ব্রেকিং নিউজ

বাংলাদেশের এনজিও, বৈমাত্রেয় ত্রাতা

একেএম জসীম উদ্দিন :: বঙ্গবন্ধু কণ্যা সৎসাহসী একথা বিশ্বাস না করার লোক এ দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ গত কয়েক বছরে দেশ ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত তাঁকে এ সন্দেহের উর্ধে নিয়ে গেছে। দেশের অবকাঠামো জগতে বিভিন্ন মেঘা প্রকল্পের পাশাপাশি নিজস্ব আয়ে পদ্মা সেতু তৈরীর সিদ্ধান্ত তাকে আরও বেশী সাহসী এবং প্রত্যয়ী করেছে। সারা বাংলাদেশের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে উন্নয়নের ছোঁয়া খালিচোখেই দেখা যায়। মধ্যম আয়ের দেশের দিকে গুটি গুটি এগিয়ে চলা একটি দেশের জন্য অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই লক্ষ কোটি টাকার বেশী প্রনোদনা যোষনা করা সোজা কথা নয়। করোনা নিয়ন্ত্রনে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ না জানানোর কোন কারন নেই। এ মহামারি প্রতিরোধে সরকারের গৃহিত সব ব্যবস্থা সমালোচনার উর্ধে না হলেও দেশের জনগণও লকডাউনসহ অন্যান্য সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বেচ্ছা বন্ধিত্ব মেনে নেয়।

অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায়, কারখানার মেশিনপত্তর স্তব্ধ হয়ে যায়, গাড়ীর চাকা থেমে যায়, দোকান পাট, মার্কেট সপিংমল সাটডাউন হয়ে যায় সাথে সাথে সংগত কারণে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকাও থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই একটা সময়ে মানুষ জীবন জীবিকা নিয়ে অস্থির হতে থাকে, লকডাউন সিথিল হয়, মানুষও আবার জীবিকায় ফিরতে শুরু করে। এ ছাড়া উপায়ও নেই। অনন্তকালতো আর ঘরে বসে থাকা যাবেনা।কিন্তু একটা বিষয় ভাবতে অবাক লাগছে।

এত এত সাবধানবাণী, শতমুখের সতর্কতা কিছুকেইতো আমরা পরোয়া করছি না। জানি সামাজিক দুরত্ব বা শারীরিক দুরত্ব মেনে চলা একটু কঠিন, কিন্তু, গার্মেন্টস্কর্মীদের ঢাকায় আসা যাওয়ার খেলা, ঈদকে কেন্দ্র করে, কেনা কাটা, বাজার সদাই বা বাড়ী যাওয়ার বা ফেরার যে কান্ড আমরা দেখলাম তাতে মনে হয় অদৃশ্য শক্তি করোনাকে আমরা পাত্তাই দিচ্ছি না, নিজের পায়ে কুড়ালের কোপ না পড়া পর্যন্ত আমরা সচেতন হই না হবও না। তাই আঁতেল এর মত বলি আমরা অনেক কিছুই শিখি তবে অনেক মূল্য দিয়ে। আমাদের অপেক্ষা মনে হয় সেই দিকেই।

তবে একটা বিষয় অন্য অনেকের মত আমাকেও ভাবাচ্ছে! আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবস্থা যে এতটা নাজুক তা মনে হয় কেউই ভাবতে পারিনি। বিশ্বে কোন কোন দেশ দিনে যেখানে লক্ষ লক্ষ করোনা টেস্ট করছে সেখানে আমরা দু’মাস পেরিয়েও হাজার দশেকে পৌছাতে পারলাম না। করোনা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় শুনি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাজেট নাকি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম। গনস্বাস্থ্য’র রেপিড টেস্ট এর বিষয়টিও ধোঁয়াসাচ্ছন্ন।

পরম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি গনতান্ত্রিক দেশে এমন মহামারিতে এমপি, মন্ত্রীরা মাঠে নাই,আপাত সিথিল লকডাউন, গার্মেন্টস খোলা না খোলা, দেশের একজন উপসচিব এর হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে মৃত্যু, সিলেট থেকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে সময়মত ঢাকায় শিফট্ করতে না পারা, এসআলম গ্রুপের মত শীর্ষস্থানীয় একটি শিল্পগোষ্ঠির পরিচালক এর যথাযথ সার্ভিস এর অভাবে পরপারে চলে যাওয়া, কেমন যেন গোলমেলে। একেই হয়তো বলে হযবরল অবস্থা। এসব ঘটনা আমার মত যদু মধুদের শংকিত করে তুলে, কি হবে আমার? আমিও যদি!! বিশ্বাস আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেক্টরের এ দৈন্য দশা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠবে।

