বৃষ্টিপতনের শব্দ

সানি সরকার  

এই শহরটাকে বড় বিস্ময়কর মনে হয়। কত রং। আবার রঙের মতো অনেক কিছু, কিন্তু কিছুই নয়। ভাঙা, পলেস্তরা খসে পড়া বাড়িগুলোর বাংলা ইটের দেয়ালগুলোতে কত কথা। তাকিয়ে দেখলে মনে হয়, ঠিক যেন অসংখ্য চোখ। চোখে চোখ পড়লেই অতর্কিতে বেরিয়ে আসবে কথা। এইভাবে রাত ফুরবে। দিন ফুরবে। তথাপি কথার পিঠে কথা বাড়বে, ঠিক প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো। গল্পের ভেতর থেকে ওই বৃদ্ধা মহিলা নেমে আসবেন সিঁড়ির নিচে। ওঁর পোটলা থেকে বের করবেন ছেঁড়া কাঁথাটি। যেটি ও-আগলে রেখেছেন যুগ-যুগান্তর থেকে। বৃদ্ধা মহিলা চিৎকার করবেন। বাড়ি মাত করবেন, ক্ষীণ চিৎকারে। আশেপাশের মানুষগুলির অভ্যস্ত কান এখন আর কিছুই শোনে না। ওঁরা জানে, একটি বুড়ি থাকেন। কিন্তু কবে থেকে, কোথা থেকে এই পুরনো বাড়ির সিঁড়ির নিচে ও-থাকেন কেউ জানে না। জানতে আগ্রহীও না। বুড়ি নিজের মনে বিড়বিড় করেন। ওঁর এত রাগ! জগৎ-সংসারসুদ্ধ সমস্ত কিছুর ওপর অসম্ভব রাগ। এইভাবে ও-বিড়বিড় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েন…

ভীষণ হাসি পেল। সেই কখন থেকে বৃষ্টির শব্দটা কানে লেগে আছে।  হাতের সিগারেটটি পুড়তে পুড়তে ফুরিয়ে গেল। সিগারেট ফুরিয়ে গেলে আস্তে আস্তে আগুনও নিভিয়ে যায়। রাস্তা পেরোই। কোথায় একটা গান বাজছে, সঙ্গে গিটারেরধ্বনি। ঘুমন্ত শহরের রাস্তায়, আলসে আলো। আমার আলসেপণা ভালো লাগে না। আমার কী ভালো লাগে? জারুল ফুল? ওয়াইনের ঝাঁপিয়ে পড়া হায়েনার মতো গন্ধ? সমস্ত গল্প ফুরিয়ে যাবার পরে, কিছুক্ষণ আর গল্প থাকে না। আমারও নেই। নেই? কেন?

এসপ্ল্যানেড ট্রামডিপোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তার ওপারে আলো ও অন্ধকারে ব্যবসা সাজিয়েছে মাঝরাতের নারী ও পুরুষ। ধীর চিৎকার ও গালাগাল ধ্বনিত হচ্ছে।

রাত পাহারা দিচ্ছে কয়েকটি পুলিশ ভ্যান। ওই দিকে যাব? একটি বেঞ্চের ওপর শুয়ে আছে চা-ওয়ালা। কী আরামে ঘুমচ্ছে। এক একটি উদ্বাস্তু সংসার গোটা ফুটপাত দখল করে আছে। এক জোড়া কুকুর শৃঙ্গাররত। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম ওদিক থেকে। বুক পকেটে হাত রাখলাম। পেন নেই। মনে হল, হাতটি ফাঁকা! ফোন নেই। এবার আমার ভীষণ হাল্কা লাগছে। ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া থেকে অনেক অনেক দূরে। আমার নাকে আঁচড় কাটছে কী এক গন্ধ! ঠিক চিনতে পারছি না।

এখন কোথায় এলাম? ভবানীপুর? এই পাড়াটির প্রতি আমার সেই অসম্ভব টান, চুম্বকের মতন। এই পাড়া। পুরনো বাড়িঘর। এখন অনেক বহুতল উঠেছে। ওই তো পূর্ণ সিনেমা হলের গলি, চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি স্ট্রিট, হরিশপার্ক…। হঠাৎ ভ্রমরের কথা মনে পড়ল, ‘তুমি তো রঙ কানা জানতাম। গন্ধও?’ ভ্রমর হাসছে। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে। আমি ওকে দেখছি। মানুষ এত সুন্দর করে হাসতে পারে?

