এমি জান্নাত

এমি জান্নাত :: সারাজীবন তো শুনে এলাম পুরুষতন্ত্র আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথা, নারীতন্ত্রও হয় নাকি! আসলে নারীবাদ কথাটা বেশ প্রচলিত হলেও নারীর সাথে এই তন্ত্র কথাটা কেউ ব্যবহার করেনা বলা যায়।

পুরুষতন্ত্রে শুধুমাত্রই নারীবিদ্বেষী মনোভাব থাকে। এর মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের চিত্র যেমন যৌতুক, ইভটিজিং, যৌনহয়রানি, অতিশাসন, কতৃত্ব আরও নানান দিক। পুরুষতন্ত্র তো সেই জাতির রক্তে মিশে আছে যেটা কখনোই কাম্য হতে পারেনা। এর থেকে বের হয়ে এসেছেন অনেকে আর অনেকে সেই বেড়াজালেই রয়ে গেছেন। কিন্তু এই তথাকথিত নারীবাদে পুরুষের পাশাপাশি নারী অর্থাৎ নিজেদের প্রতিও উহ্য বা প্রকাশ্য একটা বিদ্বেষ থাকে। সেক্ষেত্রে নারীতন্ত্রই বলছি। কিন্তু সেটাও কী কাম্য?

পরিবার থেকেই যদি শুরু করি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা মেয়ে নিজের পরিবারে যতটা আহ্লাদী, শশুরবাড়িতে সে ততটাই উপেক্ষিত! আবার সেই মেয়ের বাড়িতে যে বউ হয়ে আসে তার ক্ষেত্রেও নিয়মটা একই। কিন্তু নিয়মগুলো কী পুরুষরা একা তৈরি করে? কখনোই না।

যেমন, একটা পরিবারে ছেলের বউ নির্যাতিত শুধু তার স্বামী দ্বারা। মেয়েটি ডিভোর্স দিতে বাধ্য হচ্ছে। সেক্ষেত্রে পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যের ভূমিকা কী থাকে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছেলেকে না বুঝিয়ে তাতে ইন্ধন যোগানো। আর যদি তা নাও হয়, মেয়ের নিজের পরিবারের এবং শশুরবাড়ির নারী সদস্যরাই বলবে মানিয়ে নাও। মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়, এই কথাটা আমি খুব কম পুরুষের মুখে শুনেছি, পাশাপাশি শুনেছি অসংখ্য নারীর কাছেই!

আরেকটি উদাহরণ যদি হয়, ছেলে তার বউকে খুব ভালোবাসে তাহলে তো হয়েই গেলো! সবার আগে মেয়েটির বাড়া ভাতে মই দেওয়ার জন্য শাশুড়ী মা, ননদিনী, খালা শাশুড়ী বা এই জাতীয় যত প্রকার সম্পর্ক আছে তাদের পারফরম্যান্স বেশ ভালো হবে! বউ লেখাপড়া করবে না, চাকরি করবে না, করলেও ঘরের চাকরি মানে সংসার সামলে যদি পারে করবে- এই কথাগুলো বলার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান বেশি।

স্ট্যাটাস অনুযায়ী অত্যাচারের ধরণটা পরিবর্তন হয় মাত্র। শারীরিকটা না চললে মানসিক অত্যাচার কেন বাদ যাবে! সেসব সহ্য করে কেউ কেউ টিকে থাকার লড়াই করে চলেছে আবার অনেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। একজন নারী এগিয়ে যাচ্ছে জীবনে উন্নতির দিকে, পেছন থেকে টেনে ধরে কে? আরেকজন নারী! পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী কে? একজন নারী। কারও পক্ষে বা বিপক্ষে না, আমি আমার সামান্য জীবনের অভিজ্ঞতায় যেটুকু দেখেছি, যেটুকু জেনেছি তারই একটা বহিঃপ্রকাশ করছি মাত্র। যেটা আমাদের চিরায়ত চিত্র বলা যায়।

আর যদি বলি ডিভোর্স এর কথা, শুধু স্ত্রীকে নির্যাতন বা তাদের বাল্যকালের প্রেম কিংবা পরকীয়াই দায়ী? নিজের চারপাশটা দেখলেই উত্তর মিলবে। ডিভোর্স এর পরিসংখ্যান খুঁজতে গেলে একটা বড় অংশেই কারণ হিসেবে স্বামীর আত্বীয়স্বজনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পাওয়া যাবে। তার বেশিরভাগই সামনে আসেনা। আর যে কয়জন হাতে গোনা উদার মনের ব্যতিক্রমধর্মী নারী আছেন, যারা সত্যিই অন্য মেয়েদের পাশে দাঁড়ান, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের এগিয়ে যাওয়ায় অনুপ্রাণিত করেন, তাদের নিয়েও আবার কটুক্তি, ফিসফাস করে কে? সেই নারীই! এই তন্ত্র বা সিস্টেম একটা চক্রাকারে ঘুরছে। একই ব্যক্তি ঘুরেফিরে এক পরিস্থিতিতে দর্শক আর বিপরীত পরিস্থিতিতে পারফরমার!

যুগ পাল্টেছে বহুদিন আগেই, তাইনা? সেই একই গন্ডি, একই মনোভাব, একই চিন্তাচেতনার ধারাবাহিকতা! নারী এবং পুরুষ, এবার তো বেড়িয়ে আসুন.. প্রতিটি মানুষ নিজের একটি অস্তিত্ব নিয়ে আসে। তার মধ্যে সুপ্ত থাকে অনেক কিছু। তাকে সুযোগ দিলে আপনার স্বত্তা হারিয়ে যাবে না। সুযোগ দিতে না পারলে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাটা না থাকলেও কম কী! আমরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী না, প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি করা হয়। কিন্তু কেন? যার জন্য যতটুকু তাকে ততটুকু পাওয়া থেকে আটকানোর চেষ্টা করাই বোকামি! শুধু নিজের বা কাছের মানুষদের জন্য নয়, সবার পাশে থেকে নিজের ইতিবাচক দিকগুলো বিলিয়ে দিলে কত নির্মল হয়ে যায় সব কিছু! আর শুধু প্রাণ খুলে একবার ভাবলেই হয়, সবাই সবার জন্য, মানুষ মানুষের জন্য।

 

 

 

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক। ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here