ব্রেকিং নিউজ

বিখ্যাতদের দাম্পত্য জীবন- ৩: নবাব সিরাজউদ্দৌলা

সিরাজউদ্দৌলাসাইদুর রহমান  :: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার কাকা বাবু সিরিজে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে চিহ্নিত করেছেন মাতাল, উচ্ছৃঙ্খল, চরিত্রহীন দূর্বৃত্ত হিসেবে৷ এই ইতিহাস তিনি পেয়েছেন পূর্বসূরীদের থেকে৷ তার পূর্বসূরী লেখকরা যে সময়টাতে ইতিহাস লিখেছেন সেটা ছিলো ইংরেজদের আমল৷ এই সেই উদার(?), বিশ্বস্ত(?), সভ্য(?) ইংরেজ যাদের সময় মাদ্রাসা বন্ধ করে স্কুল চালু করা হয়েছে৷ “রঙ্গীলা রাসূল” এর মত বিতর্কিত বই মুক্তি দিয়ে “পথের দাবী”র মত বই আটকে দেওয়া হয়েছে৷

ইতিহাস বিজেতাদের হাতে লেখা হয়৷ তাই তাদের ইচ্ছেমতই ইতিহাসে সংযোজন-বিয়োজন চলে৷ ইংরেজদের তাঁবেদারদের হাতে রচিত প্রতিটি ইতিহাসে মুসলিম শাসকদের চরিত্র হনন করে হিন্দুদেরকে বুঝিয়েছে মুসলিম শাসকরা হিন্দুদের উপর অনেক নির্যাতন করেছে, আর মুসলমানদের বুঝিয়েছে তোমাদের শাসকরা অনেক খারাপ ছিলো৷ ফলে উপমহাদেশে জন্ম নিয়েছে উগ্রবাদী হিন্দু আর হীনমন্যতায় ভোগা মুসলিম৷

উগ্রবাদী আর হীনমন্যতায় ভোগা মানুষদের পাশ কাটিয়ে অক্ষয় কুমার, সুভাষ বোস, চরণ শাস্ত্রী, গণেশ দেউস্করের মত আধুনিককালের অনেক ঐতিহাসিকই সিরাজউদ্দৌলার বিরূদ্ধে ইংরেজদের তাঁবেদার লেখকদের আনীত অভিযোগ বাতিল করে দিয়েছেন৷ চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে, সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রেও হয়ত কিছু কলঙ্ক ছিলো৷ সিরাজউদ্দৌলা কোন ধর্মগুরুও না, তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতেই পারে৷ সকল আলোচক-সমালোচকদের কলম যেখানে এসে থেমে গেছে, তিনি হলেন সিরাজ পত্নী৷

অতি অল্প বয়সেই সিরাজউদ্দৌলার বেগম হয়ে এসেছেন উমেদউন্নিসা৷ খানদানি আভিজাত্য তার রক্তে৷ রূপ-যৌবন, অর্থ-বিত্ত, যশ-খ্যাতি সবই ছিলো উমেদউন্নিসার, তারপরেও কি যেন একটা কম ছিলো৷ দু’জনের মনের অমিলের কারনে সিরাজ অশান্তিতে ভূগতেন৷ এর মাঝেই একদিন অঘটন ঘটে গেলো৷ অন্দর মহলের সদ্য ফোটা গোলাপের মত সুন্দর এক মেয়ে তাঁর নজর কেড়ে নিলো৷

রাজ কানোয়ার বা রাজকুমারী নামের মেয়েটি কোন রাজার ঘরে জন্ম নেয় নি৷ রাজস্থান না কাশ্মীর কোথাকার কোন গ্রাম থেকে তারা এসেছে কেউ জানে না৷ তার মা সিরাজ জননী আমিনা বেগমের দাসী৷ সব মা মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত থাকে, তাই মেয়েটির মা চেয়েছিলো মেয়েটি যেন নবাবজাদাকে তাঁর রূপের ফাঁদে ফেলে আখের গুছিয়ে নেয়৷ কিন্তু অন্তর যার পবিত্র ভালোবাসায় পূর্ণ, তাকে কি দুনিয়ার ধন-সম্পত্তির মোহ কলুষিত করতে পারে!

