সাদিয়া নাসরিন ::  সাজিদা ইসলাম পারুল, দৈনিক সমকালের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট। ব্যক্তিজীবনে লড়াকু মেয়ে হিসেবে সবাই জানে তাঁকে। নিজে লড়াই করে ভাইবোনদের বড় করছেন। সাংবাদিকতার নেতৃত্বেও পৌঁছেছেন লড়াই করেই। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সততার সাথে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছে।

তো, গত ২৪ তারিখ আমরা দেখলাম সেই লড়াকু মেয়েটি, নিজের জন্য বিচার চাইতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন একা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে। কর্মজীবনে নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত নারীদের নিয়ে অসংখ্য রিপোর্ট করলেও আজ নিজের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়, অবিচার ও অপরাধের বিরূদ্ধে নিজেই দাঁড়িয়েছেন প্রেসক্লাবের সামনে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায়।

এবার ঘটনাটা বলি একটু। যুগান্তরের সাংবাদিক রেজাউল করিম প্লাবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং অল্পদিনের প্রেমের পর ২ এপ্রিল পারুল ও প্লাবন বিয়ে করেন। এরই মধ্যে একাধিক নারীর সঙ্গে প্লাবনের অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা জেনে যান পারুল। বিয়ের এক মাসের মাথায় প্লাবন, আরেকটি বিয়ে করতে যাচ্ছিল পারুলকে কোন কারণ না জানিয়ে।

প্লাবন বিয়ে করতে যাচ্ছে, এটা জেনে লকডাউনের মধ্যে প্লাবনের বাড়ি চিলমারি যাওয়ার পথে পারুল ডিভোর্স লেটারটি পায় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। তবুও পারুল প্লাবনের গ্রামের বাড়ি পৌঁছায় ৫ মে। সেখানেও মারধোর করা হয় তাঁকে। প্লাবনের বড় ভাই এমএ আজিজ, ছোট ভাই এসএম নিজামউদ্দিন এবং বাবা সামসুল হক ও মা মারধর করেন পারুলকে।

“বিয়ের পর যৌতুক হিসেবে প্লাবন ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট দাবি করেন পারুলের কাছে। অনৈতিক সম্পর্কে বাধা ও যৌতুক না দেওয়ায় পারুলকে নির্যাতন করা হয়। মারধরের কারণে পারুলের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়।”-এইসব অভিযোগে সাবেক স্বামী রেজাউল করিম প্লাবনের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন পারুল।

মামলার পর দেড় মাস হয়ে গেলেও প্লাবন এখনও গ্রেফতার না হওয়ায় শেষ আশ্রয় হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছেই ন্যায়বিচার চেয়ে রাস্তায় দাঁড়ালেন তিনি। কে না জানে এই দেশে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছাড়া কিছু হয়না!!

এবার চলুন প্লাবন আর পারুলদের মনস্তাত্বিক জায়গাটা দেখে আসি। পারুল গোপনে বিয়ে করেছিল। নিকটজনদেরও জানায়নি। এমন কি বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় যে গোপনে করা ঠিক হবেনা আপনজনদের এরকম পরামর্শও পারুল আমলে নেয়নি। কেন জানায়নি? কারণ প্লাবন নিষেধ করেছিল। এখানেই প্লাবণদের ক্যারিশমা। এরা এতো বড় খেলুড়ে যে এদের তঞ্চকতায় শিক্ষিত, রোজগার করা, সচেতন পারুলরাও পথভ্রান্ত হয়।

তারা কোন প্রশ্ন তোলেনা, চ্যালেন্জ করেনা, নেগোসিয়েশন করেনা। প্লাবনরা কেনো সম্পর্ক নিয়ে লুকোচুরি খেলে, প্রকাশ করতে দেয়না, কেনো সব করা হয়ে গেলে হাঁসের মতো গা ঝাড়া দিয়ে পানিটুকু ফেলে দেয়, কেনো একইসময়ে বিভিন্ন ঘাটে ঘুরে বেড়ায় সেইসব আদ্যোপান্ত কখনো জানা হয়না পারুলদের।

