ব্রেকিং নিউজ

প্রধানমন্ত্রীর কাছে কানিজ ফাতেমা নীপা’র খোলা চিঠি

প্রধানমন্ত্রী                                                 কানিজ ফাতেমা নীপা

 

প্রিয় দেশনেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা,

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। পত্রের শুরুতেই আমার সালাম নিবেন। পাশাপাশি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আমার প্রাণঢালা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি আপনার প্রতি। আশা করি আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনি ভালো আছেন। তবে আমি ভালো নেই।

অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আজ এই ভার্চুয়াল মাধ্যমে আপনাকে দু কলম না লিখে থাকতে পারছিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।আপনি নিশ্চয়ই একশত ভাগ অবগত আছেন যে, ইদানীং আমার সোনার বাংলায় ধর্ষণের যেন হিড়িক পড়ে গেছে। খুব বেশি ঘটনা উল্লেখ করার প্রয়োজন হবেনা আমার বিশ্বাস। তবে কিছুদিন আগে সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনাটা আমাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে।যেখানে একজন স্বামীকে বেধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে।

গতকাল প্রকাশিত নোয়াখালির বেগমগন্জের ঘটনাটা দেখে ১৯৭১ এর সেই পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার কথা মনে পড়ে গেলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী । কি নির্মম সেই দৃশ্য যা ফেসবুকে সবাই দেখেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো আমাদের এমন বাংলাদেশ দেখার জন্য স্বাধীনতার ডাক দেননি! আমাদের বাবা দাদারা আজকের এই বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেননি! ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে শহীদের রক্ত কি বৃথা যাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?দুই লক্ষ বাঙালি নারীর ইজ্জত আপনি বৃথা হতে দিবেননা আমি সে আশা রাখি।

আপনার এতো বছরের নেতৃত্বে অপবাদ পড়ুক এ আমরা চাইনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ধর্ষণের যথাযথ বিচার হলে এ দেশে ধর্ষণ কমে যাবে এটা আমরা সকলেই বিশ্বাস করি।আপনি ধর্ষকদের দ্রুত এমন দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করুন যাতে আমার মতো হাজারো নারী নিশ্চিন্তে পথ চলতে পারে।

আমরা সমস্ত বাঙলার মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কারন আমরা আপনাকে ভালোবাসি তাই আপনি সঠিক বিচার করবেন সেই আশাতেই বুক বেধে আছি।

আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি আপনাকে বলবো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

“আমার কোন বড় ভাই নেই” বিষয়টা ভাবতে আমার ছোটবেলা থেকে যতোটুকু খারাপ লেগেছে। তার চেয়ে বেশি কষ্ট লেগেছে এটা ভাবতে যে, আমার বাবার কোন বড় ছেলে নেই। আমিই সবার বড় এবং আমি একজন মেয়ে।

২০০৮ এ আমি মাদারীপুরের গ্রাম থেকে ঢাকায় আসি। তখনো বাবা আমাকে সাহসী ভাবতে পারেননা। ২০১০থেকে যখন অনার্স পড়া অবস্থায়ই একটা বায়িং হাউজে একাউন্টেন্ট হিসেবে জব শুরু করি এবং আত্মীয়ের বাসা ছেড়ে একা থাকতে শুরু করি, তখন থেকে বাবা আমাকে সাহসী আর ছেলে ভাবতে শুরু করেন।

দাদীকে প্রতিমাসে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া আসা,বাবার টুকটাক জমিজমা সংক্রান্ত কাগজ পত্র তোলা।পরিবারের আত্মীয় স্বজন কারো কোন বিপদ হলে দৌড়ে ছুটে যাওয়া। কারো অসুখ বিসুখ অপারেশনে বাবা না থাকতে পারলেও আমি একাই পারতাম। বন্ধু এবং ভাইবোন মহলে সবাই আমাকে সাহসী মোটিভেটর মেয়ে বলেই জানে।

তখন নিয়ম করে বাড়ি যেতাম। ভোর পাচটায় রওনা দিয়ে বাড়ি গিয়ে সকালের নাস্তা করতাম। আজও বাড়ি যাচ্ছি। কিন্ত ভোর পাঁচটা কেন ছয়টায় রওনা দেয়ারও সাহস হয়নি। অনেক চিন্তা মাথায় চেপে বসেছে গতকাল থেকেই।

কোথায় কি হয়!বাসে লোকজন থাকে কিনা! তারা আবার ড্রাইভারের লোক নয়তো?সাথে ছোট ভাই আছে কিন্তু তাতে কি? যেখানে স্বামী পারেনা স্ত্রী কে নিরাপদ রাখতে,সেখানে ছোট ভাই কিভাবে?

