হীরেন পণ্ডিত:: হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আইন কমিশন হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ করে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে হিন্দু পারিবারিক আইন বলতে বিবাহ, ভরণপোষণ ও বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য বিষয়, উত্তরাধিকার, দান, উইল, দত্তক, নাবালকের তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুসৃত ধর্মীয় আইন বুঝায়। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু আইন আইনসভা কর্তৃক একাধিকবার পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। ঐ সকল রাষ্ট্রীয় আইনও এখন হিন্দু আইনের অংশ। পরিবর্তনশীল সমাজের প্রয়োজনে এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের সর্বজনীন ধারণাকে সামনে রেখে অন্যান্য আইনের মত পারিবারিক আইনেরও সংস্কার করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আইন কমিশনের ২০১০-২০১১ সনের দ্বি-বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় পারিবারিক আইনের পর্যালোচনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরই অংশ হিসেবে হিন্দু পারিবারিক আইনের গবেষণা কাজ শুরু হয়।

এই গবেষণা প্রতিবেদনে হিন্দু পারিবারিক আইনের বর্তমান অবস্থা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিবন্ধকতা ও সংস্কারের পক্ষের এবং বিপক্ষের ব্যক্তিগণের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু অধ্যুষিত ভারতের আইনী সংস্কার পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে গবেষণা করা হয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার লেখা সংগ্রহ করা এবং প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে প্রশ্নমালা তৈরী ও বিতরণ করা হয়। ঢাকা চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর হিন্দু জনগোষ্ঠির ২৫০ জনের নিকট প্রশ্নমালা প্ররণ করা হয় যাদের মধ্যে বিচারক, আইনজীবী, ছাত্র, গৃহিণী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও অন্যান্য পেশাজীবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ২৪৬ জন উত্তরদাতা তাদের মতামত প্ররণ করেন যা একত্রে সংকলন করা হয়।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি ফোকাস গ্রæপ আলোচনার আয়োজন করা হয়। উক্ত আলোচনায় হিন্দু আইনের সংস্কারের প্রয়োজন আছে কিনা বা সংস্কারে বাধা কোথায় বা কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার হতে পারে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত গ্রহণ করা হয়। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি আলোচনাপত্র তৈরী করে জাতীয় কর্মশালায় আলোচনার জন্য তুলে ধরা হয়। উক্ত কর্মশালায় সংস্কারের পক্ষ-বিপক্ষের প্রতিনিধি, নীতি নির্ধারক, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালে আইন কমিশন হিন্দু আইনের সম্ভাব্য সংস্কারের উপর একটি ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। তৈরী করা হয় একটি ব্যাপক গবেষণাপত্র এবং তার ভিত্তিতে হিন্দু আইন সংস্কারের একটি খসড়া আইন। এগুলো রিপোর্ট আকারে কখনোই সরকারের নিকট প্রেরণ করা হয়নি। বর্তমান কমিশন তার রিপোর্ট প্রণয়নে উল্লিখিত গবেষণা ও খসড়া থেকে যথেষ্ট সহায়তা লাভ করেছে।
হিন্দু আইনের ভিত্তি, হিন্দু আইনের আনুষ্ঠানিক উৎস হিসেবে বৈদিক যুগের ঐশী বাণীসমূহ (শ্রুতি বা বেদ) পরবর্তীতে বস্তুগত উৎস যেমন স্মৃতি, মন্তব্য, প্রথা, বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত ও লিখিত আইনে রূপ লাভ করেছে। তবে জীবন, সমাজ ও প্রকৃতির পরিবর্তনশীল বস্তুগত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঋষি, মুনি ও পণ্ডিতের লিখনীতে ঐশী বাণীর ব্যাখ্যায়ও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