আচ্ছা, কেনো পারুলরা এসব ঢাকঢাকগুড়গুড় সম্পর্ককে শুরু থেকেই সন্দেহ করেনা? কেনো নারকেলের শক্ত খোলসের নিচের মিষ্টি তরল পানি হয়ে যায় এইসব গাদ্দার বেঈমান পুরুষদের প্রতারণায়? কেনো পারুলরা মনে রাখেনা যে, যে গোপন বিয়ের প্রস্তাব কেবল সেই দিতে পারে যে সঙ্গীকে অধিকার, মর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয়না?

কারণ, যতোই লড়াকু হোকনা কেন, ভালোবাসলে বেশিরভাগ মেয়েরাই পাখি হয়ে যায়। তাদের আকাশ থেকে নিয়ে নিয়ে এসে খাঁচায় রেখে পোষা যায়। আবার না খেতে দিয়ে দুর্বল করে ফেলা যায়। একসময় খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে যা যা বললেও পাখি আর যায়না। এই সুযোগটা যুগ যুগ ধরেই প্লাবনরা নেয়। আর প্লাবনরা মেয়ে চেনে। বন্য পাখি পোষ মানানোর মজাই আলাদা। তাই তারা বেছে নেয় পারুলদের মতো লড়াকু মেয়েদের।

যাই হোক, এবার অন্যদিকটা দেখি। পারুল আর প্লাবন বিয়ে করেছিলো। ভালোবেসেই করেছিলো। এখন একবার ভালোবাসা বা বিয়ে কোনটাই তো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, যে একবার শুরু হইলে চিরজীবন টানিতে হইবে! যে কেউ যে কোন সময় যে কোন কারণে বা অকারণেই সম্পর্কের ইতি টানতে পারে।

কিন্তু প্লাবন তো পুরুষ!! সে তো এইসব সিরাতুল মোস্তাকীমের পথে হাঁটবেনা। তার তো মর্দামী দেখানো চাই। সুতরাং সে ঘরে পারুল আর বাইরে কবুতর পুষবে এবং ঘরের পারুল সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই নেমে আসবে শারিরীক মানসিক অত্যাচারের খড়গ। পুরুষমাত্রই নারীর শরীরের একছত্র মালিক, এই স্কুলিং থেকে যে প্লাবনদের মনস্তত্ত্ব তৈরী হয়, সেখানে আধিপত্যবাদ ছাড়া আর কিছুই নেই।

এবং আরো পুরুষগিরি দেখাতে সে বর্তমান স্ত্রীর (যাকে গোপনেই রেখেছে) অনুমতি না নিয়ে আরেকটি বিয়ে করতে যাচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত পারুল তা জেনে যাওয়াতে পুলিশী হস্তক্ষেপে, এবং পারুলের সাংবাদিক বন্ধুদের উদ্যোগে বন্ধ করা হয়।

যৌতুক চাওয়া, মারধর, লুকিয়ে আবার বিয়ে করতে যাওয়া এবং ভ্রুণ হত্যা করা—সবটাই করেছেন প্লাবন। এগুলো প্রত্যেকটাই ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার আমি এবং আমরা তো করবোই।

কিন্তু মানুষ হিসেবে পারুলকে যে হেনস্থা করা হয়েছে, তার বিশ্বাসকে যেভাবে এক্সপ্লয়েট করা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী ট্রমার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে, অবিশ্বস্ততা ও অসততার কারণে একটা লড়াকু মেয়েকে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত বানিয়ে ফেলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়াটাও জরুরী।

আমরা কি সেই সামাজিক শাস্তির জন্যও লড়বোনা? পারুলকে একা রাস্তায় ছেড়ে দিবো এই প্রতারক মর্দামী দেখানো প্লাবণদের ভীড়ে?

 

 

লেখক: প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ। 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here