বিশেষ প্রতিবেদক।।
শিক্ষার উদ্দেশ্য মহৎ করা। মানবিক সমাজ বির্নিমাণ করা। শিক্ষাগুরু শ্রেণিকক্ষে এমনটাই শেখান শিক্ষার্থীদের। কিন্তু মাত্র ৭৫০ টাকার জন্য লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ১৮ নং কুশাখালীর ফরাশগঞ্জে অবস্থিত মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি নেননি এক দরিদ্র শিক্ষার্থীকে। শিক্ষার্থীর অনেক অনুরোধ করেও অন্তত একটি নতুন বই পাননি এ শিক্ষকের কাছে; বরং উল্টো তাকে লেখা পড়া বাদ দিয়ে বাসাবাড়িতে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন স্বয়ং প্রধান শিক্ষক। অপমানে কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ বাবাকে ঘটনাটি বলার পর হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায় ঐ শিক্ষার্থীর বাবা।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে এরই মধ্যে। প্রধান শিক্ষককে নিন্দা জানানোর পাশাপাশি স্কুল থেকে বরখাস্তের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী, প্রাক্তন শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং তারা ভুক্তভোগী মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্থানীয় প্রবাসী কল্যাণ পরিষদ নামে একটি সংগঠন মেয়েটিকে এক বছরের শিক্ষা সহায়তা দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। তারাও এমন অমানবিক শিক্ষকের বিচার দাবি করেছেন। এই প্রতিবেদকে ফোন করে প্রবাসী কল্যাণ পরিষেদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংগঠক জসিম উদ্দিন, তাজ এবং আলাউদ্দিন প্রমুখ।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, ঘটনাটি ৯ জানুয়ারির। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় আলোকিত পাঠাগারের পরিচালক আরিফ চৌধুরী শুভ নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। ‍ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম পূনির্মা আক্তার (১২)। কালবৃত্তি গ্রামের ননা মিয়ার বাড়িতে বাবা মায়ের সাথে থাকেন ঐ শিক্ষার্থী। নদীভাঙ্গন কবলিত রামগতির আন্ডাচর থেকে উঠে এসেছে তারা। পিতা রিক্সাচালক জামাল হোসেন দীর্ঘ ৪ বছর যাবৎ প্যারালাইজড রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে বিনাচিকিৎসায় ছিলেন শষ্যাশয়ী। বাবার অসুস্থতার পর ১৩ বছরের বড়ভাই রিক্সা চালিয়ে সংসার চালাতো। বাকি ভাইবোনেরা সবাই পূর্ণিমার ছোট।
ঐ শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদকে বলেন, কালিবৃত্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আমি পাশ করেছি। বছরের শুরুতে বই উৎসবের দিন স্কুলে গিয়েছি। কিন্তু ভর্তির কোন টাকা বাবা মা আমাকে দিতে পারেনি। সবাইকে বই দিয়েছে, কিন্তু আমি ভর্তি না হলে আমাকে বই দিবে না বলেছে স্যার। টাকা নাই ভর্তি হবো কিভাবে! প্রধান শিক্ষককে বলেছি স্যার আমারে ভর্তি না করলে অন্তত পড়ার জন্য একটা বই দিন, কিন্তু তিনি বই দিতে ৭৫০ টাকা লাগবে বলেছেন। তিনচার ঘন্টা অপেক্ষা করে সেদিন চলে এসেছি। গত ৯ জানুয়ারি প্রতিবেশী সালাহ উদ্দিন হৃদয় ভাইকে জানালে তিনি আলোকিত পাঠাগারের এক জনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা সহযোগীতা নিয়ে আমাকে ভর্তি করানোর জন্য আবার স্কুলে নিয়ে যান। কিন্তু সালাহ উদ্দিন ভাইয়ের অনেক অনুরোধের পরও এক টাকা কমেও স্যার আমাকে ভর্তি করাবেন না জানিয়ে বলেন, ‘সবাই লেখাপড়া করলে বাসা বাড়িতে কাজ করবে কে? টাকা না থাকলে পড়ার দরকার নেই। গরিবের জন্য লেখাপড়া আসেনি। আমি কান্না করতে করতে বাড়িতে এসে বাবাকে ঘটনাটি বলি। তারপরই বাবা আমাকে কাছে টেনে বলেন স্যার ঠিকই বলেছে, গরিবের কপালে লেখাপড়া নেই। একথা বলার পর নিশ্চুপ হয়ে যান এবং ভোরের দিকে মারা যান। আমি এই স্যারের বিচার চাই।
এরপরই ঐ শিক্ষার্থী প্রতিবেদককে কান্না জড়িত কণ্ঠে উল্টো প্রশ্ন করেন, আপনারাই বলুন, একজন স্যার এত নিষ্ঠুর হয় কিভাবে?