হিন্দু আইনের ক্রমবিকাশ শুরু হয় বৃটিশ ভারত আমল থেকে। হিন্দু আইনের ক্রমবিকাশ পর্যালোচনায় দেখা যায় যে ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রথম দিকে হিন্দু আইনের তেমন কোন পরিবর্তন সাধন হয়নি। কারণ শাসকগণ তাদের রাজ্য শাসনের সুবিধার্থে সর্বসাধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট দেওয়ানী, ফৌজদারী ও বাণিজ্য বিষয়ক আইন তৈরী করতেই আগ্রহী ছিল। পরবর্তীতে রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত মনীষীদের উদ্যোগে সতীদাহ এবং বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধকরণের মত কিছু যুগান্তকারী আইন প্রণীত হয়।
এই উপমহাদেশে ধর্মীয় এবং আইনের জটিলতার কারণে অনেকে হিন্দু আইনকে বিধিবদ্ধ আকারে প্রণীত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছিলেন। তবে যুক্তি অপেক্ষা ভাবাবেগই এই বিরোধিতার অনুকূলে বেশী কাজ করেছে। পরবর্তীতে আইন পেশা ও ব্যবসায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের প্রচেষ্টা ও কতিপয় বাস্তববাদী ব্যক্তির বলিষ্ঠ সুপারিশক্রমে ১৯৪১ সালে হিন্দু আইনকে বিধিবদ্ধ করার লক্ষ্যে হিন্দু আইনের বিভিন্ন সমস্যা ও জটিলতা অনুসন্ধান পূর্বক রিপোর্ট প্রদানের জন্য স্যার বেনেগাল নার্সিং রাও এর সভাপতিত্বে হিন্দু আইন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন মতবাদের হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত হিন্দু আইনের প্রগতিশীল উপাদান ও একই বিষয়ে বিভিন্ন আদালতের পরস্পর বিরোধী রায়সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে হিন্দু আইনের একটি অভিন্ন কোডের খসড়া তৈরী করে বিল আকারে উপস্থাপন করা।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কারণে ঐ সকল আইন বাংলাদেশে প্রযোজ্য হয়নি। ভারতে হিন্দু আইনের আমূল সংস্কার হলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং পরবর্তীতে বর্তমান বাংলাদেশে হিন্দু পারিবারিক আইনে সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। এর পিছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে আরও কিছু রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। এ বিষয়ে হিন্দু আইনের সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা শীর্ষক অধ্যায়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে বৃটিশ ভারতের পর বাংলাদেশে হিন্দু আইনের ক্রমবিকাশের পথ অবরুদ্ধ হয়ে আছে। বৃটিশ আমলে যেসব রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা হিন্দু আইনের বেশ কিছু প্রচলিত প্রথার সংস্কার করা হয়েছিল তার মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য।

প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা মা-বাবা ও স্বামীর সম্পত্তির অংশ পান না এবং তাঁরা যদি কিছু অংশ পানও, তা কোনোভাবেই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সমান নয়। এ অবস্থায় সম্পত্তিতে হিন্দু নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতে হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আইন কমিশন হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ করে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে হিন্দু পারিবারিক আইন বলতে বিবাহ, ভরণপোষণ ও বৈবাহিক সম্পর্ক ও অন্যান্য বিষয়, উত্তরাধিকার, দান, উইল, দত্তক, নাবালকের তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুসৃত ধর্মীয় আইন বুঝায়। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু আইন আইনসভা কর্তৃক একাধিকবার পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। ঐ সকল রাষ্ট্রীয় আইনও এখন হিন্দু আইনের অংশ।

পরিবর্তনশীল সমাজের প্রয়োজনে এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের সর্বজনীন ধারণাকে সামনে রেখে অন্যান্য আইনের মত পারিবারিক আইনেরও সংস্কার করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আইন কমিশনের ২০১০-২০১১ সনের দ্বি-বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় পারিবারিক আইনের পর্যালোচনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরই অংশ হিসেবে হিন্দু পারিবারিক আইনের গবেষণা কাজ আরম্ভ হয়। এই গবেষণা প্রতিবেদনে হিন্দু পারিবারিক আইনের বর্তমান অবস্থা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিবন্ধকতা ও সংস্কারের পক্ষের এবং বিপক্ষের ব্যক্তিগণের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি হিন্দু অধ্যুষিত ভারতের আইনী সংস্কার পর্যালোচনা করা হয়েছে।

