মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান ::বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ সাল। করোনার এই মহামারীর দুর্যোগেও বাংলাদেশের নানা দিক অগ্রগতি বিশেষ করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে প্রশংসনীয়। ২০৩০ সালে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে ২০ বছর (২০২১-২০৪১) বাংলাদেশকে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ১০ শতাংশ ধরে রাখতে হবে।

সুতরাং এই লক্ষ্যে বাজেটের আকার বৃদ্ধি হবেই এবং লক্ষ্যমাত্রা নানা বৈশিক মহামারীর মধ্যেই অর্জন করতে হবে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের মার্চ থেকেই বিপর্যস্ত হয়েছে অর্থনীতি। নিম্ন আয়ের মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর আয় দারিদ্রতার সম্মুখীন হয়েছে এবং অনেকেই ঝুঁকিতে আছে। যার থেকে আমাদের উত্তরণ অতীব জরুরি। এই লক্ষ্যে দেশজ উৎপাদনসহ আভ্যন্তরিন সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ বিশেষভাবে প্রয়োজন। যার মধ্যে চাহিদাভিত্তিক ও সময়োপযোগী বাজেট প্রণয়ন অন্যতম পরিকল্পনা।

আগামী ৩ জুন বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদের সর্বোচ্চ বাজেট ২০২১-২২ অর্থবছর পেশ হতে যাচ্ছে। রাজস্ব আয়ের সর্বোচ্চ ও সাহসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট পেশ করার প্রস্তুতি প্রায় শেষ। যা গরীবের বাজেট বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বর্তমান সময়ের বিবেচনায় দারিদ্র্য সীমার নিচে নতুন করে চলে আসা দরিদ্রের জন্য এই বাজেট হবে একটি বড় প্রত্যাশার জায়গা। আগামী অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে ধরা হচ্ছে। যদিও করোনাকালে লক্ষ্যমাত্রার কতটা রাজস্ব আহরণ সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, তবুও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকবে ৭ শতাংশের ঘরে।

যেহেতু বাজেট হচ্ছে সরকারি আয়-ব্যয়ের সংখ্যাগত হিসাব এবং আমাদের সরকার সাধারণত আগে ব্যয় নির্ধারণ করে; পরে আয়ের উৎস ঠিক করে; তাই সংশোধিত বাজেটকেই আসলে মূল বাজেট হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ এবং নানামুখী দারিদ্র্য বিমোচনভিত্তিক কর্মসূচির বিশাল বাজেট সরকারেরই, বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের দায়বদ্ধতার ফল। বাজেট হচ্ছে সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সংখ্যাগত পরিকল্পনা। এই বাজেটকে করতে হবে জনঅংশগ্রহণমূলক এবং সবার কাছে বোধগম্য। বাজেট আলোচনা এখন শুধু অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষ এখন বাজেট নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করছে। তৈরি হচ্ছে নানামুখী জনসচেতনতা। এপ্রিল মে মাস থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে চাহিদাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কাজ প্রতি বছর হয়ে থাকে এবং গণমুখী বাজেট প্রণয়ের তালিকা তৈরি হয়।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ২০১৯ সালের জেএমপি তথ্যমতে বাংলাদেশের মাত্র ৪৭.৮ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনাভিত্তিক পানির আওতায়। সুতরাং পানির জন্য প্রয়োজন বাজেট বরাদ্দ। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে পিছিয়ে পড়া গ্রামাঞ্চল, চর, পার্বত্য অঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয়তার নিরিখেই অধিক অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। বাজেটকে অংশীদারিমূলক করতে প্রতিবছর যে প্রাক্-বাজেট আলোচনা হয়, গত বছরের মতো এবারও করোনার কারণে তা খুব বেশি হয়নি।

