ফেলে আসা দিনগুলো

মুশফিকা ইকফাত নাবিলা

.
মুশফিকা ইকফাত নাবিলা :: মাগুরা সদরে পরিবারের সাথে আমার বসবাস। ওখানেই আমার বেড়ে ওঠা। ওখান থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেড়িয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্য ঢাকায় পাড়ি জমানো। ঢাকায় গিয়ে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেয়ার জন্য ভর্তি হলাম দেশের নামকরা একটি কোচিং সেন্টারে। শুরু হলো ভর্তির প্রস্তুতি নেয়া। থাকা হতো মেসে।  মেসে আমার রুমমেট ছিলেন এক আপু। তিনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে পড়ছেন।  শুরু হলো পড়াশোনার চাপ। শুধু পড়া আর পড়া। ছোটবেলা থেকেই আমি  পড়াশোনায় মোটামুটি ভালোই ছিলাম।  তাই আশাও ছিল বড়। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার। এজন্য ভর্তির ফরম পূরণ করেছিলাম শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই। যাইহোক দীর্ঘদিন পড়াশোনা চলতে থাকলো।  তবে এর আগে কখনও আমি পরিবার ছেড়ে একা এতো দিন থাকিনি। পড়ালেখা পুরোদমে এগিয়ে চলল। এবার আসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার দিন।  পরীক্ষা দিলাম। দুর্ভাগ্যবশত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলাম না!  ভাবলাম সবকিছু শেষ!  আমাকে দিয়ে আর কিছুই হবে না!  তাই অন্য কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আর চেষ্টা করলাম না!
.
এর কিছু দিন পর রুমমেট আপু পরামর্শ দিলেন, তুমি কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হয়ে যাও। আমার বাবার ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আগে থেকেই পরিচিত ছিল।  তাই বাবা দেরি না করে এক দিন গিয়ে আমাকে ডিআইইউতে ভর্তি করে আসলেন।  সত্যিকার অর্থে ক্যাম্পাসে আমার কোন পরিচিত মুখ ছিল না!  সবাই আমার অচেনা!  বন্ধু বান্ধব সবাই ভালো ভালো জায়গায় ভর্তি হয়েছে।  আর আমি কোথাও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলাম না।  অনেক মন খারাপ। অনেক হতাশ হলাম। তবে এটা বুঝতে পারলাম ব্যর্থ হওয়া মানে জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়!
.
গত বছরের শেষের দিকে শুরু হলো ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আমার পথ চলা। আমাদের নবীনবরণ হলো। এর কিছু দিন পর ক্লাস শুরু হলো।  কেউ আমার পরিচিত ছিল না। আমি ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসতাম।  স্যার- ম্যামদের কথা শুনতাম। দরকার ছাড়া অন্য কারও সাথে তেমন কথা বলতাম না। মানুষের সাথে যেচে কথা বলার অভ্যাস আমার নেই। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সৌজন্য হিসেবে সেটুকুর উত্তর দিতাম। এমনকি অনেক দিন ক্লাস হওয়ার পরও অনেক ক্লাসমেটকে আমি চিনতাম না। ওরা আমাকে খেয়াল করলেও আমি ওদের খেয়াল করতাম না। আরও কিছু দিন ক্লাস হলো। একদিন ক্লাস শেষ করে ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবাসে বাসায় ফিরছিলাম।  আমার পাশের সীটে বসা ছিল মীম। আমার ক্লাসমেট যদিও তখন পর্যন্ত আমি তাকে চিনতাম না। ও আমার সাথে পরিচিত হলো।  আমিও ওর সাথে পরিচিত হলাম।  ও আমার ফোন নাম্বার নিল। আমিও ফোন নাম্বার রাখলাম।
.
পরের দিন মীম আমাকে ফোন দিয়ে বলল, তৈরি হয়ে নাও। এক সাথে ইউনিভার্সিটিতে যাব। আমি বললাম আমি তৈরি।  বের হয়ে আসলাম।  নতুন বাজার এসে দুজনের দেখা হলো। মীম ওর নিজের গাছের দুটো টগবগে গোলাপ আমার জন্য নিয়ে আসে।  এটাতে আমি ভীষণ বিস্মিত হই। ভাবি ও আমার কথা ভাবছে। ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব হবে। এরপর মীমের মাধ্যমে পরিচয় হয় লিজা, তানিয়াসহ বেশ কয়েকজনের সাথে।  বন্ধুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। আমরা ছয় সাত জন মিলে মেসেঞ্জারে একটা গ্রুপ খুলি। ওখানেই আমাদের সব কথা হয়। আমরা ছয় সাত জন একসাথেই সবজায়গায় যেতাম। উপভোগ করতাম পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলোর ঝিলিমিলি।  গোধূলির অপরূপ সৌন্দর্য। প্রান শীত করা মৃদু বাতাস। সে দৃশ্য আজও ভোলার নয়!
.
