ব্রেকিং নিউজ

প্রাথমিক শিক্ষাঃ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

পল্লব কুমার গোস্বামী :: দিন যায় কথা থাকে, থাকে না বেগ তবে বেড়ে যায় আবেগ। অতীতকে বিদায়  জানিয়ে নতুন কে বরন করে নিতে সবাই আনন্দ পায়, কিন্তু তাই বলে অতীতকে ভুলে গিয়ে দিন বদলের কথা বললে কি খুব যুক্তি সংগত হবে ? আমি এদেশের প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলছি। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরিক্ষায়  ছেলেদের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস অনেক দিন  থেকেই থাকলেও মেয়েদের ছিল মাধ্যমিক পাস। পরে মেয়েদের শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা হয় যা এখন পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে। আগামী শিক্ষক নিয়োগ মেয়েদেরও স্নাতক পাস ধরা হবে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এর মাঝে ৬০% মেয়ে, ১০% মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য, ১০% শিক্ষকদের পোষ্য, ১০% আনসার/ ভিডিপি/ উপজাতী, ১% প্রতিবন্ধী, আর অবশিষ্ঠ ৯% সাধারণ ছেলেদের। তাহলে এখানে সাধারণ ছেলেদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে চাকুরী পাবার সুযোগ কতটুকু ?

একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকাসত্বেও একজন জুনিয়র ড্রাইভারের সমান বেতন থাকেন। সহকারি শিক্ষকেরা আবার প্রধান শিক্ষকের ঠিক পরের ধাপের বেতন গ্রেডে পূর্বে থাকলেও এখন রয়েছে বেশ পিছনে। সহকারি শিক্ষকদের এই সল্প মূল্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষ পত্রিকার পাতায় বা টিভির পর্দায় বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে তা অন্তঃসার শুন্য অবস্থাই হয়েছে। কথার সাথে কাজের মিল খুজে পাওয়া আজ দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। বারবার প্রাথমিক শিক্ষকেরা তাদের আর্থিক ভাবে বৈষম্যের কথা ক্লাস বর্জনের মাধ্যমে, ঢাকায় শিক্ষক মহাসমাবেশের মাধ্যমে পত্রিকার মাধ্যমে, টিভিতে টক শো এর মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে বলেই চলেছেন। দাবী তাদের একটাই প্রধান শিক্ষক ১০ম গ্রেড এবং সহকারি শিক্ষক ১১তম গ্রেড। সরকারের সম্মানিত নিতি নির্ধারক হিসাবে যারা আছেন তাদের আন্তরিক ভাবে সুনজরে আনার জন্য  বিভিন্ন ভাবে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, মাঝে মাঝে এই সহজ সরল মানুষেরা বিভিন্ন মহলের আশ্বাস পেয়ে কর্মস্থলে ফিরেও এসেছেন । কিন্তু তারা কি পেলেন?

গত ০৭/১১/২০১৯ তারিখে অর্থমন্ত্রনালয় চিঠি করলেন প্রধান শিক্ষক (প্রশিক্ষন প্রাপ্ত /প্রশিক্ষন বিহিন) গ্রেড ১১ এবং সহকারি শিক্ষক (প্রশিক্ষন প্রাপ্ত /প্রশিক্ষন বিহিন) গ্রেড ১৩। এখানে প্রশিক্ষনের কোনো প্রকার গুরুত্বের কথা কেন ভাবা হলো না সেটাই এখন প্রশ্ন।  সে দিকে সচেতন মহলের কোনো সজাগ দৃষ্টি নেই বললেই চলে। বেতন গ্রেডের উন্নয়নে যে বেতন কমবে, তা কেউ কখনো স্বপ্নেও দেখেছে কিনা সঃন্দেহ। সহকারি শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নয়নের নামে বেতন যদি নিম্ন ধাপে নির্ধারন হয়, তাহলে সকল শিক্ষকদেরই বেতন কমবে। তাই বেতন গ্রেড ধাপে না মিললে উচ্চ ধাপে দেওয়া প্রয়োজন।

বেতন গ্রেডের বৈষম্যের ফাঁদঃ

সহকারি শিক্ষকদের(প্রস্তাবিত)

গ্রেড বেতন(টাকা) মন্তব্য
১৩ তম ১১,০০০ শুরু
১২ তম ১১,৩০০ ১০ বছর পূর্তিতে
১১ তম ১২,৫০০ ১৬ বছর পূর্তিতে