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান, সালাহ উদ্দিন মানিক ইউনাইটেড নিউজকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি আমি দেখেছি। ঘটনাটি যে কোন বিবেকবান মানুষকে চরম ভাবে ব্যথিত করবে। আমি আজ ভুক্তভোগী পিতৃহারা সেই শিক্ষার্থীর বাড়িতে যাবো। ঘটনাটি তদন্ত করে জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।
মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ এর আগে আর কখনো আসেনি আমার কাছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা চিন্তা করতে হবে। তিনি শিক্ষক তিনি যদি এটি ভুলে গিয়ে এলাকার মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলেন তাহলেতো আমার স্কুলই বন্ধ হয়ে যাবে। একের পর এক ঝামেলা লাগিয়ে রেখেছেন তিনি। আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখছি কি করা যায়।
ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজন সদস্য ও শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধান শিক্ষকের বিচার চেয়েছেন। তারাও তাকে বরখাস্ত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা তাকে ‘স্বৈারাচার ও বেয়াদপ’ আখ্যা দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য উপজেলা ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকতা ও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে একাধিক বার ফোন দিলেও তারা ধরেননি।
ঘটনার স্বাক্ষী সালাহ উদ্দিন হৃদয় বলেন, আজ সকালে আমাকে ডেকে ঐ স্কুলের সহকারি শিক্ষক শাহাজান স্যার বলেন, ঘটনা যা ঘটেছে তা আর সামনের দিকে বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। হেড স্যার কয়েকজন শিক্ষককে বিষয়টি সমাধানের জন্য অনুরোধ করেছেন। তোমরা এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। তোমরাতো জানো প্রধান শিক্ষকের ব্যবহার এমনই। এ কারণে আমাদেরও মাঝে মাঝে কথা শুনতে হয়।
ঘটনাটি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়া স্থানীয় পাঠাগার পরিচালক আরিফ চৌধুরী শুভ বলেন, শিক্ষকতা মহান পেশা। আমার শিক্ষকদের উদারতার কারণে আমি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। প্রতিটি সমাজে মানবিক শিক্ষকের প্রয়োজন। তবে দরিদ্র এলাকা ফরাশগঞ্জে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার একমাত্র প্রতিষ্ঠান মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়। আমার বাবা ১৯৮৫ সালে এই বিদ্যালয়ের জন্য ৭৮ শতাংশ জমি দান করেন। এই বিদ্যালয়ের সভাপতি ও তার পিতা খুবই ভালো মানুষ। এই স্কুল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যই ছিল গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সহজ সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তুি বর্তমান প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থী বান্ধব নন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বির্তকিত। তার আচার আরণ সন্ত্রাসের মতো। সবাইকে হুমকি দেন তিনি কালারোডে থাকেন (শহরে)। আমাকেও এ হুমকি দিয়েছেন। স্কুল থেকে পদত্যাগের পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত করে তার কঠিন বিচার হওয়া উচিত।
পেসবুকে ভাইরাল হওয়া সেই পোস্টটি হলো…
বোন তুই ঐ অমানবিক প্রধান শিক্ষককে কোনদিন ক্ষমা করিস না…
মেয়ের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গেছে শুনে বাবা অনেকটা কষ্ট নিয়ে পরাপারে চলে গেলেন আজ সকালে। মেয়েটি ও তার ছোট্ট ভাইবোনরা এখন শুধু বাবা বাবা করে আহাজারি করছে।
