খাল-বিল, ঝোপ-ঝাড়, রোদ-বৃষ্টি-ঝড় সবই ছিল তুচ্ছ। এক খানা শুকনো রুটি কিংবা এক মুঠো পান্থা ভাতও না জোটায় জলপাইগুড়ি শহরে রিক্সাচালাতে হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় গেরিলা যোদ্ধা টুলটুলকে। তার পরেও যুদ্ধ জয়ের নেশা থেকে এক চুলও পিছপা হননি সেদিন। বাবার স্নেহ আর মায়ের আদর দুহাতে ঠেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের প্রথম বর্ষের ছাত্র শওকত আলী টুলটুল রেল লাইনের কোল ঘেষে পায়ে হেটে পাঢ়ি জমিয়ে ছিলেন ভারতে। সেখানে কয়েক দফায় প্রশিক্ষন শেষে হাতে তুলে নেন অস্ত্র।

দীর্ঘ  নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর দেশ শত্রু মুক্ত হলেও পাক বাহিনীর ছোড়া গুলিতে ক্ষত বাম পায়ের চিহ্ন যেমন আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন তেমনি, জীবন যুদ্ধ তাকে এখনো তাড়া করে ফিরছে। নীলফামারী শহরের জুম্মা পাড়া নিবাসী সেকেন্দার আলীর পুত্র শওকত আলী টুলটুল। ১৯৭১ এর যখন চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। বাতাসে বারুদের ভারী গন্ধ। এলাকার নিরস্ত্র মানুষগুলের ছুটোছুটি, দিকবিদিগ জ্ঞান শূণ্য, ঠিক তখন ৭ই এপ্রিল সকালে পাক বাহিনী আর এ দেশীয় দোষররা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নীলফামারী শহরে প্রবেশ করে। গুটিকয়েক মুক্তিযোদ্ধা ও আনসারের কিছু সদস্য ৩০৩ রাইফেল দিয়ে সু-সজ্জিত পাক বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও তারা বেশীক্ষন টিকতে পারেনি।

পাক বাহিনী নীলফামারী কলেজে আস্তানা গড়ে। তখন শহর প্রায় মানুষ শূন্য। যে যেদিকে পাড়ে জীবন হাতে নিয়ে পালাতে থাকে। এ অবস্থায় ৮ই এপ্রিল সকালে ঘর ছাড়েন শওকত আলী টুলটুল। বুক পকেটে থাকা হাতে গোনা শ’দুয়েক টাকা পথের সম্বল করে বেড়িয়ে পরেন তিনি। পথ না চেনায় রেল লাইনের কোল ঘেষে খাল-বিল, ঝোপ-ঝাড় ডিঙ্গিয়ে প্রথমে ডোমার পরে চিলাহাটী সীমান্ত দিয়ে ভারতের হলদিবাড়িতে যান ৯ এপ্রিল।