 

প্রধান শিক্ষকদের(প্রস্তাবিত)

গ্রেড বেতন(টাকা) মন্তব্য
১১ তম ১২,৫০০ শুরু
১০ তম ১৬,০০০ ১০ বছর পূর্তিতে
৯ তম ২২,০০০ ১৬ বছর পূর্তিতে

এই ভাবে যদি সহকারি শিক্ষকদের সাথে বিমাতা সুলোভ আচরন করা হয়, এই ভাবে বৈষম্য জিইয়ে রাখা হয়, তাহলে কিভাবে মেধাবীরা এই পেশায় আসার জন্য আগ্রহী হবে ? আর, যারা কর্মরত আছেন, তারাই বা কিভাবে তাদের পেশায় মননিবেশ করবেন ? প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ আট বছর, প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই আজ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা সময়ের দাবী হয়ে উঠেছে। একটু পরিসংখ্যান নিলেই দেখা যাবে, যে সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত  শিক্ষার্থীরা জ়ে এস সি পরিক্ষায় অংশ নিয়েছে, তারা সবাই পরিক্ষার ফলাফল যথেষ্ট পরিমানে ভাল করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরিক্ষায় ২০০৯ সাল থেকেই শিক্ষার্থীরা ভাল ফলাফল করেই আসছে। সহকারি শিক্ষকেরা এত শ্রম, এত চেষ্টা, এত মেধা দিয়ে জাতী গড়ার যে মহান ব্রত পালন করে চলেছেন, সেখানে তাদের এই ভাবে কেন বারবার অবমূল্যায়ন করা হয় ?  বিদ্যালয়ে পাঠদানের কাজ প্রকৃতপক্ষে সহকারি শিক্ষকেরাই করে থাকেন।

তারপরও তারাই প্রকৃত পক্ষে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আসছেন। তাদের দাবী একটাই প্রধান শিক্ষকের পরের গ্রেডেই বেতন নির্ধারণ। সহকারি প্রধান শিক্ষকের জন্য  ১২ তম বেতন গ্রেড না রেখে বরং সহকারি শিক্ষক থেকে পদন্নোতি পেয়ে তারা যখন সহকারি প্রধান শিক্ষক হবেন, তখন তাদের অতিরিক্ত  একটি/দুইটি ইনক্রিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে।  পূর্বে প্রধান শিক্ষকের ঠিক পরের গ্রেডেই সহকারি শিক্ষকের বেতন গ্রেড ছিল, কিন্তু বর্তমানে সহকারি শিক্ষকেরা বঞ্চিত হয়েই আসছেন। সচেতন সমাজ এখন এই বৈষম্যের প্রতিকারের অপেক্ষায় আছেন। বৃটিশ গিয়েছে, পাকিস্থান গিয়েছে, পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু পরিবর্তন হয়নি সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ এবং সহকারি শিক্ষকদের ভাগ্য।

১৮৩৪ সালের লর্ড মেকলের নিম্নগামী পরিস্রবন নীতি, ১৮৫৪ সালের ঊড এর ডেসপ্যাচ, ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯৪৩ সালের সার্জ়েন্ট কমিটি, ১৯৫২ সালের আকরাম খান কমিটি, ১৯৫৮ সালের শরীফ কমিশন, ১৯৭২ সালের কুদরত-ই-খুদা কমিশন এবং ১৯৯৭ সালের শামসুল হক কমিশন গঠিত হয়ে বিভিন্ন সুপারিশ প্রণয়ন করেছেন – যা কার্যকর এখন পর্যন্ত হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে , দক্ষ শিক্ষক সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং মেধাবীদের এই পেশার প্রতি আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ঠ সম্মানিত কর্তৃপক্ষরা আশ্বাস দিলেও তা খুব কম-ই বাস্তবায়ন হয়েছে। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের কাছে জনগনের প্রত্যাশা অনেক, প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির ব্যবধান থাকবে সেটাও স্বাভাবিক; কিন্তু তাই বলে প্রত্যাশা অনুসারে প্রাপ্তির অনেক ব্যবধান থাকবে সেটা একেবারেই বেমানান।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

অর্ণব আশিক’র কবিতা ‘ঝড়’

    ঝড় -অর্ণব আশি কিছু রোদ ছুঁয়ে যায় বৃষ্টির পর কিছু ...