প্রাণের মানুষের জন্মদিন

তানভীর তারেক :: জীবনে যতবার গভীর সংকটে পড়েছি। ততবার এই মানুষটা আমাকে টেনে তুলেছেন। খাইয়েছেন। নিজে বাসা ভাড়া করে আমাকে থাকতে দিয়েছেন।

একবার আমার কোনো চাকরী নেই। বেকার, সংসার ছাড়া, এর ভেতরে বাবাও মারা গেল ! জীবনে এর চেয়ে কঠিন সময় আপাতত আর আসেনি। নিজের জীবনের প্রতি বেঁচে থাকার আর কোনো হোপ দেখতে পারছিলাম না।

দাদা মিরপুরে তার অফিসে ডেকে আনলেন। আমার জন্য বাসা ঠিক করে দিলেন। বললেন মাকে নিয়ে আয়, এখানে থাকবি। মাথা ঠান্ডা রাখবি। তুই বড় ছেলে ! অনেক দায়িত্ব। কোনো সমস্যা হলে মিঠু [ দাদার সহকারী] কে বলবি।

তখন প্রায় দুপুরে হুট হাট করে দাদার অফিসে যেতাম সাহস কিনতে ।
আমাকে এটিএন এ নিয়ে গেলেন। মাহফুজ ভাইকে বললেন।

ওকে একটা প্রোগ্রাম দেন। ও উপস্থাপনা করবে ! ভালো ছেলে। আমি বলছি ও ভালো করবে।

অথচ ! আমি তখন উপস্থাপনার কিছুই জানিনা ।
আমি দাদাকে বললাম, এটা কী করলেন। আমি প্রোগ্রাম হোস্ট করবো? এ কীভাবে সম্ভব? এই কাজ তো আমি জীবনে করিনি।

– আরে রাখ ব্যাটা। তোর এখন চাকরী বাকরি নাই। আমি মান্থলি পেমেন্ট ঠিক করে দিয়েছি ওদেরকে। এটাকে চাকরী মনে করে শুরু কর। পারবি তুই । পারবি।

এই আমার উপস্থাপক জীবন শুরু। নয়তো ভুলেও আমার কোনোদিন উপস্থাপনায় আসার কোনো কারণ ছিল না।

দাদার কথায় আমি মাসে ৪ টা শো করতাম এটিএন বাংলায়। এবং একটা ভালো মানের সম্মানী পেতাম। প্রথম উপস্থাপক হিসেবে কেউ এমন সম্মানী পেয়েছেন বলে আমার জানা নাই।

তারচেয়েও বড় কথা.. সংসারে অভাবের টানাপোড়েন থেকে বাঁচার একটা সম্মানজনক উপায় পেলাম।
এরপর অনেক পথ অনেক কথা। দাদার সাথে আমার।

প্রথম জীবনে মাজদা ব্র্যান্ডের ছোট একটা গাড়ি কিনে দাদাকে পা ছুয়ে সালাম করে এসেছিলাম। বলেছি, ‘দাদা আমার তো বাবা নেই। তাই গাড়িটা নিয়ে সোজা আপনার কাছে চলে আসলাম।

দাদা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। ’
বললেন,‘চড়াবি একদিন !’

আজো কোথাও আটকে গেলে এখনও দাদাকেই বলি। মিডিয়ার প্রতি মেজাজ খারাপ হলে আমি একমাত্র এই মানুষটার সাথে সব শেয়ার করি। আমার যে কোনো বিষয়ে কেউ বিচার দিলে দাদাকে ফোন দেয়।
কারণ অনেকেই জানে আমি দাদা’র কথার নড়চড় হই না।

এই শহরে অনেকে আমাকে ভালোবাসে বলেই হয়তো ভালো আছি। কিন্তু দাদার ভালোবাসাটা ঋণের পর্যায়ে। যে ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করবো না। আমাকে আমার প্রিয় অপ্রিয় বেশ ক’জন বলেন, আরে তুই তো সংকেতদার লোক।’
আমি খুব দৃড়চিত্তে খুব খুশি মনে এই কথা স্বীকার করি।

এই মানুষটা এই শিল্পী সমাজে কত জনের জন্য যে কী কী করেছেন তার লিস্ট প্রকাশ করলে একটা মোটা বই হয়ে যাবে।

