মালিক উজ জামান, যশোর প্রতিনিধি ::

পুষ্টিগুণে পরিপূর্ণ একটি সুস্বাদু ফল কমলা। যা ১২ মাস পাওয়া যায়। দামে সস্তা। কমলাকে বলা হয় শত গুণ সমৃদ্ধ ফল। এর যেমন রূপ তেমনি গুণও। ছোট কিংবা বড় উভয়ে এই ফলটি খেতে পারেন। বহু রোগ থেকে মুক্ত রাখে রসালো এই ফলটি। এখন যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তা চাষ হচ্ছে। আশার কথা এখানে অনেকেই বানিজ্যিকভাবে তা চাষ করছেন।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলেন, কমলার কোয়া ও খোসা দুটোই পুষ্টিতে ভরপুর। তাই নিয়ম করে প্রতিদিন কমলা খাওয়া দরকার। কমলায় রয়েছে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, ফ্ল্যাভনয়েড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম ও ডায়েটারি ফাইবার। তাই বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বেশি বেশি কমলা খাওয়ার পরামর্শ দেন। করোনায় কমলা খাওয়া উপকারী। কেন আমাদের বেশি বেশি কমলা খাওয়া জরুরি, কমলার রস অত্যন্ত পুষ্টিকর। বেশির ভাগ রোগে পথ্য
হিসেবে এটি ব্যবহার হয়। একজন মানুষের প্রতিদিন যে পরিমাণ ভিটামিন-সি প্রয়োজন, তার প্রায় পুরোটাই ১টি কমলায় পাওয়া যায়।

১)মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেম মজবুত করে তুলতে কমলা দারুণ উপকারী। ২) তাছাড়া ঠান্ডা লাগা, কানের সমস্যা দূর করতে ভীষণ উপকারী। ৩) কমলায় রয়েছে বিটা ক্যারোটিন; যা শরীরের কোষের ক্ষয় রোধে সাহায্য করে। ৪) মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য জরুরি উপাদন ফলিক অ্যাসিডও যথেষ্ট পরিমাণে থাকে কমলায়। ৫) বিশেষজ্ঞদের মতে, কমলায় থাকে ভিটামিন বি৬, যা মানবদেহে প্রয়োজনীয় হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। ৬) কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেমে ভারসাম্য বজায় রাখতে ভীষণ সহায়ক কমলালেবু। ৭) কমলা খেলে খিদে বাড়ে, খাওয়ার রুচি তৈরি হয়। ৮) শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতেও কমলার জুড়ি মেলা ভার। ৮) লিভার কিংবা হার্টের বিভিন্ন রোগে কমলা খুব উপকারী। ৯) হাইপারটেনশনের রোগীদের ক্ষেত্রেও
কমলা খেলে উপকার মেলে। ১০) লিমোনয়েড নামে এক ধরনের পদার্থ রয়েছে কমলালেবুতে যা মুখ, ত্বক, ফুসফুস, স্তন, পাকস্থলীতে ক্যান্সার প্রতিরোধে দারুণ সহায়ক।

শুধু কোয়াতে নয় কমলার খোসাতেও রয়েছে অনেক গুণ। কমলার খোসা রূপচর্চায় অত্যন্ত উপকারী। স্কিনে ব্ল্যাকহেডস দূর করতে সহায়ক পাঁকা কমলার খোসা। তাছাড়া কমলার খোসা একেবারে প্রাকৃতিক উপায়ে দাঁতের হলদে ভাব দূর করে। তাই কমলার তাজা খোসা বেঁটে টুথপেস্টের মতো ব্যবহার করা যায়। কমলার রসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও
ক্যালসিয়াম।