মা আমিনা বেগমের অনুমতি নিয়ে সিরাজউদ্দৌলা মেয়েটিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন৷ নবাবজাদাদের কত পত্নী, উপপত্নী থাকে৷ সবাই ভেবেছে এটি নবাবজাদার বয়সের দোষ, কিছু দিন পরেই হয়ত পুরনো খেলনার মত মেয়েটিকে ছুঁড়ে দিবেন৷ তাই এই বিয়েতে তেমন একটা জাঁকজমক হয়নি৷ হারেমে কোন আনন্দের জোয়ার উঠেনি৷ উমেদউন্নিসাই সবার কাছে নবাবজাদার বেগম হিসেবে পরিচিত ছিলো৷

দাসী মেয়েটিও কখনো কারো কাছে বেগমের মর্যাদা চায়নি৷ দাসীর মত নীরবে সেবা করে সে সিরাজের হৃদয়ের সিংহাসন জয় করেছিলো৷ সিরাজউদ্দৌলা মেয়েটির নাম দেন লুৎফুন্নিসা। লুৎফ মানে ভালোবাসা, নিসা মানে স্ত্রী। পুরো মানে প্রিয়তমা স্ত্রী। সিরাজের চরিত্রের ওপর লুৎফুন্নিসার বিরাট প্রভাব পড়েছিল।

সিরাজউদ্দৌলার ইচ্ছে ছিলো দৃষ্টি নন্দন স্বপ্নের রঙে আঁকা “হীরাঝিল” স্ত্রী লুৎফার নামে রাখার, কিন্তু লুৎফুন্নেসার বাধাতে সেটি সম্ভব হয়নি। লুৎফুন্নিসা বলেছিলেন, “আমি ঝিল হতে চাই না। আমি নির্জলা লুৎফা থাকতে চাই। …… আমি চাই না, তুমি আর আমি লুৎফা ঝিলের মাঝে বেঁচে থাকি। তার চেয়ে তুমি এমন একজন নবাব হও, যাতে তোমাকে কেউ কোনদিন না ভুলে। তুমি যদি সেভাবে অমর হও, তাহলে আমিতো তোমার সঙ্গেই বেঁচে থাকবো প্রতি যুগে। আমি যে তোমার প্রাণের আধখানা।”

সিংহাসনে আরোহনের পর থেকেই সিরাজউদ্দৌলা যে সব সমস্যার সম্মুখীন হন তার মোকাবেলার জন্য দৃঢ় এবং শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবার পিছনে লুৎফুন্নিসার চরিত্রিক বৈশিষ্টের পরিচয় পাওয়া যায়। পলাশীর প্রান্তরে হৃদয় বিদারক পরাজয়ের পর গভীর রাতে নবাব দেশের আমীর, ওমরাহ, ধনী ব্যক্তিদের কাছে সাহায্য চাইলেন, যদি আর একবার ইংরেজদের বিরূদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন৷ কেউ সাহায্য করলো না৷ তাঁর শ্বশুর মানে উমেদউন্নিসার পিতাও নিঃস্ব জামাইয়ের পাশে না দাঁড়িয়ে ইংরেজদের সাথে হাত মিলালেন৷

হতাশ হয়ে নবাব ফিরে এলেন হীরাঝিলে৷ মনস্থির করে ফেলেছেন মুর্শিদাবাদ থেকে পাটনা পালাবেন৷ সেখান থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আবার ইংরেজদের বিরূদ্ধে লড়াই করবেন৷ শেষবারের মত দেখা করতে এলেন প্রিয়তমা লুৎফা এবং মেয়ের সাথে৷ লুৎফাকে মুর্শিদাবাদের কোথাও লুকিয়ে রাখতে চাইলেন৷ কিন্তু লুৎফা তা মানতে রাজী হলেন না৷ অনিশ্চিত কষ্টের জীবনে তিনি স্বামীকে একলা ছাড়তে চাইলেন না, নিজেও নবাবের কষ্টের ভাগীদার হলেন৷