‘কী গো কিছু বলছ না বড়! মুড অফ?’

‘না। ঠিক আছে।’

‘তাহলে?’

‘তোমার মনে হয় না, পৃথিবীর, এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুর এইভাবে হাসা উচিৎ?’

‘ও এই কথা। তা তো উচিৎ-ই। কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর ডিপেন্ড করে তো সবকিছুই।’

‘তুমি নিজেই তো হাসতে ভুলে গেছ, সেটা জানো?’

বলে কী মেয়েটি, আমি হাসতে ভুলে গিয়েছি!

একটা পাথরের ওপর বসেছিল ভ্রমর, সামনে তাকিয়েছিল। নাকি দেখছিল নিজেকেই? একটি সবুজ রঙের ছোট্ট পাখি, উড়ে এসে বসল আরেকটি পাথরে।

সবুজে ঘিরে আছে চাদ্দিক। মেঘলা আকাশ। গুমোট বাতাসে ভ্রমরের শরীর থেকে অদ্ভুত গন্ধটা ভেসে আসল।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। ওর দুই কাঁধে হাত রেখে রাখলাম, ‘এই পৃথিবীর কাছে আর কোনও ঋণ নেই / মায়া আছে কিছু, কিছু হিরন্ময় লাবণ্য…/এই পৃথিবী একমাত্র শীতের বাঘের মতো / আমাকে প্রতিটি জন্মের জন্যে বাঘিনীর প্রেমিক হিসেবে পাঠায় …’

‘বাহ। আর পরের লাইনগুলি?’

‘আর তো কিছু জানি না এমুহূর্তে।

ভ্রমর চোখের ওপর চোখ রাখল। ওর চোখে সেই দিব্য আলো, যেন পরাধীনতা, যেন বন্ধনরত ঢেউ। বলল, ‘এই তো বেশ, এই ঢের ঋণ। / কার কাছে রেখে যাব সব? / কার কাছে দিয়ে যাব মায়া? / বীণাবাদকের বুকের ওপর রেখেছি মাথা / বীণাবাদকের ওষ্ঠে ছুঁয়েছি ঠোঁট… / প্রেম তো শীতল আগুন, / প্রণম্য শ্রীরাধিকা, ওতো আপনি-ই শিখিয়েছেন।’

ভ্রমরের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। শীতল শ্যামলা মুখটিতে ভেসে উঠেছে অনতিদূর আকাশের মেঘ। মেঘগুলি দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক। ওর মুখের ওপর বৃষ্টি নামল ঝুম। সবুজ পাতার ওপর বৃষ্টি। পাতাগুলিও ধূসর থেকে চিক্কন হয়ে গেল, মুহূর্তে…

এতক্ষণ সবাই চুপ করে ছিল।

পিয়াল বলল, কীরে তারপর পড়?

রৌদ্র চুপ।

বীথি বলল, কী হল তারপর?

রৌদ্র হাসছে।

শিল্পী বলল, এটা ঠিক হচ্ছে না। গল্পটা শেষ করো? ওই ভদ্রলোক কী ভবানীপুরেই থাকবেন?

রৌদ্র জানলার দিকে তাকিয়ে আছে।

শুভ বলল, পড়ে ফেল বাকিটুকু।

রাজেশ বলল, ভাব বাড়াচ্ছে বুজছ না বন্ধু। এত দাম বাড়াচ্ছ কেন, বন্ধু?

সোমাশ্রী মানে ঝুমঝুম জনসমক্ষে খুব একটি কথা বলতে বরাবরই স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। ও সবার দিকে চেয়ে আছে। মেঘশ্রী মিটিমিটি হাসছে ও প্যাঁচ কষছে, আরেকটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়ার জন্যে।

গুরুপ্রসাদ দা সবার থেকে সিনিয়র, রৌদ্র-র বস। দীর্ঘ সাংবাদিক জীবন। প্রখর দূরদৃষ্টি ও ক্ষুরধার কলম। খুব আস্তে রৌদ্রের চোখের দিকে চেয়ে বললেন, সবগল্প শেষ হতে হবে কেন?

রৌদ্র জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরে থেকে বৃষ্টির গন্ধ আসছে। ওঁর চোখের সামনে ভাসছে একটা লাল রঙের গোলবাড়ি, বাড়ির ভেতর ও বাইরেটা। আর বৃষ্টিপতনের শব্দ। তারপর কেমন একটা তছনছ। কেমন একটা উষ্ণপ্রস্রবণ, ভাঙা, জোড়া…

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here