পাহাড়ের মানুষ এখনো জিম্মি

পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩৬৫ কিলোমিটার সীমান্তে বিজিবি ক্যাম্প না থাকায় এবং সেনাবাহিনীর ৮৪টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ায় ও খাগড়াছড়ি প্রবেশ পথে সেনাবাহিনীর তল্লাশী কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মাফিয়াচক্র পার্বত্য এলাকার অরণ্যপথে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশের ভেতরে সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে নিরাপদে।

পাহাড়ের মানুষ এখনো জিম্মিআল-মামুন, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি :: পাহড়ের সাধারন মানুষ এখনো জিম্মি। ভাল নেই বাস্তব জীবনে। সংঘাত, জমি দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের একাদিক সংগঠনের নামে চলছে চাঁদাবাজী আর অস্ত্রের রাজনীতি। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি ফিরাতে শান্তি চুক্তি করে আসলেও পাহাড়ে এখনো থামেনী অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানী।

বিগত ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর শান্তিবাহিনীর ১৯৪৭ জন সদস্য, সহস্রাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলেও চুক্তির পরবর্তী ১৭ বছরেও পাহাড়ে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা হয়নি।

বরং চুক্তির পক্ষে- বিপক্ষে বেড়েছে আরো স্বশস্ত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিতভাবে বেশ কয়েকটি সংগঠন।

পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে কেন্দ্র করে একক আধিপত্যকারী জনসংহতি সমিতির বিপরীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে আবিস্কৃত হয়েছে স্বায়ত্বশাসনের নামে জনসংহতি সমিতির ফাটল দল জেএসএস সংস্কার ও অরেক উপজাতীয় সংগঠন ইউপিডিএফ ।

এসব সংগঠনে রীতিমত বিভিন্ন দিবস পালনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কর্মসূচী পালন করলেও সংগঠন পরিচালনা করছে নীরব চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজিতে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধ ভাবে অরক্ষিত সীমান্ত পথ দিয়ে প্রবেশ করা বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রে ছেয়ে গেছে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ি এলাকায় কোথাও কোথাও গোপনে গড়ে তোলা হয়েছে অস্ত্রের আখড়া।

সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় অবাধে প্রবশ করছে ভারতীয় নাগরিক ও অভেধ অস্ত্র-গোলাবারুদ।

গোপনসূত্রে জানা যায়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উপজাতীয় নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে মিশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩৬৫ কিলোমিটার সীমান্তে বিজিবি ক্যাম্প না থাকায় এবং সেনাবাহিনীর ৮৪টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ায় ও খাগড়াছড়ি প্রবেশ পথে সেনাবাহিনীর তল্লাশী কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মাফিয়াচক্র পার্বত্য এলাকার অরণ্যপথে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশের ভেতরে সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে নিরাপদে।

স্থানীয়দের দাবী, অবৈধ এসব আগ্নেয়াস্ত্র বিভিন্ন উপজাতীয় সংগঠনের পৃষ্টপোষকতায় কয়েকটি গেরিলা বাহিনী রাজনৈতিক দলের ক্যাডার ও পার্বত্য শান্তি-চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষে গ্রুপগুলোর কাছে পৌছে দিচ্ছে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের একটি কুচক্রি দল।

শান্তি-চুক্তির পরবর্তী সময়ে পাহাড়ে গেরিলা জীবনের অবসান ঘটলে ইউপিডিএফ সংগঠনটি চুক্তির ধারা নিয়ে বিরোধিতা শুরু করে পাহাড়ী জনগণকে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে। অন্যান্য আঞ্চলিক সংগঠনের দাবী ইউপিডিএফ গনতান্ত্রিক সংগঠনের নামে গোপনে গড়ে তুলছে বিশাল অস্ত্র ভান্ডার ও গেরিলা বাহিনী। অপরদিকে পিছিনে নেই ইউপিডিএফকে ঠেকাতে মরিয়া জেএসএসও।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে পার্বত্যবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে। এ কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ১৩ লাখ মানুষের জীবন।

এদিকে-পুলিশ বাহিনী সন্ত্রাস দমনের দায়িত্বে পড়লেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ব্যতীত এদের দমন করা কোন ভাবেই সম্ভব নয় বলে পাহাড়বাসী মনে করলেও এসব সংগঠন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো অব্যাহত রেখেছে শুরু থেকেই।

অনুসন্ধানে অরো জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলা শহরের প্রবেশ মুখে জিরোমাইল এলাকায় প্রতিদিন সেনাবাহিনী তল্লাশি অভিযান অব্যাহত ছিল। তবে বর্তমানে এ দায়িত্ব পুলিশ বাহিনী করছে। মাঝে মধ্যে পাচারকৃত ও অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য ধরাও পড়ছে। পাচারকৃত অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে- এসএমজি, এলএমজি একে-৪৭ রাইফেল, একে-৪৬ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেল, পয়েন্ট টু টু বোরের রাইফেল, পাইপগান, এলজি, রিভলবার, নাইন এসএল, সাধারণ বন্দুকসহ বিভিন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য।