হিন্দু নারীদের বৈষম্যমূলক অবস্থা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহবান জানান। এরই ধারাবাহিকতায় ‘হিন্দু আইন প্রণয়নে নাগরিক উদ্যোগ’ নামক কোয়ালিশন একটি খসড়া হিন্দু উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন করে। সাতটি বিভাগীয় শহরে হিন্দু আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধি ও সনাতন ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাঁদের মতামত খসড়া আইনে যুক্ত করা হয়। এতে উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষ ও হিজড়াদের (তৃতীয় লিঙ্গ) সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অবশ্য কারো নিজের অর্জিত সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে তার সম্পত্তি হবে এবং কোন কোন ব্যক্তি সম্পত্তির উত্তরাধিকারের যোগ্য হবেন না, সে বিষয়টিও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, কারো ছেলেসন্তান থাকলে মেয়ে সন্তানরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পায় না। তবে ছেলে না থাকলে ছেলে রয়েছে এমন মেয়েরা মৃত মা-বাবার সম্পত্তির অংশ পাবেন। যদিও নারীর অর্জিত সম্পত্তির অংশ তার পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ঠিকই পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সংবিধানের (১৯৭২) ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ ১৯৭৯-এ বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে স্বাক্ষর করে, যেখানে নারীর অধিকার, ভোগ ও চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে। অথচ সম্পত্তিতে সমান অধিকার না থাকার কারণে হিন্দু নারীরা বিভিন্নভাবে বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার দিলে জোরপূর্বক ধর্মান্তর বেড়ে যাবে, ধারণাটি ঠিক নয়। বাংলাদেশ লজ রিভিশন অ্যান্ড ডিক্লারেশন অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এ ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনটি বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেনি। কাজেই বর্তমানে যে আইন আছে, তাতে ধর্মান্তরিত হলে হিন্দু নারী-পরুষ এমনিতেই সম্পত্তির অধিকার হারাবেন। হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই আইন প্রণয়নে কোনো বাধা নেই। তবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সরকারের পক্ষে এই আইন প্রণয়নও সম্ভব নয়। এর জন্য হিন্দু সমাজ থেকে দাবির বিষয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। বেদ যুগে নারীর অবস্থান সমমর্যাদায় স্থান পেয়েছিল। এখনো পাওয়া উচিত। হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকারে সনাতনপন্থীরা বাধা দেন। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সনাতনপন্থীরাই এই ধর্মের মূল চালিকাশক্তি। ধর্মান্তরিত হলে নারী সম্পত্তি পাবে কি পাবে না, এটি সমাধান হওয়া উচিত।

হিন্দু নারীর অধিকার রক্ষায় সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। এখন আর পেছন ফিরে তাকানোর সময় নেই। এ দেশে মানবাধিকার, সংবিধানের কথা বলা হয়। তাহলে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। নারীর অধিকার না দিলে সম-অধিকার, সমমর্যাদা থাকে না। হিন্দু ধর্ম যুগের সঙ্গে চলমান ধর্ম। ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে ভয় আছে আছে। কিন্তু তার বিধান রয়েছে। তাই এই আইন দ্রæত সংসদে পাশ হওয়া উচিত। তবে আইনের বিষয়গুলো সবাইকে জানতে হবে এবং এই আইন নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ধর্মান্তরিত হলে হিন্দু নারী-পুরুষ উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকার হারাবেন এই বিধান রেখেই আইন পাশ করতে হবে। আইনজ্ঞদের পরামর্শে সেই আইনেই ধর্মান্তরিত হলে সম্পদ হারাবে, এ রকম নিয়ম রাখা যেতে পারে তাহলে সাধারণ যে ভীতি আছে তা দূর হবে।

উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে বাংলাদেশে হিন্দু নারী কিছুই পান না। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আইন করে হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে সমানাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এই আইন হওয়া উচিত, যাতে হিন্দু নারীরা আর বঞ্চিত না হন। বাংলাদেশে হিন্দু পরিবারে একই ঔরসজাত সন্তান ছেলেরা সম্পদ পান, অথচ মেয়েরা পান না। মেয়েরা পৈতৃক ও স্বামীর সম্পত্তি পান না। এটির আশু সমাধান হওয়া উচিত। সম্পদে হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক, অনেকে অবশ্য এই অধিকার দেওয়ার বিষয়ে চুপ থাকেন। এটাকে মানসিকভাবে সমর্থন করতে চান না তাঁরা। গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশে এই আইনটি দ্রæত পাশ করা দরকার।

রাষ্ট্র ও সংবিধান এই অধিকার নারীদের দিয়েছে। নারী জন্মানোর পর তাকে একটু একটু করে বোঝানো হয় তার অধিকার ভাইয়ের চেয়ে কম। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও বাংলাদেশের সব নারী তার অধিকার কেন পাবেন না। এখন একটা জনমত তৈরি হয়েছে হিন্দু সম্পত্তি আইনের সুষ্ঠু বণ্টনের বিষয়ে। সম্পত্তিতে সমান অধিকার— এটা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে হিন্দু নারীর ডিভোর্স দেওয়ার অধিকার নেই, পুনর্বিবাহের সুযোগ, সন্তান দত্তক নেওয়ার সুযোগ নেই। এসবে বৈষম্য আছে। উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে শুধু হিন্দু নারী নয়, দেশের সব নারীর ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার জন্য ইউনিফর্ম সিভিল আইন প্রয়োজন। সম-অধিকারের নীতি মানবাধিকারের নীতি, নারীর অধিকারের নীতি, সংবিধানেও তা আছে। সর্বত্রই নারীর সম-অধিকারের কথা আছে। তাই হিন্দু নারীর জন্য উত্তরাধিকারে সমানাধিকার দিয়ে আইনটি পাশ করতে হবে।