সিরাজের মৃত্যুর ইতিহাস মোটামুটি সবারই জানা৷ সিরাজের মৃত্যুর সময় লুৎফুন্নিসার বয়স কতই বা হবে? হয়ত পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশ৷ নতুন করে জীবন শুরু করার মত অনেক সময় সামনে পড়ে আছে৷ অপরূপ সুন্দরী তিনি৷ পরবর্তী নবাব মীর জাফর, তার পুত্র মিরন সহ অনেক আমীর, ওমরাহ, ধনী লুৎফার পাণিপ্রার্থী৷ যে হৃদয়ে সিরাজ বাস করে সে হৃদয় তিনি অন্য কাউকে দিতে চাননি৷ মীরনকে তো রীতিমত অপমান করে বলেই দিয়েছেন, “হাতির পিঠে যে চড়েছে, সে কি গাধার পিঠে চড়ে?”

আলীবর্দী পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের সাথে লুৎফুন্নিসাকেও পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায় জিঞ্জিরা কারাগারে৷ বন্দিনী অবস্থায় কখনো অনাহারে, কখনো অর্ধাহারে দিন কাটে৷ তিনি জানেন, একটু আপোষ করলেই তিনি বিলাসী জীবন কাটাতে পারেন৷ কিন্তু তা কি করে হয়? সিরাজ নেই বলেই কি তাঁর ভালোবাসায় ছেদ পড়বে! এ হতে পারে না৷

প্রায় আট বছর কারাবরণের পর তাঁকে খোশবাগের দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যেখানে শুয়ে আছেন নবাব আলীবর্দী ও তাঁর আদরের নাতি সিরাজ৷ তিনি সিরাজের কবরের কাছে একখানি কুঁড়েঘর তৈরি করেন৷ প্রতিদিন সকালে ফুল ছড়িয়ে দিতেন কবরের উপর৷ ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক যে মাসোহারা পেতেন তা দিয়ে কাঙ্গালিভোজের ব্যবস্থা করতেন।

সিরাজের মৃত্যুর চৌত্রিশ বছর পর লুৎফা একদিন সিরাজের কবরে ফুল ছড়িয়ে দিয়ে তারই উপর লুটিয়ে পড়েন৷ পৃথিবী থেকে চির বিদায়ের সময়ও সিরাজই তাঁর শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন৷

কতবড় বিদুষী ও মহিয়সী নারী হলে জীবনের সব লোভ ও আয়েশ পরিত্যাগ করে মৃত্যু পর্যন্ত স্বামীর ধ্যানে কাটিয়ে দেওয়া যায়, স্বামী একটু চোখের আড়াল হলে যারা অন্য বুকে আয়েশ খোঁজে তা ঐসব জৈবিক তাড়নার পূজারী বিলাসী হৃদয়ের রমনীদের চিন্তারও বাইরে৷

কবি বলেছেন, “নহে আশরাফ যার আছে শুধু বংশ পরিচয়, সেই আশরাফ জীবন যাহার পূণ্য কর্মময়।” নাম, যশ, খ্যাতি, ধন, সম্পদ, বংশ গৌরব উমেদউন্নিসার সবই ছিলো৷ শুধু ছিলো না স্বামীর প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা৷ অন্যদিকে লুৎফুন্নিসা ছিলেন সর্বহারা৷ স্বামীকে নিখাদ ভালোবেসে তিনি অমর হয়েছেন বাংলার ইতিহাসে৷ তাইতো আজও সিরাজ আলোচক-সমালোচক সবার কলমই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এই মহীয়সীকে৷

চলবে………

লেখকঃ কলামিষ্ট

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নজরুল ইসলাম তোফা

দুর্নীতিরোধে সরকারের জিরো টলারেন্স

নজরুল ইসলাম তোফা :: ঔপনিবেশিক আমলের ঘুনেধরা শাসনব্যবস্থা সর্বস্তরে যেন বিদ্যমান আছে। ...