এছাড়া আরও অনেক উপাদান রয়েছে এ ফলটিতে। পুষ্টিবিদরা বলেছেন, এই ফলটি একসঙ্গে অনেক সমস্যার সমাধান দেয়।  কমলাতে আছে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি এবং হেসপিরিডিন যা উচ্চচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে থাকা ফ্ল্যাভনোয়েড শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। * ক্যান্সার প্রতিরোধে বেশ ভূমিকা রাখে কমলা। ত্বক, মুখের ভেতর, স্তন, ফুসফুস, পাকস্থলী ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে কমলা। এ ফলটির আর একটি উপাদান লিমোনেন। এই উপাদান ক্যানসার প্রতিরোধে খুবই উপযোগী। * যাদের হার্টের সমস্যা রয়েছে তারা চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে খেতে পারেন এ ফলটি। কমলাতে রয়েছে ভিটামিন সি, কোলিন, পটাশিয়াম, ডায়েটারি ফাইবার যা অ্যাথমিয়া ও হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। * প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি থাকায় নানা ধরনের সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কমলা। * যাদের কিডনিতে পাথরের সমস্যা রয়েছে তারা খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন এ ফলটি।

অবশ্য চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে খাবেন। ডায়াবেটিস, মস্তিষ্ক গঠন, ওজন কমাতে সাহায্য করে কমলা। যাদের হাই পটাশিয়াম যুক্ত খাবারের ওপর নিষেধ আছে তাদের অবশ্যই পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে কমলা খাওয়া উচিত। এ ফলটি বেশি খেলে পেটে ব্যথা, ডায়রিবা বা বদহজম হতে পারে। কমলা সারা বছর পাওয়া গেলেও শীতকালে পাওয়া যায় বেশি। ১০০ গ্রাম কমলাতে আছে ভিটামিন বি ০.৮ মিলিগ্রাম, সি ৪৯ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩৩ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩০০ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ২৩ মিলিগ্রাম। প্রতিদিন যতটুকু ভিটামিন সি প্রয়োজন তার প্রায় সবটাই ১টি কমলা থেকে সরবরাহ হতে পারে। এতে আছে শক্তি সরবরাহকারী চর্বিমুক্ত ৮০ ক্যালোরি, যা শক্তির ধাপগুলোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

কমলায় আছে প্রচুর ভিটামিন সি, যা ক্যান্সার প্রতিরোধক, স্বাস্থ্যকর, রক্ত প্রস্ততকারক এবং ক্ষত আরোগ্যকারী হিসেবে উপকারী। কমলা ‘বি’ ভিটামিন ফোলেটের খুব ভালো উৎস, যা জন্মগত ত্রুটি এবং হৃদরোগের জন্য ভালো কাজ করে। প্রতিদিনকার প্রয়োজনীয় পটাসিয়ামের সাত ভাগ পূরণ করা সম্ভব কমলা দিয়ে, যা শরীরের তরলের ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজন। কমলাতে উপস্থিত অ্যান্টি- অক্সিডেন্ট ফ্রি-র‌্যাডিকাল ড্যামেজ করে। ফলে ত্বকের সজীবতা বজায় থাকে।

এতে উপস্থিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিভিন্ন ইনফেকশন প্রতিরোধে সহায়ক। এতে উপস্থিত বিটা ক্যারোটিন সেল ড্যামেজ প্রতিরোধে
সহায়তা করে। ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড় গঠনে সাহায্য করে। ম্যাগনেসিয়াম থাকায় ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে। পটাসিয়াম
ইকেট্রোলাইট ব্যালেন্স বজায় রাখে। কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম ভালো রাখতে সহায়ক। কমলাতে উপস্থিত লিমিয়েড মুখ, ত্বক, ফুসফুস, পাকস্থলীকে কোমল রাখে। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক। ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় ওজন কমাতে সহায়ক।

কমলা চাষে সার ব্যবস্থাপনা, সেচ, আগাছা ব্যবস্থাপনা ও ফসল তোলা : প্রতি গর্তে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া সার, ১০০ গ্রাম টিএসপি সার ও এমওপি সার ১০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। চারা গাছের গোড়ায় মাঝে মাঝে পানি সেচ দিতে হবে। বর্ষাকালে গাছের গোড়ায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কমলা গাছের আগাছা দমন করতে হবে। মধ্য কার্তিক থেকে মধ্য পৌষ মাসে ফল সংগ্রহ করতে হয়।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here