বিভিন্ন সূত্রে জানাযায়, গত ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে জেলা সদরের জিরো মাইল এলাকায় অপরাজিতা বৌদ্ধবিহার সংলগ্ন পাহাড় থেকে এলজি, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও একটি রামদা, ২৫ ডিসেম্বর জেলার মানিকছড়ি উত্তর লেমুয়া এলাকায় পুলিশের অভিযানে দুটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ১৬ মার্চ সকালে মাটিরাংগা জোনের ক্যাপ্টেন আসিফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী বাইল্লাছড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে কটি পিস্তল ও তিন রাউন্ড গুলিসহ ইউপিডিএফ অর্থ সম্পাদক নবীন আটক, ২০১২ সালের ১২ মার্চ দিঘীনালা সড়কের ধর্মঘর মহাশ্মশান এলাকার বট গাছের নিচ থেকে ১টি বিদেশী স্বয়ংক্রিয় চাইনিজ পিস্তল ৭.৬২ যার বডি ও ব্যারেল ৪৬০১২৩৮, দু’টি পিস্তলের গুলী ৭.৬২, একটি ব্যারেল গুলীর মাথা, দু’টি গুলীর খোসা ৮ এমএম, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল রামগড় পাতাছড়া এলাকায় ভোররাতে চতুর্থ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি সিন্দুকছড়ি জোনের গুইমারা সাব জোন কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসানুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে দুই উপজাতি সন্ত্রাসী চাইলা মারমা (২৫) ও পুষ্টু কুমার ত্রিপুরা (৩২) থেকে একটি দেশীয় থ্রি পয়েন্ট টু রিভলবার ও চারটি তাজা গুলি, ২০১০ সালের ১৫ অক্টোবর জেলা সদরের জিরোমাইল এলাকা থেকে কলিন চাকমা (১৯), সুখি ধন চাকমা (১৮), তপন বিকাশ চাকমা (১৯) ও অরুন বিকাশ চাকমা (১৯) কে

বিস্ফোরক সহ আটক, লক্ষ্মীছড়িতে চলতি বছরের ২৩ জুলাই দুপুরের দিকে দুল্যাতলী ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন ফাহাদ এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে একনলা বন্দুক ২টি, এলজি ১টি, গুলি ৮রাউন্ড তাজা, সেনাবাহিনীর পোশাক ১সেট, গেঞ্জি ৮টি, গুলি রাখার ব্যাগ ১টি, আফ প্যান্ড ১টি, ছুড়ি ১টি ও তাদের ব্যবহৃত ৩টি ব্যাগ সহ সেনাবাহিনীর পোশাকসহ খিলু অং মার্মা(৪০), রোপণ চাকমা(২২) কে আটক, ১৭ মে ভোর ৪টার দিকে পানছড়ি মরাটিলা এলাকার প্রফুল্ল কার্বারী পাড়ায় সেনা ও পুলিশ সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে একে-২২ রাইফেল, ১টি ২২ বোরের রাইফেল, ১টি পিস-ল, ৫৩ রাউন্ড গোলাবারুদ ও চাঁদা আদায়ের রশিদ বই সহ ইউপিডিএফ কর্মী সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা (৩২), সুরেন্দ্র ত্রিপুরা (৩০) ও মহেন্দ্র ত্রিপুরা (৩১), ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট দিঘীনালা বাবুছড়া ইউনিয়নের রোক চন্দ্র কার্বারিপাড়া এলাকার বিধু ভূষণ চাকমার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২টি এলএমজি রাইফেল, ৪টি পিস-ল, ২২৮টি গুলি, ৩টি বোমা, ১টি সিগন্যাল সেট, ৬টি ওয়াকিটকি, গুলি রাখার ১৯টি বান্ডিল ও কিছু সামরিক কাপড় উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ গত ১৯ অক্টেবার জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার বাই্যাছড়ি এলাকায় সকাল ১০টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে স্থানীয় জনৈক কামাল কোম্পানীর বিক্সফিল্ড এলাকা ঘেরাও করে অভিযান চালিয়ে ৫রাউন্ড গুলিসহ ইতালির তৈরী ৭.৬৫ বোরের পিস-লসহ কিশোর ত্রিপুরা (৩০) নামে একজন উপজাতি সন্ত্রাসীকে আটক করেছে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ।

অভিযানে এস আই কবির, এ এস আই মহসিন আহত হয়। আটক কিশোর ত্রিপুরা জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা গ্রুপের) সদস্য। তাছাড়া পাহাড়ে ঘটছে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্র চুরিরও ঘটনা।

গত ৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে পানছড়ি কুড়াদিয়া ছড়া এলাকায় সার্বজনীন পূজা মন্ডপে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য নায়েক লক্ষ্মীরাম চাকমা থেকে চুরি হয়ে সাব মেশিন গান। এ ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে ৬ উপজাতিকে পানছড়ি থানা পুলিশ আটক করে এক পর্যায়ে পুলিশী তৎপরতায় পানছড়ি সড়কস্থ একটি স্কুলের পুকুর হতে রুদ্ধশাস তল্লাশী চালিয়ে এ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

সরকারের পাহাড়ে অসহায় সাধারন পাহাড়ী-বাঙ্গালী এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান পরিচালনাসহ পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের দাবী জানিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ভারতে বিমান বিধ্বস্ত: পাইলটসহ ১৬ জনের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ :: ১৯১ জন যাত্রী নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যাবেলায় ক্র্যাশ করল এয়ার ...