ব্রেকিং নিউজ

‘বর্গামাটি’ এলিজা খাতুনের গল্পের বই: উনুনের পাশে জীবনের ভাগ

সৈয়দ নূরুল আলম :: ‘বর্গামাটি’ এলিজা খাতুনের গল্পের বই। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন-‘শোষণ ও বৈষম্য মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় যাঁরা লড়াই করেন, তাঁদের সাহসের প্রতি।’ এ উৎসর্গপত্র একটু ভিন্নতর। এখানে কি লেখকের চেতনাবোধের কোনো ইঙ্গিত বহন করে। বা লেখার ভেতরে ঢুকতে পাঠককে তাড়না দেয়? তা হলে গ্রন্থের ভেতরে ঢুকে দেখা যাক।

তিনটি দীর্ঘ গল্প। চকমকি পাথর, গন্ধশিশি ও বর্গামাটি। ‘চকমকি পাথর’ গল্পের মূল চরিত্রে রয়েছে রেনুকা। এক এনজিও কর্মী। যার ১১ বছরের প্রতিবন্ধী একটি মেয়ে আছে। নাম অরণী। লেখক এভাবে বর্ণনা করেছেন-‘অরণী মানে চকমকি পাথর। কিন্তু ওর জীর্ণ-শীর্ণ অপরিণত দেহ, বিষণ্ন চাহনি, মলিন মুখখানা দেখে কে বলবে এ কথা? তাতে কিছু যায় আসে না। রেনুকার সন্তান সে যেমনই হোক, মায়ের কাছে সন্তানের স্বাদ একই রকম।’ এখানে লেখক সার্বজনীন মাতৃত্বের গৌরব, স্বগৌরবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু লেখক আলোচিত গল্পে হতাশার বিপরীতে অরণীর মধ্যে আলোর আভা দেখাবার চেষ্টা করেছেন। যখন রেণুকা অরণীর সেলাই করা কাঁথার একলক্ষ টাকার অগ্রীম অর্ডারে সই করে, তখন মেয়েকে আর তার কাছে বোঝা মনে হয় না।

আবার একই সময়ে দেখা যায়, স্বামী মোজাম্মেল কর্তৃক প্রেরিত ডিভোর্স পেপারে রেনুকা সই করে। লেখক এখানে জীবনের আলো-আঁধারের সমান্তরাল পথের চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। তাই তো এলিজা খাতুন গল্পটা এভাবে শেষ করেন-‘অরণীর চোখ ঠিকরে সুদূর সম্ভাবনার আলোকরশ্মি যেন চকচক করে বের হয়ে আসছে। রেনুকা গভীর মমতায় স্পর্শ করছে যেন এক জীবন্ত চকমকি পাথর।’ দারুণ সমাপন।

দ্বিতীয় গল্প- ‘গন্ধশিশি’। গ্রামের মাতব্বর ধরনের নেহাল কাজী, সোবহান কাজী, কুদ্দুস মিয়া, কপালি, কুমকুম এ ধরনের কিছু চরিত্র নিয়ে ‘গন্ধশিশি’ গল্পটি। সব বাবা-মা সন্তানের জন্য অকৃপণ ভালোবাসা জিয়ে রাখেন, যা লেখক একটি বাক্যে তুলে ধরেছেন-‘কুমকুমের জন্যি ভালো মন্দ কিছু বাজার করে দিও, ক’দিন জ্বরে পড়ে থেইকে কিছু গিলতে পারেনি।’

কুদ্দুস মিয়া টিউবয়েলে কুলকুচি করতে করতে জবাব দিয়েছিল, ‘ফিরতি রাত হবে, আজক্যার মতো ব্যবস্থা করে নিস, কাইল দেখা যাবে।’ এখানে মমতা মাখা কথনের সাথে আঞ্চলিক শব্দ প্রয়োগ বিষয়টা আরো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। পুরো গ্রন্থে প্রচুর আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার অবশ্যই গল্পকে মজবুত করে, তবে একই গল্পে ভিন্ন অঞ্চলের ভাষার মিশ্রণ না হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে লেখার সময় সতর্ক থাকতে হয়। সে সতর্কতা এলিজা খাতুনের গল্পে লক্ষণীয়। আর এ বিষয়টি লক্ষ রেখে গ্রনে’র শেষে আঞ্চলিক শব্দের প্রমিত অর্থ দেয়া হয়েছে। যা পাঠান্তে বুঝতে সহায়ক হবে।