ছবির মেয়েটি আমার গ্রামের না। অন্য এলাকা থেকে এসে আমার পাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। বাবা রিক্সা চালিয়ে মাটি কেটে কামলা দিয়ে ৪ সন্তান নিয়ে কঠিন সংগ্রাম করে সংসার চালাতো। কিন্তু অসহায় এ পিতা গত চার বছর ধরে প্যারালাইজড অবস্থায় ঘরে পড়ে আছেন। ছোট ছেলেটা নিরুপায় হয়ে বাবার রিক্সা নিয়ে বের হতো। যে যা পারতো তাদের সহযোগীতা করতো। বিচানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েও সন্তানদের পড়াশুনা করানোর ইচ্ছা ছিল তার।
মেয়েটা এবার পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে চেয়েছিল। কিন্তু বছরের প্রথম দিন অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে স্কুলে গেলেও মুনছুর আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাকে ভর্তি করাননি। কারণ হিসেবে মেয়েটাকে বলেছেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সরকারি ফি ৭৫০ টাকা যেদিন নিয়ে যেতে পারবে সেদিন ভর্তি নিবে। মেয়েটা তাকে কয়েকটা নতুন বই দিতে অনুরোধ করেছিলেন পড়ার জন্য, কিন্তু ভর্তি না হলে নতুন বই দেয়ার নিয়ম নেই বলে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। মেয়েটি কান্না করতে করতে বাড়ি চলে গেল। বাড়িতে গিয়ে তার বাবাকেও ঘটনাটি বললো। তার বাবা তার প্রতিবেশি Apurba Redoy এর মাধ্যমে পুরো ঘটনাটি আমাকে জানালেন।
আমি তখন একটা সেমিনারে অংশ নিয়ে বের হচ্ছিলাম। সেমিনারে অংশ নেয়ার কারণে আমাকে ৫০০ টাকা সম্মানি দিল কর্তৃপক্ষ। আমি সাথে সাথে মেয়েটিকে সেই ৫০০ টাকা বিকাশ করে হৃদয়কে বললাম তাকে পরদিন স্কুলে নিয়ে ভর্তি করে দিতে। প্রধান শিক্ষককে ভর্তি বাবত ২০০ টাকা দিতে আর বছরের শুরুতে খাতা কলম কেনার জন্য মেয়েটার হাতে বাকি ৩০০ টাকা দিতে। হৃদয় পরদিন মেয়েটাকে নিয়ে গেল এবং অনেক অনুরোধ করলো। কিন্তু এই নিষ্ঠুর প্রধান শিক্ষক তার স্কুলের সাবেক এই শিক্ষার্থীকেও সাফ জানিয়ে দিলেন, যাদের টাকা নেই তাদের পড়াশুনা করার দরকার নেই। ৭৫০ টাকার নিচে এক টাকা কম দিলেও তার ভর্তি হবে না। এটা সরকার নির্ধারিত ফি। তার কিছু করার নেই। তাছাড়া এত অভাবে থাকলে এদের পড়ার কি দরকার এ কথাও শুনিয়ে দিলেন।
হৃদয় হতাশ হলেন এবং মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে তার বাবাকে নিষ্ঠুর এই প্রধান শিক্ষকের সব কথা জানিয়ে দিলেন। তারপর থেকেই তার বাবার শরীর আরো বেশি খারাপ হতে লাগলো। মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর কাছে টেনে কান্না করে তাকে বলেছিলেন, ১০ তারিখ চলে গেল ভর্তি হতে পারিসি নি। মারে আসলেই গরিবের জন্য পড়াশুনা নেই। তোর স্যার ঠিকই বলেছে। বাবা মেয়ের এটাই ছিল শেষ কথা।
আশপাশের অনেকেই সিদ্ধান্ত দিলেন, ঢাকায় এসে বাসা বাড়িতে কাজ করতে। কিন্তু অসুস্থ বাবাকে আর ছোট ছোট ভাইবোনদের বাড়িতে একা রেখে তার ছোট্ট মন ঢাকায় আসতে চাচ্ছিল না। আজ সকালে এই সমাজের বিবেকে একটি চপেটাঘাত করে মৃত্যুকে অলিঙ্গন করে বিদায় নিলেন মেয়েটির বাবা। সকালে হৃদয়ের ফোন পেয়ে দুসংবাদটি পেলাম। আমার শুধু অভিশাপ দিতে ইচ্ছে করে আজ। শুধুই অভিশাপ। মেয়েটিকে সান্তনা দেয়ার ভাষা আমার নেই কিন্তু ঐ শিক্ষকের জন্য অন্তর থেকে ঘৃণা প্রকাশ করছি। আপনারাই বলেন, এই কি শিক্ষাগুরু? তুমি তাকে ক্ষমা করো না বোন।
তোমার পড়াশুনা চালিয়ে যাবার জন্য আমার পক্ষ থেকে আলোকিত পাঠাগার পরিবারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। আপনারা মেয়েটার পাশে দাঁড়াতে পারেন….
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here