়টি দৃষ্টান্ত দেয়া হলো মাত্র।

১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে কানাডার  শিক্ষাবিদ এবং গবেষকরা ক্রমবর্ধমান পরীক্ষামূলক এবং দার্শনিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার অন্তর্নিহিত নৈতিক এবং নৈতিক মাত্রাগুলিকে অনুসন্ধান এবং আলোকিত করেন । এ এলাকার সাহিত্যের বেশিরভাগই নৈতিক এবং এর মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত সংযোগে নৈতিক সূক্ষ্মতা, চ্যালেঞ্জ, দ্বিধা, প্রত্যাশা, অনুশীলন, সিদ্ধান্ত, বিচার, এবং আচরণগুলি শিক্ষকের দৈনন্দিন কাজের গতিশীলতায় এমবেড করা হয় এবং শিক্ষাদানে পেশাদার নীতিশাস্ত্রের সুস্পষ্ট ধারণা দেয়া হয় । সুতরাং, শিক্ষকের নৈতিকতা, আনুষ্ঠানিক নৈতিক মানগুলির ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের সমন্বয়ে, আচরণবিধি, এবং এ সম্পর্কিত আইনি প্রয়োজনীয়তা, একইভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়.

” কম আনুষ্ঠানিক, এবং প্রায়শই অপরিকল্পিত, নৈতিক এবং নৈতিক জটিলতার কারণে পেশাদার অনুশীলনের। এ ক্ষেত্রে একটি সাধারণতা হল যে আমাদের মধ্যে অনেক এতে লেখা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছে। একটি স্পষ্ট, ইচ্ছাকৃত, এবং কেন্দ্রীয় উপাদান হিসাবে শিক্ষক নৈতিকতার সাধারণ অবহেলা প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষা (ITE) প্রোগ্রাম; এর সাথে স্কুলে শিক্ষাদান এর নৈতিক দিকগুলোর প্রতি মনোযোগের অভাব এবং অনুপস্থিতি অনুশীলনকারীদের মধ্যে একটি ভাগ করা নৈতিক বা নৈতিক ভাষার… (কলনারুড, ২০০৬ ; সানগার ও  ওসগুথর্পে ২০১৩; সকেট, ২০১২)।

বাংলাদেশে শিক্ষক নৈতিকতার আলোচনা উত্পাদনশীল এবং প্রতিশ্রুতিশীল উপায়ে এগিয়ে নেয়ার কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। নৈতিকতার বিষয়ে ডাক্তার, প্রকৌশলী এবং ডেন্টিস্টদের শিক্ষা প্রয়োজন নৈতিক মান তাদের একটি পেশা কঠিন ভিত্তি। বাংলাদেশে  শিক্ষকদের জন্য নৈতিকতা শিক্ষার উপর একাডেমিক ও পেশাগত সার্টিফিকেশনের জন্য একটি ডেডিকেটেড এথিক্স কোর্স তৈরি করা প্রয়োজন। শিক্ষক শিক্ষা অন্যান্য পেশার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে যা বলার অপেক্ষা রাখে না।   শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নৈতিকতার সংজ্ঞা তির্যক করার সম্ভাবনা পেশাদার নৈতিকতার ভিত্তিগত অর্থ সমসাময়িক শিক্ষক শিক্ষা কার্যক্রমে বিস্তৃতভাবে বিদ্যমান (ক্যাম্পবেল, ২০১৩)। মৌলিক অর্থ অ-অপরাধ, উপকারিতা, ন্যায়বিচার এবং স্বায়ত্তশাসনের সু-নথিভুক্ত নৈতিক নীতির মধ্যে এর ক্রস-শৃঙ্খলামূলক শিকড় রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে প্রয়োজনীয় পেশাগত নীতিশাস্ত্রের পাঠ্যক্রমের বিষয়ে আন্ডারপিন করেছেন কানাডার শিক্ষন বিষয়ক লেখক ও গবেষকবৃন্দ যা  মেডিসিন, আইন, ব্যবসা, সামাজিক কাজ, নার্সিং এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদে পাওয়া যায়, অন্যদের মধ্যে, এ প্রত্যাশিত আচরণের বিষয়ে ব্যক্তিদের নির্দেশ ও নির্দেশ দেয় এবং ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বশীলতা ও  দায়বদ্ধতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।  বাংলাদেশের পরিবেশে শিক্ষাঙ্গনে  দুর্নীতির এ বিষবৃক্ষ পত্রপল্লবে বিকশিত হওয়া অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীদের নৈতিক বুনিয়াদকে ধ্বংস হয়ে যাবে। শিক্ষাঙ্গনে অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার, অনৈতিকতা ও দুর্নীতিকে প্রতিহত করতে সময় ক্ষেপনের সুযোগ নেই।

[লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফ্যাকাল্টি মেম্বার, প্রাবন্ধিক ও রেড ডিয়ার (আলবার্টা, কানাডা ) নিবাসী]

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here