বিবাহ নিবন্ধন আধুনিক বিশ্বে বিবাহের দালিলিক প্রমাণ রক্ষার্থে বিবাহ রেজিস্ট্র্রেশন বা নিবন্ধন করার জন্য রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধনের জন্য এখন পর্যন্ত কোন আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ সংক্রান্ত একটি বিল বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে এর প্রয়োগ আবশ্যিক না করে স্বেচ্ছামূলক করা হয়েছে। এটি আবশ্যিক করা প্রয়োজন। বিবাহ নিবন্ধন কোনভাবেই হিন্দু বিবাহের ধর্মীয় চরিত্র খর্ব করে না। প্রথাগত যে নিয়মেই বিবাহ সম্পন্ন হোক না কেন, সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিবন্ধনের নিয়ম বেঁধে দিলে এবং নিবন্ধন না করার কারণে কোন বিবাহ অবৈধ বলে গণ্য হবে না এই শর্ত সংযোজন করে দিলে তা বিবাহ সম্পর্কিত প্রচলিত হিন্দু আইনের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। নিবন্ধনের বিপক্ষের যুক্তি হচ্ছে হিন্দু বিবাহ ধর্ম পালনের অংশ এবং এটি কোন চুক্তি নয় বিধায় নিবন্ধন অপ্রয়োজনীয়। তাছাড়া নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হলে আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ অশাস্ত্রীয় বিবাহের দিক ঝুঁকে পড়বেন। প্রকৃতপক্ষে নিবন্ধন দ্বারা শাস্ত্রমতে বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না। তাছাড়া রেজিস্ট্রেশনের উপকারিতা বহুমুখী।

নিবন্ধন থাকার কারণে আদালতে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে বিবাহ প্রমাণ করা সহজ হবে। বিদেশ যাত্রা এবং বহুবিবাহ নিরোধের ক্ষেত্রে বিবাহ নিবন্ধনের ভ‚মিকা অনস্বীকার্য। নিবন্ধন বা বিবাহের দালিলিক প্রমাণ না থাকায় হিন্দু পরুষরা বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে একাধিক বিবাহ করছে এবং বিবাহ অস্বীকারও করছে। তাছাড়া একই দেশে মুসলিম ও খ্রিস্টান আইনের অধীনে বিবাহ নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকলেও হিন্দু পুরুষ ও নারীগণ এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যা হিন্দু জনগোষ্ঠির মধ্যে অসন্তোষ তৈরী করছে। এমনকি হিন্দু আইনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কার বিমুখ হিন্দু সংগঠনের প্রতিনিধিগণও নিবন্ধনের পক্ষে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধির কাছে আইন প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করেন।

হিন্দু আইন সংস্কারের বিষয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরী হয়েছে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু দায়ভাগ আইন অনুযায়ী স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৫ জন নারী উত্তরাধিকারী হচ্ছে বিধবা, কন্যা, মাতা, পিতার মাতা, পিতার পিতার মাতা। নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে তারা সম্পত্তি ভোগের অধিকার পায়। এরূপ সম্পত্তির অধিকার হিসেবে পরিচিত যদিও বিধবা ছাড়াও অন্যান্যরা এই অধিকার পেতে পারে।
নারীদের ধর্মান্তরিত হবার আশংকার ক্ষেত্রে এটি বলা যায় যে, দি কাস্ট ডিজিবিলিটিজ রিমুভাল এক্ট ১৮৫০ যা প্রকারান্তরে দি ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন এক্ট নামে পরিচিত তা বাংলাদেশে প্রযোজ্য নয়। কেননা এই আইনটি দি বাংলাদেশ লজ ১৯৭৩ দ্বারা বাতিল করা হয়েছে। এই আইনটি না থাকার কারণে কেউ ধর্মান্তরিত হলে হিন্দু ধর্মের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী সে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। সুতরাং, সম্পত্তির লোভে অন্য ধর্মের লোক হিন্দু নারীদের ধর্মান্তরিত করতে প্রলোভিত করবে এ আশংকা ভিত্তিহীন।