আমার এইসব বিষয়গুলো অপ্রকাশিত রাখার কমিটমেন্ট ছিল। রাখতে পারলাম না। এসব গোপন রাখতে চাই না আর। কারণ এত স্বার্থের হিসেব নিকেশ দেখি চারপাশে। কেউ ভালোবাসলেও পিছে কথা বলে। কারো খারাপ সময় এলেও বলে, ‘আরে আমি জানতাম তো এরকম ওর হবেই জীবনে। ’ তিনি আমার আমাদের নির্মোহ এক আদর্শের নাম।

এবার আরো একটা গোপন কথা বলে ফেলি । যদিও এর আগে বলেছি একদিন। এই গোপনটা খুব তুচ্ছ গোপন । তা হলো

আমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে হানিফ সংকেত দাদার বোনের বিয়ে হয়েছে। এই বিখ্যাত সম্পর্কের কথা আমার জানা ছিল না অনেকদিন। কারণ সেটি আমার দাদা বাড়ির দিককার সম্পর্ক। আমার শৈশব কেটেছে নানা বাড়িতে। তাই আমার আপন চাচাকেও দেখেছি অনেক পরে।

আমি ক্লাস এইটে থাকতে যখন নানা বাড়ি ঈশ্বরদী থেকে দাদাবাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার নিবাসী হলাম। তখন জানলাম আমার মজিদ সিকদার চাচার বড় ছেলের সাথে বিখ্যাত হানিফ সংকেতের বোনের বিয়ে হয়েছে ! এই শুনে মনে মনে বেশ ভাল লাগলো। আমি অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে। তখন বিভিন্ন প্রসঙ্গে আমার সেই চাচাতো ভাইয়ের কথা বলি। অথচ তারা আমাদের নিকটাত্মীয় হলেও যাতায়াত কম। তারপরও হানিফ সংকেত বলে কথা ! তাই কথায় কথায় তার প্রসঙ্গ টেনে ভাব মারতে থাকি।

হায় খোদা ! সংকেত দা জানেনও না তার নাম আমি সেই কৈশর থেকে ব্যবহার করে চলছি ! বিখ্যাত মানুষেরা এভাবেই নিজের অজান্তেই অর্বাচীনদের কাছে ব্যবহৃত হতে থাকে !

একবার শীতে শুনলাম। আমাদের গ্রামে সংকেত দা’র বোনের ছেলে মেয়েরা ঢাকা থেকে বাড়িতে আসবে। আমি বাবাকে বললাম। ওদের দাওয়াত করে খাওয়াতে হবে। কৈশরের সেই আমি কিন্তু ওদের খাওয়ানোর জন্য বলিনি। বলেছিলাম হানিফ সংকেতের বোনের ছেলে-মেয়ে হিসেবে । যাই হোক ওরা এলো। আমি গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।

আর কথা প্রসঙ্গে বারবার বলছি , তোমার মামার সাথে কবে দেখা হয়েছে। বাসায় যাও টাও। তিনি কেমন করে কথা বলেন। তার সাথে তোমাদের ছবি নিয়ে এসেছো ..? তোমার মামা তোমাদের বাড়িতে আসে টাসে নাকি ..? ইত্যাদি নানান কিম্ভুত প্রশ্নাদি !

‘ওরা বলেই চলেছে। মামা খুব রাগী। কাছাকাছি খুব একটা যাই না। আমরা থাকি মিরপুর তারা ধানমন্ডি ইত্যাদি।’
আজ বিখ্যাত এই মানুষটি আমায় চেনেন। আদর করেন। শাসন করেন। ধমকান। এটাই আমার প্রাপ্তি।
ভালো থাকবেন দাদা। অনেককাল । সুস্থ। সাবলীল। আপনাকে আমাদের এ দেশের জন্য ভীষণ প্রয়োজন। শুভ জন্মদিন।

 

 

 

 

লেখক : উপস্থাপক ও সঙ্গীত পরিচালক।

২৩ অক্টোবর ২০১৯

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নীলিমা শামীম’র কবিতা ‘ভোরের শিশির’

ভোরের শিশির – নীলিমা শামীম   শিশির ভেজা দূর্বাঘাসে মন ময়ুরি হাঁসে, ...