অন্য একটি বিষয়ও লক্ষণীয় বাংলাদেশে শিল্পখাত বা রফতানিখাতে ইর্ষণীয় উন্নতি হলেও স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ চোখেপড়ার মত নয়। গুটি কয়েক আধুনিক হাসপাতাল থাকলেও তা যতটা না সেবামূলক তার চাইতে অনেক বেশি বানিজ্যিক।পত্র পত্রিকায় দেখতে পাই, বাংলাদেশে হাজার কোটি টাকার মালিকের অভাব নেই।সম্প্রতি প্রত্রিকায় দেখলাম সম্পদশালীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে গত দশকে বিশে^র শীর্ষে পৌঁচেছে বাংলাদেশ যার হার ১৪.৩ শতাংশ। দেশের এত এত ধনীরা দাতব্য কাজের অংশ হিসাবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কিছু কি করতে পারেন না? সুইস ব্যাংকে টাকা জমিয়ে হবে টা কি? করোনা ধরলেতো ফুরত!

এনজিওতে যেহেতু কাজ করি তাই এ নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে। বাংলাদেশে এনজিওদের নিয়ে একটি নেতিবাচক প্রচারণা দেখা যায়। এনজিওরা করোনা’র শুরু থেকেই অন্যান্য দুর্যোগ কালীন সময়ের মতই দরিদ্র জনগোষ্ঠির পাশে আছে। তারপরও সমালোচনার শেষ নাই।এনজিওরা সবসময়ই মাঠপর্যায়ে উন্নয়নকাজে সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা ও সমন্বয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। আমরা বলে থাকি যত সমন্বয় তত ফলাফল। করোনা’র মত মহামারিতেও আমরা আশা করেছিলাম রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন, প্রাইভেট সেক্টর এর মধ্যে সমন্বয় করে সবাই মিলে একযোগে কাজ করা হবে। কিন্তু তা দেখা গেল কই?

সারা বিশ্বে উন্নয়ন কার্যক্রমে বর্তমানে ননস্টেট এ্যাকটর বা সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশন (সিএসও) বা এনজিওদেরএকটা বড় ভুমিকা দেখা যায় এবং জাতিসংঘ সহ বড় বড় উন্নয়ন সহযোগীরা তাদের বার্ষিক বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সিএসওদের অংশগ্রহণ ও তাদের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিভিন্ন দুর্যোগকালীন সময়েও সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় থাকে। বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন মিশন বা ডেলিগেট অফিসদেরও এমনটি করতে দেখা যায়।

কিন্তু সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে এটি আমরা কদাচিৎ দেখি, যা দেখি তাও অনেকটা দাতাদেশের আরোপিত শর্তপূরণের দায় হয়ে আসে অথবা সিএসও’র উপুর্যপুরি দেনদরবারের কারণে হয়। বাংলাদেশের এনজিওরা সেই স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে দেশ পূর্নগঠন থেকে শুরু করে অদ্যাবধি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নখাতে নিরলসভাবে কাজ করেও যেন সরকারের আপন হতে পারে নি। বৈমাত্রেয় চাহনি যেন তার অংগে লেগে থাকে নিরবচ্ছিন্ন আঁঠার মত। এনজিওরা নব্য মহাজন, সুদখোর, রক্তচোষা কত উদাহরণ দিয়েই না এনজিওদের চিহ্নিত করা হয়। এনজিওরা লক্ষ টাকার প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা মেরে কেটে শেষ করে দেয়। যেহেতু নেটওয়ার্কে কাজ করি তাই বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছোট বড় এনজিও কর্মী ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য প্রায়শই কানে আসে।শুনে মাঝে মাঝে মনে হয় এনজিওতে যারা কাজ করে তারামনে হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