২০০০ সনে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন প্রণয়ন এবং ২০১১ সনে তা সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও এখনও হিন্দু জনগোষ্ঠির মধ্যে এই আশংকা রয়ে গেছে যে তালিকা তৈরীর মাধ্যমে হিন্দু সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে নতুন করে তালিকাভুক্ত হবার সুযোগ তৈরী হতে পারে, যদিও সংশোধিত আইনটি অনেকটাই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি হিন্দু সংগঠন ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন এই বলে যে হিন্দু নারীগণ এই সংস্কার চান না এবং এটি এনজিওদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত। কেউ কেউ মনে করেন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পারিবারিক আইনের সংস্কার সাধন করা ঠিক না। প্রথমেই বলা যায় যাঁরা বিরোধিতা করছেন তাঁরা বিভিন্ন ফোরামে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ বেশি। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষ সংস্কারের পক্ষে থাকলেও (আইন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের গবেষণা, বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার গবেষণা, বিভিন্ন সেমিনার, এফ জি ডি থেকে প্রাপ্ত তথ্য) তাঁরা তাঁদের মতামতকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারছেন না। বিশেষ করে নির্যাতনের শিকার বা সহায় সম্বলহীন নারীরা তাদের বক্তব্য জন প্রতিনিধিগণের নিকট তুলে ধরতে প্রায়ই সক্ষম হন না। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংক্রান্ত যে আশংকার কথা বলা হয়েছে এ সম্বন্ধে এখনই মন্তব্য করা যাবে না। কেননা এই আইনে তালিকা থেকে অবমুক্তির সুযোগ রয়েছে যা প্রকৃত মালিকগণ গ্রহণ করতে পারবেন।

শতকরা কতভাগ হিন্দু এই আইনের সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বা কেন বঞ্চিত হয়েছেন এই তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আইনটি কতখানি কার্যকর হয়েছে তা নিরূপণ করা সম্ভব হতে পারে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা না দেয়া পর্যন্ত পারিবারিক আইন সংশোধন সম্ভব নয় এই যুক্তির ভিত্তিও দুর্বল। কথিত নিরাপত্তা না দেয়া পর্যন্ত পারিবারিক আইনের কোন বিধান দ্বারা যদি মানবাধিকার লংঘিত হয় তবে তা চলতেই থাকবে এটি যুক্তিসংগত কথা নয়। বরং বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দু আইন অপরিবর্তনশীল এই যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা হিন্দু আইনের উৎস ও ক্রমাবিকাশের যাত্রায় আমরা দেখেছি কীভাবে কিছু হিন্দু আইন যুগের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারাও এর সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে।

বৈদিক যুগের দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দু আইনের মূল ধারা তুলে ধরা হয়েছে যা বাস্তবিকই প্রগতিশীল ও আধুনিক। সুতরাং হিন্দু আইনের সংস্কারের বিরূদ্ধ যুক্তি ভিত্তিগতভাবে দুর্বল। এ প্রসঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনা করা যেতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে হিন্দু আইনের ব্যাপক সংস্কার ঘটেছে। প্রশ্ন হতে পারে পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ নেয়ার যৌক্তিকতা আছে কি? বৃটিশ আমলে বাংলাদেশ ও ভারত একই আইনের আওতাভুক্ত ছিল। আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অনেক কিছুতেই দু’টি রাষ্ট্রের মিল আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ভারত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। প্রাচীন আমলের প্রথাগত আইন এই অঞ্চলেও প্রয়োগ করা হত। ১৯৪৭ সালের পর ভারতে হিন্দু আইনের যে ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয় তার আলোকে সাধারণ জনগণের মধ্য থেকেই এ দেশের প্রথাগত আইন সংস্কারের দাবি উঠেছে ।

এ কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের হিন্দু আইনের বিকাশের পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। ভারতে হিন্দু আইনের পরিপূর্ণ সংস্কার আসে ভারত স্বাধীনের পর। ১৯৫১ সনে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হবার পর হিন্দু আইনের সংস্কার নিয়ে হিন্দু কোড বিল ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়। নতুন আইনের দ্বারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচলিত বিভিন্ন মতবাদের প্রগতিশীল নীতিসমূহের সমন্বয় সাধন এবং বিভিন্ন আদালতের পরস্পর বিরোধী নিষেধাজ্ঞাদের মধ্যে অবস্থিত পার্থক্য দূর করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ভারতে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো পাশ হয় করা হয়। বাংলাদেশের ঠিক তেমনটাই করা উচিত যা এখন সময়ের দাবি। কারণ বাংলাদেশকেও সময়ে সাথেই তাল মিলিয়ে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠাকরতে হবে এবং হিন্দু নারীর সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এটি এখন সময়ের দাবি

লেখক: রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here