পিয়াল রায়ের গল্প ‘দাওয়াই’

পিয়াল রায়

পিয়াল রায় :: এস এম এসগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে জয়দীপ। ওগুলোই এখন বাঁচাতে পারে ওকে। প্রয়োজনীয় মেসেজগুলো খুঁজে পায় না। ডিলিট করে দিয়েছে সম্ভবত। পাগলের মতো লাগে জয়দীপের। একে ওকে জিজ্ঞেস করে মুছে যাওয়া মেসেজ কোনোভাবে উদ্ধার করা যায় কিনা। নানা জনে নানা কথা বলে, কাজের কাজ কিছুই হয় না। চাইল্ড রাইট কমিশন থেকে চিঠি এসেছে, জয়দীপকে বাচ্চা ফেরত দিতে হবে তার মায়ের কাছে। জয়দীপ কিছুতেই তা হতে দিতে রাজি না। যে ছেলেকে দুমাস  মাস বয়স থেকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে সে, মমতার, স্নেহের সে বাঁধন ছিঁড়ে আজ পাঁচ বছরের বাচ্চাকে কিছুতেই কেড়ে নিতে দেবে না ওদের। রাক্ষস খোক্কশ দত্যি দানো কেউ আর ভয় দেখিয়ে কাবু করতে পারবে না ওকে। অফিস, মায়ের অসুখ, টাকাপয়সার টানাটানি সামলেও ছেলের জন্য রাতের পর রাত জেগে কাটিয়েছে, যাকে দীপ্তি মেরে ফেলতে চেয়েছিল জন্মের আগেই।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ছেলের জন্য দুধ তৈরি করা, ভিজে কাঁথাকাপড় পাল্টানো, ঠাণ্ডা বা গরম থেকে ছেলেকে বাঁচানো, একরত্তি এই প্রাণ কখন কোন্ অলক্ষ্যে যে জয়দীপকে পিতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে জয়দীপের কাছে তা আজও এক রহস্য। ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে  জয়দীপ অবাক হয় ভেবে যে ফুলের মতো কোমলমতি এক শিশু কোন্ দুর্মর শক্তিবলে মানুষকে বশ করে চালিত করে নতুন জীবনের দিকে। ঈশ্বরের প্রতি সম্ভ্রম জাগে। দৈব ক্ষমতা ব্যতিরেকে যে এ কাজ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, ক্রমে এ প্রত্যয় দৃঢ় হতে থাকে।

খুব শখ করে ছেলের নাম রেখেছিল জয়দীপ, অনিরুদ্ধ।  কোনো বিরুদ্ধতাই যাকে নিষ্ক্রিয় করে তুলতে পারবে না জীবনের প্রতি, এমন ভাবনাতেই

স্বতোৎস্বারিত উচ্চারিত হয়েছিল এ নাম জয়দীপের ঠোঁটে। দীপ্তির কোনো হেলদোল ছিল না। জীবন সম্পর্কে দীপ্তির ছিল উচ্চাভিলাষ। যে মোহে সে বিয়ে করে ঘরসংসারের বাঁধনে নিজেকে জড়িয়েছিল, অচিরেই তাতে ছেদ ধরে। স্বাধীন হওয়ার বাসনায় বাচ্চাকে ছেড়ে চলে যেতেও তাই দ্বিতীয়বার ভাবেনি। প্রথম প্রথম রাতের পর রাত নির্ঘুম  জয়দীপ বসে বসে কেবল ভেবেছে আর ভেবেছে ভুলটা কোথায় ছিল? ভেবেছে এসবই সাময়িক,  নিজের ভুলটা বুঝতে পারলেই দীপ্তি ফিরে আসবে ঠিক। কোন্ মা-ই বা পারে দুধের শিশুকে কোল ছাড়া করে বেশিদিন থাকতে? দীপ্তিও নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম নয়।  বাচ্চাকে ছেড়ে বেশিদিন থাকতে পারা ওর পক্ষেও নিশ্চিতই সম্ভব হবে না কিছুতেই।  কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে জয়দীপ ততই বুঝেছে দীপ্তি কোনোদিনই ফিরবে না।

আজকাল মনে হয় জীবনটা যেন ভিড় একটা বাসের মতো। হাজারো অচেনা মানুষ ধাক্কাধাক্কি করতে করতে  ছুটছে। হাজার হাজার মুখের হাজার হাজার ভঙ্গিমা। কেউ কেউ গল্পগুজবে লাঘব করছে পথশ্রম কেউবা আবার সহযাত্রীর দিকে আঙুল তুলে বাধ্য করছে জায়গা ছেড়ে দিতে। দেখেশুনে হাসি পায় জয়দীপের। ধ্যানে বসে। ধ্যানে বসলেই অন্য একটি মুখ ভেসে ওঠে। চেনা-অচেনায় মিলেমিশে সে মুখ ক্রমশ হয়ে ওঠে ঈশ্বরপ্রতীম। ঈশ্বরের শান্ত সহবাসে মন হয় প্রসন্ন। মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি আর কোনো অভিযোগ থাকে না জয়দীপের। জীবনটাকে খামোখাই টেনে টেনে লম্বা করতে চায় না আর। যেখানে মনের ভালোলাগা নেই সেখান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতেই আজকাল যেন উৎসাহ। সামান্য আয়, অসুস্থ মা আর ছোট্ট শিশুটিকে নিয়েই সংসার যেন আজ ভরভরন্ত মনে হয়। বাইরের কোনো উটকো ঝামেলাই সে আর প্রশ্রয় দিতে রাজি নয়।

দীপ্তিকে জয়দীপ ক্ষমা করে দিয়েছে অনেকদিন আগেই । যে কাজ দীপ্তি করেছে তার শাস্তি সে এমনিতেই পাচ্ছে। জয়দীপের আজ শুধু লড়াই জেতার অপেক্ষা। জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নেবার জন্য  ছেলেকে নিজের কাছে রাখার লড়াই। মানুষের মতো মানুষ করার লড়াই। একটু ঘুমোনোর জন্য জয়দীপ বিছানার কাছে যায়। স্বপ্নে টইটম্বুর ছেলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর হাসিতে ভরে যায় মুখ। পিতাপুত্রের অমলিন সৌন্দর্য নিয়ে  জানলার বাইরে তখন কোন্ অজানা অলৌকিক বুনোফুলের আশ্চর্য সৌরভে মাতাল হয়ে উঠছে পৃথিবী।

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ডিআইইউ তে হাল্ট প্রাইজ চ্যাম্পিয়ন “টিম প্রিহিম”।

স্টাফ রিপোর্টার:: ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে হাল্ট প্রাইজ ২০২১ এর অনক্যাম্পাস প্রোগ্রাম সম্পন্ন ...