আমাদের ক্লাস চলছে।  কিছু দিন পর ইউনিভার্সিটিতে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। যদিও সেদিন ক্যাম্পাসে যাওয়ার আমার কোন ইচ্ছে ছিল না।  বাবা আর বান্ধবীদের অনুরোধে না করতে পারলাম না।  আমি ইউনিভার্সিটিতে পৌছালাম।  গিয়ে দেখি পরিচিত কেউ নেই।  আমি বান্ধবীদের অপেক্ষা করতে থাকলাম।  ওদের আসতে দেরি দেখে আমি দোতলায় গিয়ে একটি রুমের জানালা খুলে দিয়ে বিকেলের মৃদু শীতল বাতাস উপভোগ করতে লাগলাম। রুমটায় আমি একাই ছিলাম। আমি একটি চেয়ারে আমার  পার্স রেখে জানালার পাশে দাড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম । কিছুক্ষন পরে একটি ছেলে রুমে মধ্যে এসে হাটাহাটি করতে করতে আমার পার্স রাখা চেয়ারের পাশের চেয়ার খালি ছিল। ওটাতে বসার অনুমতি চাইলো আমার কাছে।  আমি বললাম আপনি বসতে পারেন। এরমধ্যে আমার বান্ধবী চলে আসে।  রুমের মধ্যে আমাকে ও ঐ ছেলেটাকে দেখে  যে কেবল আসলো, যাকে আমি চিনি না,  আমার বান্ধবী ভাবলো ঐ ছেলেটা আমার বয়ফ্রেন্ড!  আমি ওকে বললাম ছেলেটাকে আমি চিনিও না। এই মাত্রই এসেছে, তাও আমার বান্ধবী আমাকে নিয়ে একটু আধটু হাসি তামাশা করে!  পরে ওরা বুঝতে পারে আমি আসলেই ছেলেটাকে চিনি না।
.
সম্মেলনের দিন বিকেল বেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল।  কনফারেন্সের পর বিরতি চলছে।  আমি ও আমার বান্ধবীরা ইউনিভার্সিটির ছাদে গিয়ে বিরতির সময়টা উপভোগ করতেছিলাম। গোধূলির অপরূপ সৌন্দর্য সবাইকে বিমোহিত করে!  আমরাও মুগ্ধ হয়ে গোধূলির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।  বান্ধবীরা সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিল। আমি পাশে দাড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।
.
কিছুক্ষন পরে একটি ছেলে এসে বলে, অন্য একটি ছেলে আমার সাথে ছবি তুলতে চায়। সে বিভিন্ন অনুনয় বিনয় করে।  কিন্তু আমি বলি আমি  এমনিতেই ছবি তোলা পছন্দ করি না।  তার উপর অপরিচিত মানুষের সাথে তো কখনও নয়! ছেলেটি চলে যায়।  কিছুক্ষন বাদেই আসে ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে একটা ছেলে।  ছেলেটি আমার সাথে কথা বলবে ও আমার ছবি তুলবে। কিন্তু আমি তাকে ছবি তুলতে দেইনি। সে ভেবেছিল আমি হয়তো ডিএসএলআর ক্যামেরা দেখে গলে গিয়ে বলবো ভাইয়া একটা ছবি তুলে দিন! যদিও মেয়েদের ডিএসএলআর ক্যামেরার প্রতি দুর্বলতা আছে!  তবে আমার ছিল না। কারণ আমি আগেই অনেক ভালো ডিএসএলআর ক্যামেরা ব্যবহার করেছি।  পরে সে আমার ফেইসবুক আইডি চায়।  আমি বলি আমি ফেইসবুক চালাই না। একটা অপরিচিত মেয়েকে প্রথম দেখেই ফেইসবুক আইডি চাওয়া!
.
এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলে আমি বান্ধবীদেরসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাই। আমার বান্ধবীরা আমার বিভাগের অন্যান্যদের সাথে গিয়ে নাচানাচি, হৈ-হুল্লোড়ের শুরু করলো। আমার আবার হৈ-হুল্লোড় পছন্দ না।  তাই আমি একটু একা একা সময় কাটাতে সামনে হাটাহাটি করছিলাম।  “যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত পোহায়”৷ সেই একা একা উপভোগ করা বেশিক্ষন স্থায়ী হয় না! হঠাৎ সামনে পরে সেই ক্যামেরা হাতে ছেলেটা!  আমি একটু ভরকে যাই! সন্ধ্যার দিকে একা একা হাটতেছি। ছেলেটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিল আর আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেছিল।  ছেলেটা খাবারের প্লেট রাখতে গেলে আমি ওখান থেকে দ্রুত চলে আসি। যাইহোক এক ঝামেলা থেকে বাঁচতে আর এক ঝামেলার মুখে গিয়ে পড়া। হৈ-হুল্লোড় থেকে বাঁচতে সামনে হাটাহাটি করা, সেখানে আবার ঐ ক্যামেরা হাতে ছেলেটা!  যাইহোক ক্যাম্পাসের মধ্যে এসে বাবাকে ফোন দিলাম আমাকে নিতে আসতে।  রাত হয়ে গেছে আমার পক্ষ একা যাওয়া সম্ভব না।  বাবা আমাকে নিতে আসলেন। তার ইচ্ছে ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা। কিন্তু আমার জন্য তা আর হলো না! আমি বললাম তাড়াতাড়ি বাসায় যাব। বাসায় চলে আসলাম।
.
এরপর কিছু দিন পর আমাদের মিড টার্ম পরীক্ষা হলো। পরীক্ষা শেষ ছুটি নিয়ে বাড়ি থেকে ঘুরে আসার চিন্তা করলাম।  যেহেতু অনেক দিন বাড়ি যাওয়া হয়নি তাই কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি আসলাম।  এর কিছু দিন পরই শুরু হলো করোনা মহামারি। সব কিছু বন্ধ হয়ে গেল। চলছে করোনাকালীন ছুটি। কবে শেষ হবে এই করোনা তা কেউ জানে না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি অতি তাড়াতাড়ি যাতে পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নেয়। আশা রাখি সবার সাথে দেখা হবে সুস্থ পৃথিবীতে।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

পরীক্ষা নেয়ার অনুমতি পাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

ডেস্ক রিপোর্ট ::শর্তসাপেক্ষে বিশেষ বিবেচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাকটিক্যাল ক্লাস ও ...