সমাজে এখনো পরকীয়া প্রেমের বুদবুদ আছে, যা গল্পে একটু উঁকি দিয়েছে- কপালির স্বামী কুদ্দুস মিয়া ও নেহাল কাজীর বাড়ির কাজের মেয়ে আম্বিয়ার মধ্যে। অবশেষে মনিব নেহাল কাজী নিজেই দ্বিতীয় বিয়ে করে আম্বিয়াকে ঘরে তোলে। গল্পকার এ গল্পে নিম্নবৃত্ত সমাজে চাওয়া-পাওয়ার, ভাঙা-গড়ার ছবি তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থে শিরোনামের গল্প- ‘বর্গামাটি’। গ্রাম যাদের শেকড়। তারা হয়তো জানেন, যে সব কৃষকের নিজের জমি নেই, তারা অন্যের জমি বর্গা চাষ করে, একটা নির্দিষ্ট ভাগের ভাগ ফসল তারা এ চাষের বিনিময়ে পেয়ে থাকেন। এমন একটি প্রেক্ষাপট নিয়ে এলিজা খাতুন লিখেছেন তার ‘বর্গামাটি’ গল্প। তবে গল্পের শেষে আমাদের ক্ষয়িষ্মু সমাজের একটি করুণ চিত্র টেনে এনেছে। রইসউদ্দিনের নাবালক মেয়ে মাটি যার নাম, সে বাবার পাওনা টাকা চাইতে যেয়ে গ্রাম্য বৃত্তশালী জমির মিয়ার কুদৃষ্টিতে পড়ে এবং বর্গা হিস্যায় পতিত হয়। এটাই গল্পের মূল উপজীব্য।

এলিজা খাতুন তার গল্পে উপমা এনেছেন আনকোড়া ভাবে। যেমন-‘যার চাল চুলের অবস্থা চৈত্রের জল শূন্য নদীর মতো। তার ছকে আর কোন গেরস্থ পা বাঁধবে? তবু ধিকি ধিকি আশার আলো বুকে বেঁধে হেঁটে চলেছে।’

এছাড়া তাঁর লেখায় প্রকৃতি উন্মোচিত হয়েছে অকৃপণভাবে। পাঠকের দৃষ্টি নতুনভাবে টেনেছে, কাছের- পরিচিত ভূমণ্ডল, মাটি-মানুষ ও জলবায়ু। এলিজা খাতুন তাঁর তৃতীয় চোখ দিয়ে প্রকৃতিকে দেখেছেন গভীর মমতায়, গভীর ভালোবাসায়।

বিজ্ঞানের ছাত্র যেমন ল্যাবে বসে ব্যাঙ ব্যবচ্ছেদ করে, তেমনি লেখক তার গদ্যকে ভেঙেছেন, ব্যবচ্ছেদ করেছেন, নিরীক্ষা করেছেন জ্ঞান ও মননের শাণিত অস্ত্র দিয়ে, এতে করে এলিজা খাতুনের লেখা আর দশটা লেখা থেকে ভিন্নতর।

গদ্য হলেও প্রতিটি লেখায় কবিতার মতো একটা মিষ্টি মধুর ছন্দ আছে, সুর আছে যা পাঠককে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করে রাখে।
বইটি প্রকাশ করেছে সাঁকোবাড়ি প্রকাশন। প্রচ্ছদ করেছেন শাহরিয়ার বাসার। ৬২ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ১৫০ টাকা।
ধন্যবাদ লেখককে। ধন্যবাদ প্রকাশককে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জয়ন্ত বাগচী’র বিজয় দিবসের বিশেষ কবিতা ‘জড়ায় আঁচলে বার বার’

জড়ায় আঁচলে বার বার –জয়ন্ত বাগচী  কেন  প্রশ্নেরা বার  বার   প্রশ্নের মুখে  ...