এই সময়ে জাতীয় বাজেটের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের বাজেট চূড়ান্ত করণের লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাক্-বাজেট আলোচনা হয়েছে। র্ড্প-ওয়াশ এসডিজি প্রোগ্রামের সহযোগিতায় ওয়াশ এসডিজি নাগরিক কমিটি ও ইউনিয়ন পরিষদ বরগুনা জেলার সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রাক বাজেট সংলাপের আয়োজন করে। উক্ত প্রাক্-বাজেট সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজন। ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে জনগণের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতসহ বিভিন্ন উন্নয়ন চাহিদা নিয়ে সংলাপে আলোচনা হয়। করোনা অতি মহামারী’র জন্য সীমিত সংখ্যক নারী এবং পুরুষ এর উপস্থিতিতে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই সভার আয়োজন করা হয়।

পিছিয়ে পড়া /হতদরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা বিবেচনা করে অত্র এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, গভীর নলকূপ, পিএসএফ স্থাপন, নলকূপ মেরামত, গণশৌচাগার নির্মাণ এবং স্কুলে ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারী ন্যাপকিন সরবরাহ করা এবং মাসিক বান্ধব টয়লেট নির্মাণে সর্বমোট প্রায় ৫ কোটি টাকা বাজেট চাহিদা পেশ করেছে ওয়াশ এসডিজি নাগরিক কমিটি। এবছরের ওয়ার্ড সভা ও ওয়ার্ড ভিত্তিক পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন বিষয়ে যে সব চাহিদা পাওয়া গিয়াছে সেগুলিকে চূড়ান্ত করে ইউনিয়ন পরিষদের সাথে সভায় জানানো হয়।

সরকারের গত নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কেন্দ্রীয় দর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করে বিভিন্ন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সুতরাং অভিজ্ঞ সরকারের এই রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের বাজেট ২০২১-২২ অর্থবছরের দিকে আমরা চেয়ে আছি। ন্যায্যতাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন হলে আয় বৈষম্য যেমন কমবে, তেমনি উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থানমুখী, এবং দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নমুখী বাজেট তৈরি হবে। বাজেট ব্যয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার প্রক্ষেপণ করা আছে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।

আগামী সপ্রসারণমূলক বাজেটে ঘাটতি ধরা হবে জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি। সেই হিসাবে আগামী অর্থ বছরে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগামীতে কিভাবে প্রস্তাবিত বিশাল বাজেট ঘাটতির পূরণ হবে, তা নিয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। দারিদ্্র্য দূরীকরণে বাজেটের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দরকার। ২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক বাজেট কর্মসূচি (আইবিপি) সংস্থার তালিকায় বাংলাদেশ বাজেট প্রণয়নের স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে ৪১ থেকে নেমে ৩৬ নম্বরে স্থান পেয়েছে।

সমাজের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবন মান পর্যালোচনার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রনয়নের উপর ইদানিং বেশ জোড় দিয়ে বলা হচ্ছে, যা খুবই যৌক্তিক। আমরা আশা করছি উন্নয়ন বাজেটে বা এডিপিতে এবারের এই বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাবে এবং বাজেট আলোচনায় পুঙ্খানু-পুঙ্খভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনে জনগণের বিশেষ সুপারিশ নিয়ে জনবান্ধব বাজেট ২০২১-২২ ঘোষিত হবে। আমাদের জোর দাবি এবার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের বিনিয়োগ কৌশল অনুযায়ী বরাদ্দ হয়।

সরকারি বিভিন্ন আইন, নীতিমালা, কৌশলপত্র ইত্যাদির মধ্যেও এই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। তাই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন অবস্থার উন্নয়নে চাহিদা অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বাজেট প্রত্যাশা করা হয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং সকল শ্রেণী পেশার মানুষ এক যোগে কাজ করতে হবে। এসডিজি অভীষ্ট ২০৩০ অর্জনের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা দরকার যা এর স্থানীয়করণ এর মাধ্যমে সম্ভব, বিশেষ করে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

(বরগুনা সদর উপজেলা, আমতলী ও পাথরঘাটা পৌরসভা, বরগুনা জেলার অভিজ্ঞতার আলোকে)

লেখক: গবেষনা পরিচালক, ডর্‌প, এবং এসডব্লিউএ দক্ষিণ এশিয়া সিএসও প্রতিনিধি ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here