ছোট ভাইকে বুঝতে না দিয়ে, ইচ্ছে করেই সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম। বাসে উঠতেই আব্বুর ফোন। তোমরা কোথায়?মাত্র মালিবাগ?সকাল সকাল রওনা দিয়ে চলে আসবানা?উত্তরে আমি চুপ থাকলাম। বাবাকে কি বলবো?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার বাবা এখনো আমাকে সাহসী ভাবে। বড় ছেলে নেই বলে আমাকে ছেলে ভাবে।কারন, আমার বাবা অসুস্থ। তার দুটো কিডনি ড্যামেজ।তার টাকা পয়সার সমস্যা নেই। এখনো ঢাকায় এলে আমাকে আমাকে হাতে টাকা গুজে দেয়। আমার তাকে দিতে হয়না। কিন্তু তার সাহস আর শক্তি হিসেবে বড় কোন ছেলে নেই।

তাই এখনো প্রতিমাসে বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে,তার মাথায় আর কাধে হাত রেখে বলি,আমিই আপনার বড় ছেলে। এটা যেন মাথা থেকে কখনো বের না হয়। রাস্তায় নেমে গাড়িটা আমিই ঠিক করি।

কিন্তু,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি ইদানীং আমার সাহস হারিয়ে ফেলছি দিন দিন। আমি নিজের অজান্তেই ভুলে যেতে বসেছি যে, আমি আমার বাবার বড় ছেলে। কারন এখন আমি রাস্তায় বেরোতে ভয় পাই। আর রাস্তায় না বেরুলে আমি আমার বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো কিভাবে আপনিই বলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

চুড়ি এবং আংটি আমার খুব পছন্দের অলংকার। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি এখন চুড়ি আর আংটি পড়তে লজ্জা পাই ,কষ্ট পাই। আমি মেয়েলি ঢঙে হিজাব পড়ে হিসাবে (ফুলের ক্লিপ) লাগাতে লজ্জা পাই,কষ্ট পাই। আয়নায় নিজেকে মেয়ে হিসেবে দেখে আমি লজ্জা পাই, কষ্ট পাই।

মনে হয়, ছিঃ আমি মেয়ে। একরাশ ঘৃনা জন্মে নিজের প্রতি। আমি মেয়ে।আমাকে চাইলেই যা খুশি করা যায়। অথচ এই আমারি মতো নারীর পেট থেকেই জন্ম হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী,আমি এবং সাধারন মানুষ সহ সবার। সেই নারী জাতির এতো অপমান আপনি কিভাবে সহ্য করছেন??
আমি লজ্জা পাই। আপনি লজ্জা পাননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী???

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি আপনার মেয়ে। আপনার ভগিনী। আপনাকে এই প্রশ্ন রাখার অধিকার আমি খাটাতেই পারি। আমি রাজনীতি বুঝিনা। আমি বুঝি, একজন ধর্ষক কোন দলের হতে পারেনা।

প্রধানমন্ত্রী এই নারীরা আমাদের মা বোন ভগিনী। যতবার ধর্ষিত হয় নারী। ততবার ধর্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশ। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। তাই আমার দেশের এই অবস্থা আমি দেখতে পারছিনা। দ্রুত কঠিন বিচারের আওতায় আনুন প্রত্যেকটা ধর্ষককে।যে বিচার দেখে ভবিষ্যতে আর ধর্ষক জন্ম নিবেনা।

নয়তো, সারা বাংলাদেশের মেয়েরা একযোগে যেদিন রাস্তায় নামবে ধর্ষকের বিচারের দাবিতে। সেদিন নারী হয়ে আপনি নিজেই লজ্জা পাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

শ্রদ্ধা ভালোবাসা থেকে আপনার এক মেয়ে, ভগিনী, এক ‌শুভাকাঙ্ক্ষী বলছি, সেই দিন আসার আগেই দ্রুত ধর্ষকদের কঠিন বিচার করুন প্লীজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

সবশেষে আপনার সুস্থতা আর দীর্ঘায়ু কামনা করে এবারের মতো শেষ করছি।

 

ইতি,
সকল ধর্ষিতা নারীর পক্ষ থেকে,আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী, স্বাধীন বাংলার মেয়ে।
কানিজ ফাতেমা নীপা।।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নোয়াখালীতে গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ  

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, নোয়াখালী প্রতিনিধি :: নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার পৌরসভা ১নং ...