সেখানে নীলফামারীর প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এ্যাড. আফসার আলী আহমেদ, প্রয়াত আব্দুর রউফ ও প্রয়াত আব্দুর রহমান চৌধুরীর সাথে দেখা হয় তার। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর তিনি চলে যান দেওয়ানগঞ্জ ক্যাম্পে। কয়েক দিনের বিরামহীন পথচলা আর উৎকন্ঠিত জীবনের প্রয়োজনে পকেটে থাকা টাকা খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যায় টুলটুলের। টাকা ফুড়ানোর প্রথম দু’তিন দিন এক বেলা আধা বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হলেও অচেনা শহরে একখানা শুকনো রুটি কিংবা লবন মেশানো পান্থা ভাত জোগারও যেন ধাউ হয়ে পরে টুলটুলের। কোন উপায়নত্ম না পেয়ে অবশেষে পেটের তাগিদে জলপাইগুড়ি শহরের অচেনা পথে রিক্সার পেডেলে পা মারতে হয় তাকে। এখানেই দেখা হয় ততকালীন জাতীয় গণনেতা আবুল কালাম আজাদের সাথে। তিনি তাকে ছাড়াও ডিমলার হবিবর রহমান, নীলফামারী সদরের হায়দার আলী মেনু চৌধুরী ও দেলোয়ার হোসেনকে কুচবিহার সেনা ক্যাম্পে পাঠান। সেখান থেকে তাদের দিনহাটা ক্যাম্পে প্রশিক্ষনের জন্য পাঠানো হয়। এক মাসের প্রশিক্ষন শেষে তারা দেওয়ানগঞ্জে ফিরে আসলেও অস্ত্রের অভাবে প্রায় এক মাস বসে থাকার পর ৩০৩ রাইফেল নিয়ে চোরা গোপ্তা হামলায় অংশ নিতে থাকেন। এসময় তারা হিলি ও পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন সীমান্তে রাতের আধারে চোরা গোপ্তা হামলায় অংশ নেন। এ অবস্থায় কিছুদিন পরে অন্যান্যদের সাথে তাকে কুচবিহার জেলার টাপুরহাট সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। ক্যাম্পে সরবরাহকৃত খাবারে পোকা দেখে কয়েকদিন না খেয়েই ছিলেন গেরিলা টুলটুল। এর পর অপর গেরিলা দেলোয়ার হোসেনসহ তারা সেখান থেকে দেওয়ানগঞ্জে ফিরে এসে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। সেখানে পরিচয় হয় রংপুর জেলা মুজিববাহীনির জেলা লিডার মোক্তার এলাহীর সাথে। পরে তার মাধ্যমেই উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশের চাকরাতা সেনা ক্যাম্পে যান। সেখানে প্রশিক্ষন শেষে পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্র নিয়ে ততকালীন জেলা লিডার দেলোয়ার হোসেন বুলবুলের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। জীবন বাজী রেখে দেশ মাতৃকার জন্য সম্মুখ যুদ্ধে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া এ যোদ্ধা বলেন, পঞ্চগড় জেলার চাউলহাটী সীমান্তে সম্মুখ যুদ্ধে তার বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। গুরুত্বর অবস্থায় সতীর্থরা তাকে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসার পর তাকে কোরিয়ারের দায়িত্ব দেয়া হলে, তিনি খান সেনাদের অবস্থান জানতে দেশের অভ্যন্তরে এসে খবরাখবর নিয়ে আবার ফিরে যেতেন। স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে এ যোদ্ধা বলেন, দেলোয়ার হোসেন বুবুলের নেতৃত্বে আশরাফ আলী আসাদ, জয়নাল আবেদীন, দেলোয়ার হোসেন, আনছারুল ইসলাম ছানুসহ প্রায় ২০জন মুক্তিযোদ্ধা ডিমলা সীমান্তের ঠাকুরগঞ্জে আস্তানা গাড়েন।

তিনি বলেন, সেখান থেকে টুনিরহাট দখলের সময় পাক বাহীনির সাথে প্রচন্ড গুলিবিনিময়ের সময় বীরযোদ্ধা আসাদ নিহত হয়। সেদিনের সেই ঘটনা বর্ননা করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন গেরিলা টুলটুল। চোখ জলে ভিজে আসে তার। সেই সম্মুখ যুদ্ধে নাম নাজানা আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন সেদিন। সে ঘটনা এখনো তাকে পীড়া দেয়। শওকত আলী টুলটুল একজন কৃতি ফুটবলারও বটে। জতীয় ফুটবল দলে খেলেছেন দীর্ঘ দিন। জীবন সংগ্রামে নানা সমস্যায় জরজরিত শওকত আলী টুলটুল, বৈবাহিক জীবনে ১ পুত্র ও ১ কন্যা সন্তানের জনক। স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিশিক্ষা আনজুমান আরা বেগম দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত। এরই মধ্যে দু’বার অস্ত্রপ্রচার হওয়ায় ধুকে ধুকে চলছেন তিনি। তার চিকিৎসার খরচ যোগাতে সহায়সস্বল সবই খুইয়েছেন তিনি। পুত্র নাঈম শাহরিয়ার পিউ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করে চাকরী নামক সোনার হরিনের পিছনে ছুটছেন। কন্যা শাহরিন আখতার পিংকি রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। গেরিলা টুলটুল স্বাধীনতার মাসে দেশবাসীর কাছে আকুতি জানান, মুক্তি যোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/নুর আলম/নীলফামারী

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here