এক এনজিওর নির্বাহী পরিচালক, যিনি এক সাবেক সচিবের স্ত্রী এবং ঢাকা ভার্সিটির ডাকসাইটে সাবেক নেত্রী, একদিন খুব দু:খ করে বলছিলেন কেন যে এনজিও করতে আসছিলাম, মান সম্মান সব শেষ? জিজ্ঞেস করাতে বললো জেলা প্রশাসককে স্যার না বলে আপা বলায় উনি প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়ে বলেছেন “হাউ ডেয়ার ইউ টু কল মী আপা” ইত্যাদি ইত্যাদি। আরেক এনজিও নেত্রীকে একটা সভায় দাওয়াত দিয়েছিলাম, উনি আসবেনও ঠিক ঠাক, কিন্তু সভার আগেরদিন ফোন করলে জানালেন আসতে পারবেন না, কারণ কি! জেলা এনজিও সমন্বয় কমিটির সভা, সংস্থার প্রধান না থাকলে নাকি প্রশাসন রাগ করে, প্রতিনিধি পাঠালে দাঁড় করিয়ে রাখে। আরেক ঘটনাতো আরও অপমানজনক, তখন মনে হয় শীতকাল মাসিক সমন্বয় সভায় ব্লেজার পরে না যাওয়ায় দুই এনজিও কর্মীকে মিটিং থেকে বের করে দেয়ার কথা বলা হয়। কখনও কখনও শুনতে হয় যোগ্যতা থাকলেআপনারাতো সরকারি কর্মকর্তাই হতেন।

সরকারি কর্মকর্তারা সব অর্থেই ভাগ্যবান, সন্দেহ নেই তারা খুব মেধাবী। যোগ্যতা সম্পন্ন বলেই তারা প্রিভিলেজ্ড গ্রপে আছেন। কিন্তু এনজিও কর্মকর্তারা কি এতই যোগ্যতাহীন? সুযোগ পেলে তারাও কি ঐ কাজ করতে পারতেন না। বিসিএস এর যোগ্যতার মাপকাঠিতে তারা হয়তো উত্তির্ণ হতে পারেন নি। আমারতো মনে হয় তাদের ব্যর্থতার চাইতে তাদেরকে একোমোডেট করতে না পারার ব্যর্থতা এখানে বেশী। লক্ষ লক্ষ প্রার্থীর মধ্যে সুযোগ দেয়া যায় মাত্র কয়েকজনকে বাকীরা এক আধ মার্কের জন্য বাদ পরে যায়, তাই তাদের যোগ্যতাহীন বলাটা কতটা সমীচিন! আমার এমনও জানা আছে যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্বেও উন্নয়নকাজে সম্পৃক্ত হওয়ার মানসিকতা থেকেই অনেকে এনজিওতে এসেছেন। আর স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে যারা উন্নয়ন কাজে যুক্ত হয়েছেন তাদের কাছে দেশের প্রতি আত্মনিবেদন ও দেশপ্রেমই ছিল মূল কথা।

সুতরাং তাদের প্রতি এ বৈমাত্রেয় আচরণ কতটা গ্রহণীয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সচেতনতাবৃদ্ধিসহ,পরিবেশ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার রক্ষাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিবিড়ভাবে জড়িত এসব সামাজিক সংগঠন যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগে ত্রাতার ভুমিকায় নেমেছে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এত এত অগ্রগতির পিছনে এনজিও’র অংশগ্রহণকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বর্তমানে এনজিও খাতে সরাসরি কর্মরত কয়েক লক্ষ শিক্ষিত ছেলে মেয়ে, জড়িত ব্যপকসংখ্যক উদ্যোক্তাও স্ব-কর্মসংস্থানী পরোক্ষভাবে সরকারের উপর চাপ কমিয়ে কিছুটা হলেও কি ত্রাতার ভুমিকা রাখেনি?

রাষ্ট্রই দেশের মূল নিয়ামক শক্তি, এতে সন্দেহ নেই। দেশের মানুষের সব ধরণের সেবা, তার সুখে শান্তিতে নির্বিঘ্নে জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তারপরও সময়ের প্রয়োজনে, স্থানীয় চাহিদা পূরণে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে অনেক স্থানীয় উদ্যোগ গড়ে উঠে যা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় বেসরকারি উন্নয়ন খাত হিসেবে সরকারের পাশাপাশি কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে জিও-এনজিও সম্পর্ক আজও যেন বেসুরো গানের মত।
৮০’র দশকের দি ফাদার ছবির নায়িকার বিদেশী বাবার খুব মর্মস্পর্শি একটি ডায়লগ ছিল “২২ বছর বাংলাদেশে থাকিয়াও আমি খুকুর বাবা হইতে পারলাম না, এদেশি হতে পারলাম না”। বাংলাদেশের এনজিওরাও কি একইভাবে বাংলাদেশে বৈমাত্রেয় ত্রাতা হয়েই থাকবে?

 

 

 

 লেখক: উন্নয়নকর্মী, পরিচালক এডাব। [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

করোনা রোগীদের মাঝে ‘ঢাকাস্থ চন্দ্রগঞ্জ থানা সমিতি’র ওষুধ ও পুষ্টিকর খাদ্য বিতরণ

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি  :: লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে প্রাণঘাতী করোনায় পজিটিভ রোগীদের ...